অর্থনৈতিক প্রতিবেদক
সপ্তাহের শুরুতেই নেতিবাচক অচেরণের শিকার হয়েছে পুঁজিবাজার। গতকাল দেশের দুই পুঁজিবাজারই বড় ধরনের সূচক হারায়। তবে সূচকের এ অবনতির মধ্যেও উভয় পুঁজিবাজারেই বড় ধরনের উন্নতি ঘটে লেনদেনের। বাজারসংশ্লিষ্টরা সূচকের অবনতিকে কিছুটা অস্বাভাবিক মনে করলেও একই সময় বাজারগুলোতে লেনদেনের উন্নতিকে ইতিবাচক হিসাবেই দেখছেন। তাদের মতে, সূচকের ওঠানামা বাজারের স্বাভাবিক আচরণ হলেও গত ক’দিন টানা পতন ঘটছে বাজারের যা কিছুটা অস্বাভাবিক। তবে এর মধ্যেও বিনিয়োগকারীরা যে বাজারের সাথে রয়েছেন বাজারগুলোর লেনদেনের বড় ধরনের উন্নতি তারই প্রমাণ। তাই খুব বেশি হতাশ হওয়ার কিছু নেই।
বিগত দিনগুলোর মতো গতকালও সূচকের বড় উন্নতিতেই লেনদেন শুরু করে দুই পুঁজিবাজার। কিন্তু আধঘণ্টার মাথায় বাজারগুলোতে বিক্রয়চাপ সৃষ্টি হয়। দিনের বাকি সময় এ চাপ অব্যাহত থাকলে দিনশেষে দুই বাজারেই সূচকের অবনতি ঘটে। ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) প্রধান সূচক ডিএসইএক্স গতকাল ২৩ দশমিক ৯৩ পয়েন্ট অবনতির শিকার হয়। ৫ হাজার ৮৮৩ দশমিক ৯১ পয়েন্ট থেকে সকালে লেনদেন শুরু করা সূচকটি প্রথমদিকে প্রায় ৩৩ পয়েন্ট উন্নতি রেকর্ড করা হলেও দিনশেষে নেমে আসে ৫ হাজার ৮৫৯ দশমিক ৯৭ পয়েন্টে। একই সময় বাজারটির দুই বিশেষায়িত সূচক ডিএিসই-৩০ ও ডিএসই শরিয়াহ সূচক হারায় যথাক্রমে ৮ দশমিক ৫১ ও ৫ দশমিক ৭৭ পয়েন্ট। একই ভাবে দেশের দ্বিতীয় পুঁজিবাজার চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জে (সিএসই) সার্বিক মূল্যসূচক সিএএসপিআই গতকাল ৭৯ দশমিক ৯১ পয়েন্ট অবনতির শিকার ছিল। এখানে দুই বিশেষায়িত সূচক সিএসই-৩০ ও সিএসসিএক্স সূচকের অবনতি রেকর্ড করা হয় যথাক্রমে ৯১ দশমিক ৮৩ ও ৫৩ দশমিক ৮৫ পয়েন্ট।
সূচকের অবনতির মধ্যেও ঢাকা বাজার গতকাল এক হাজার ১৩০ কোটি টাকার লেনদেন নিষ্পত্তি করতে সক্ষম হয় যা আগের দিন অপেক্ষা ২০৫ কোটি টাকা বেশি। গত বৃহস্পতিবার ডিএসইর লেনদেন ছিল ৯২৫ কোটি টাকা। অপর দিকে চট্টগ্রাম শেয়ারবাজার গতকাল ৭৫ কোটি টাকার লেনদেন নিষ্পত্তি করে যা আপগের দিন অপেক্ষা ৩০ কোটি টাকা বেশি। বৃহস্পতিবার সিএসইর লেনদেন ছিল ৪৫ কোটি টাকা। তবে এখানে এককভাবে ব্যাংকিং কোম্পানি ডাচ্-বাংলা ব্যাংকের লেনদেন ছিল ৩৭ কোটি টাকার বেশি।
দিনের বাজার আচরণের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিক ছিল সূচকের অবনতির মধ্যেও বিনিয়োগকারীরা তাদের মুনাফা তুলে নিচ্ছেন। বিভিন্ন খাতের কোম্পানিগুলোর মূল্যস্তর বিবেচনায় এ মুনাাফা নেয়ার সুযোগ পাচ্ছেন বিনিয়োগকারীরা। গত কয়েকদিন থেকে অন্যান্য খাতের পাশাপাশি মিউচুয়াল ফান্ড ও বীমা খাত বিনিয়াগকারীদের প্রচুর মুনাফা দিয়েছে। এ সময় বরাবরই এ দু’টি খাতে বেশ কিছু কোম্পানিকে দিনের সার্কিট ব্রেকারের সর্বোচ্চ স্তরে পৌঁছে দেখা যায়। গতকালও বীমা খাতের বেশ কিছ কোম্পানি মুনাফা তুলে নেয়ার মতো যথেষ্ট মূল্যবৃদ্ধি ঘটতে দেখা যায়।
এ দিকে দেশের শেয়ারবাজারে মার্জিন ঋণ ব্যবস্থাকে আরো আধুনিক, গতিশীল ও বিনিয়োগবান্ধব করতে বিনিয়োগকারীদের জন্য কিছু বাড়তি সুযোগ রেখে বিদ্যমান বিধিমালায় বড় ধরনের পরিবর্তন আনছে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)। সংশোধিত বিধিমালায় জীবন বীমা খাত ছাড়া অন্যান্য খাতের শেয়ারে মার্জিন ঋণের যোগ্যতা নির্ধারণে সর্বোচ্চ মূল্য-আয় অনুপাত (পিই রেশিও) ৪০ নির্ধারণ করা হয়েছে। একই সাথে বিনিয়োগকারীর পোর্টফোলিওর ইক্যুইটি ২৫ শতাংশের নিচে নেমে গেলে কোনো আগাম নোটিশ ছাড়াই শেয়ার বিক্রি বা ফোর্স সেলের সুযোগ রাখা হয়েছে।
বৃহস্পতিবার মার্জিন ঋণ বিধিমালার সংশোধনের চূড়ান্ত খসড়া অনুমোদন করে গেজেট আকারে প্রকাশের জন্য বাংলাদেশ সরকারি মুদ্রণালয়ে (বিজি প্রেস) পাঠিয়েছে কমিশন। বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন বিএসইসির নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র মো: আবুল কালাম।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, সংশোধিত বিধিমালায় সাধারণ সিকিউরিটিজের জন্য মার্জিন ঋণের অনুপাত ১:১ নির্ধারণ করা হয়েছে। অর্থাৎ কোনো বিনিয়োগকারী তার নিজস্ব ইক্যুইটির সমপরিমাণ অর্থ মার্জিন ঋণ হিসেবে নিতে পারবেন। মার্জিন ঋণের যোগ্যতা নির্ধারণে পিই রেশিওকে প্রধান মানদণ্ড হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। ব্যাংক, নন-লাইফ বীমা এবং অন্যান্য খাতের কোম্পানির শেয়ারের ক্ষেত্রে এ নিয়ম প্রযোজ্য হবে। ঋণসুবিধা পাওয়ার ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ পিই রেশিও ৩০ থেকে বাড়িয়ে ৪০ করা হয়েছে। তবে জীবন বীমা কোম্পানির শেয়ারের ক্ষেত্রে পিই রেশিওর পরিবর্তে ব্যতিক্রম হিসেবে প্রাইস-টু-বুক বা পিবি রেশিও প্রযোজ্য হবে।
নতুন বিধিমালায় প্রথমবারের মতো ট্রেইলিং পিই রেশিও ব্যবহারের বিধান রাখা হয়েছে। এ ব্যবস্থায় কোনো শেয়ারের বর্তমান বাজারমূল্যকে সংশ্লিষ্ট কোম্পানির আগের ১২ মাসে অর্জিত শেয়ার-প্রতি আয় বা ইপিএসের সাথে তুলনা করে পিই রেশিও নির্ধারণ করা হবে। কোনো কোম্পানি ত্রৈমাসিক আর্থিক প্রতিবেদন প্রকাশ করলে সেই প্রতিবেদনের তথ্যের ভিত্তিতে পিই রেশিও হালনাগাদ করতে হবে।
সংশোধিত বিধিমালায় সাধারণ বিনিয়োগকারীদের জন্য মার্জিন কল এবং শেয়ার বিক্রির ক্ষেত্রে আগের তুলনায় কিছুটা বেশি সুযোগ রাখা হয়েছে। নতুন নিয়ম অনুযায়ী, বিনিয়োগকারীর পোর্টফোলিওর ইক্যুইটি ৫০ শতাংশের নিচে নেমে গেলে মার্জিন ঋণদাতা প্রতিষ্ঠান আগাম নোটিশ বা মার্জিন কল দেবে। এরপর ইক্যুইটি ২৫ শতাংশের নিচে নেমে গেলে কোনো ধরনের আগাম নোটিশ ছাড়াই ঋণদাতা প্রতিষ্ঠান শেয়ার বিক্রি করতে পারবে।
এর আগে বিধিমালার প্রাথমিক খসড়ায় পোর্টফোলিওর ইক্যুইটি ৭০ শতাংশের নিচে নামলে মার্জিন কল এবং ৫০ শতাংশের নিচে নেমে গেলে শেয়ার বিক্রির প্রস্তাব করা হয়েছিল। চূড়ান্ত খসড়ায় সেই সীমা আরো শিথিল করে যথাক্রমে ৫০ শতাংশ ও ২৫ শতাংশ করা হয়েছে।
সংশোধিত বিধিমালা অনুযায়ী, ‘জেড’, ‘এন’ ও ‘জি’ ক্যাটাগরিভুক্ত কোম্পানির শেয়ারে মার্জিন ঋণ সুবিধা পাওয়া যাবে না। একইভাবে এসএমই বোর্ড, অলারনেটিভ ট্রেডিং বোর্ড (এটিবি) এবং ওভার দ্য কাউন্টার (ওটিসি) প্ল্যাটফর্মে তালিকাভুক্ত সিকিউরিটিজও মার্জিন ঋণের আওতার বাইরে থাকবে। শুধু স্টক এক্সচেঞ্জের মূল বাজারে তালিকাভুক্ত ‘এ’ ও ‘বি’ ক্যাটাগরির শেয়ারের ক্ষেত্রেই মার্জিন ঋণ সুবিধা পাওয়া যাবে।



