মুহা: আব্দুল আউয়াল রাজশাহী
গ্যাস ও বিদ্যুতের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ না থাকা, যোগাযোগ অবকাঠামোর অভাব, শিল্পঋণ পাওয়ার জটিলতায় অনেক উদ্যোক্তা আগ্রহ হারাচ্ছেন
দেশের অন্যতম কৃষিপ্রধান অঞ্চল রাজশাহী বিভাগ। আম, ধান, গম, আলু, টমেটো, সরিষা, পেঁয়াজ, সবজি ও মাছ উৎপাদনে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখা এ অঞ্চলকে ঘিরে কৃষিভিত্তিক শিল্পের ব্যাপক সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, পরিকল্পিত উদ্যোগ, আধুনিক অবকাঠামো এবং সরকারি-বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়ানো গেলে রাজশাহী দেশের অন্যতম বৃহৎ কৃষি-শিল্পাঞ্চলে পরিণত হতে পারে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, নওগাঁ ও নাটোরে প্রতিবছর বিপুল পরিমাণ আম উৎপাদিত হয়। এ আমকে কেন্দ্র করে জুস, পাল্প, জ্যাম, জেলি, আমচুর, ম্যাঙ্গো বারসহ বিভিন্ন প্রক্রিয়াজাত পণ্য উৎপাদনের সুযোগ রয়েছে। একইভাবে টমেটো থেকে সস ও পেস্ট, আলু থেকে চিপস ও স্টার্চ, ধান থেকে মূল্যসংযোজিত খাদ্যপণ্য এবং সরিষা থেকে ভোজ্যতেল উৎপাদনে বিরাট সম্ভাবনা রয়েছে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের তথ্য অনুযায়ী, রাজশাহী অঞ্চলে প্রতিবছর হাজার কোটি টাকার আম উৎপাদিত হয়। কৃষিপণ্যকে কেন্দ্র করে পরিবহন, প্যাকেজিং, বিপণন ও অনলাইন বাণিজ্যখাতে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডও বাড়ছে। ফলে কৃষিনির্ভর গ্রামীণ অর্থনীতি আরো গতিশীল হচ্ছে।
স্থানীয় ব্যবসায়ী ও কৃষক নেতারা মনে করেন, কৃষিপণ্য সংরক্ষণ ও প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্প গড়ে উঠলে কৃষকরা ন্যায্যমূল্য পাবেন এবং মৌসুমভিত্তিক মূল্যপতনের ঝুঁকি কমবে। একইসাথে খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, কোল্ড স্টোরেজ, প্যাকেজিং ও রফতানি খাতে নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে।
তবে সম্ভাবনার পাশাপাশি রয়েছে নানা চ্যালেঞ্জ। শিল্প উদ্যোক্তাদের অভিযোগ, গ্যাস ও বিদ্যুতের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ না থাকা, উন্নত যোগাযোগ অবকাঠামোর অভাব, শিল্পঋণ পাওয়ার জটিলতা এবং আধুনিক সংরক্ষণ ব্যবস্থার ঘাটতির কারণে অনেক উদ্যোক্তা বিনিয়োগে আগ্রহ হারাচ্ছেন। পর্যাপ্ত জমি ও শ্রমশক্তি থাকা সত্ত্বেও প্রয়োজনীয় শিল্প অবকাঠামো তাই এখনো পুরোপুরি গড়ে ওঠেনি।
কৃষিপণ্য সংরক্ষণের জন্য পর্যাপ্ত কোল্ড স্টোরেজ ও হিমাগারের অভাবও বড় সমস্যা। ফলে মৌসুমে উৎপাদন বেশি হলে কৃষকরা লোকসানের মুখে পড়েন। অনেক ক্ষেত্রে আম, টমেটো ও বিভিন্ন সবজি সংরক্ষণের অভাবে নষ্ট হয়ে যায়। সংশ্লিষ্টদের মতে, কৃষি ও শিল্প উন্নয়নের মধ্যে সমন্বিত পরিকল্পনার অভাব এ অঞ্চলের সম্ভাবনা বাস্তবায়নের পথে অন্যতম বাধা।
জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবও কৃষিভিত্তিক শিল্পের জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে। খরা, পানির সঙ্কট, অতিরিক্ত তাপমাত্রা এবং অনিয়মিত আবহাওয়ার কারণে কৃষি উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। পাশাপাশি কৃষিজমি অন্য খাতে ব্যবহার এবং আমবাগানের পরিমাণ কমে যাওয়াও উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
অর্থনীতিবিদ ও কৃষি বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, কৃষিভিত্তিক শিল্প বিকাশে সরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়ানো জরুরি। এ জন্য শিল্পপার্ক, বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল, খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ জোন ও কৃষিপণ্য রফতানিকেন্দ্র গড়ে তোলার দাবি উঠছে। একইসাথে উদ্যোক্তাদের জন্য স্বল্পসুদে ঋণ, কর-সুবিধা, প্রযুক্তিগত সহায়তা ও প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা প্রয়োজন।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, কৃষি উদ্যোক্তা তৈরিতে সরকার ইতোমধ্যে বিভিন্ন প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে। জলবায়ু সহনশীল কৃষি উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় নতুন উদ্যোক্তা তৈরির উদ্যোগও নেয়া হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এসব প্রকল্পের সাথে শিল্পায়ন কার্যক্রম সমন্বয় করা গেলে রাজশাহী অঞ্চলে নতুন অর্থনৈতিক গতি সৃষ্টি হবে।
রাজশাহী চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি হাসেন আলী বলেন, কৃষিভিত্তিক শিল্পের সম্ভাবনা কাজে লাগাতে বর্তমানে একটি সমন্বিত রূপরেখা প্রণয়নের কাজ চলছে। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের সাথে আলোচনা অব্যাহত রয়েছে এবং শিগগিরই মন্ত্রণালয় পর্যায়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, আধুনিক সংরক্ষণ ব্যবস্থা, উন্নত অবকাঠামো, সহজশর্তে অর্থায়ন ও কার্যকর নীতিগত সহায়তা নিশ্চিত করা গেলে কৃষিভিত্তিক শিল্পে রাজশাহী অঞ্চল দেশের অর্থনীতিতে আরো বড় অবদান রাখতে সক্ষম হবে।



