হরমুজ প্রণালী বন্ধে চিন্তার কোনো কারণ নেই : বাণিজ্যমন্ত্রী

Printed Edition

বিশেষ সংবাদদাতা

ইরান যুদ্ধের কারণে হরমুজ প্রণালী বন্ধ হলেও আজ পর্যন্ত বাংলাদেশের চিন্তার কোনো কারণ নেই বলে মন্তব্য করেছেন বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির।

তিনি বলেছেন, দুই-চারদিনের মধ্যে এই সংঘাতের সমাধান ঘটলে জ্বালানিসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য নিয়ে বাংলাদেশের আশঙ্কার কিছু নেই।

গতকাল সোমবার সচিবালয়ে ভারতীয় হাইকমিশনার প্রণয় ভার্মার সাথে সৌজন্য সাক্ষাৎ শেষে সাংবাদিকদের তিনি বলেন, জ্বালানি ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য নিয়ে আজকের দিনে, এই মুহূর্তে আমাদের চিন্তার কোনো কারণ নেই। আমরা দেখছি, পরিস্থিতি কোনদিকে যায়।

বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, ইরান যুদ্ধের কারণে হরমুজ প্রণালী বন্ধ হলে জাহাজগুলোকে আফ্রিকার উত্তমাশা অন্তরীণ ঘুরে আসতে হয়। সেক্ষেত্রে জাহাজ ভাড়া বেড়ে যায়, যার প্রভাবে সব পণ্যের দাম বাড়ে। তবে এ ধরনের কোনো পরিস্থিতি আমাদের এখনো তৈরি হয়নি।

এদিকে, ভারতে হাইকমিশনারের সাথে বৈঠকের বিষয়ে বাণিজ্যমন্ত্রী জানান, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় তৈরি হওয়া প্রতিবন্ধকতা দূর করে বাংলাদেশ-ভারত দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক এগিয়ে নিতে বন্ধ থাকা স্থলবন্দর ও বর্ডার হাট আবার চালুর বিষয়ে আমরা আশাবাদী।

তিনি বলেন, ভারতের ডিজিটাল অবকাঠামো ব্যবহারের সুযোগ এবং বাংলাদেশ-ভারত কমপ্রিহেনসিভ ইকোনমিক পার্টনারশিপ অ্যাগ্রিমেন্ট (সেপা) নিয়েও আলোচনা হয়েছে।

বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, দুই দেশের মধ্যে বছরে প্রায় ১১ বিলিয়ন ডলারের বাণিজ্য হয়। বাংলাদেশ ভারত থেকে প্রায় ৯ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলার আমদানি করে এবং প্রায় ১ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলার রফতানি করে। এ প্রেক্ষাপটে ভারতের সাথে বাণিজ্য সম্পর্ক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ভবিষ্যতে বাণিজ্য সম্প্রসারণের সম্ভাব্য খাতগুলো নিয়েও আলোচনা হয়েছে।

তিনি বলেন, বর্ডার হাট ও স্থলবন্দরগুলো ধীরে ধীরে চালু করে বাণিজ্য সম্পর্ক আরো শক্তিশালী করার বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। বর্তমানে বেনাপোল ছাড়া অন্য স্থলবন্দরগুলো বন্ধ রয়েছে। ভারত বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে এগিয়েছে। তাদের অবকাঠামো ও প্রযুক্তিগত সহায়তা পাওয়ার বিষয়েও কথা হয়েছে।

গত দেড় বছরে বিভিন্ন ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে দুই দেশ একে অপরের ওপর কিছু বিধিনিষেধ আরোপ করেছে, যা বাণিজ্যে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করেছে বলে উল্লেখ করেন তিনি। ভবিষ্যতে বাণিজ্য সম্প্রসারণের মাধ্যমে এসব সমস্যার সমাধান হবে বলে আশা প্রকাশ করেন মন্ত্রী।

সাংবাদিকদের কাছে ভারতীয় হাইকমিশনার প্রণয় ভার্মা বলেন, দুই দেশের মধ্যে ইতঃমধ্যে শক্তিশালী বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক রয়েছে। ভৌগোলিক নৈকট্য কাজে লাগিয়ে এই সম্পর্ক আরো সহজ ও গতিশীল করার বিষয়ে আলোচনা হয়েছে।

তিনি বলেন, ভারত ও বাংলাদেশ এ অঞ্চলের বড় অর্থনীতি। তাই একসাথে কাজ করার বিস্তর সুযোগ রয়েছে। জাতীয় স্বার্থকে প্রাধান্য দিয়ে উভয় দেশ সম্পর্ক আরো এগিয়ে নিতে চায়।

সেপা ও ট্রান্সশিপমেন্ট নিয়ে নির্দিষ্ট কোনো আলোচনা হয়নি উল্লেখ করে হাইকমিশনার বলেন, এসব বিষয় দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য ও অর্থনীতির সাথে সংশ্লিষ্ট। স্থলবন্দরগুলো চালু করাও গুরুত্বপূর্ণ।

অর্থনীতি ও বিনিয়োগ সম্পর্ক উন্নয়নে বাংলাদেশের সাথে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করতে আগ্রহী বলে জানিয়েছেন ভারতীয় হাইকমিশনার প্রণয় কুমার ভার্মা।

ভারতীয় হাইকমিশনার বলেন, আমাদের ভবিষ্যৎ সহযোগিতা যেন নিজ নিজ জাতীয় অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে হয় সেটি নিয়েও কথা হয়েছে। কিভাবে এটিকে আরো ভবিষ্যৎমুখী, প্রযুক্তি ও উদ্ভাবননির্ভর করা যায়, আমাদের অর্জনগুলোকে ব্যবহার করে কিভাবে অর্থনৈতিক সম্পর্ক সম্প্রসারণ করা যায়, বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সম্পর্ক আরো গভীর করা যায় এসব বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়েছে।

তিনি বলেন, আমি নতুন সরকারের সাথে ঘনিষ্ঠভাবে সম্পৃক্ত হওয়ার এবং পারস্পরিক স্বার্থ ও পারস্পরিক সুবিধার ভিত্তিতে ইতিবাচক, গঠনমূলক ও ভবিষ্যৎমুখীভাবে একসাথে কাজ করে আমাদের বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক এবং মানুষকেন্দ্রিক সহযোগিতা জোরদার করার আমাদের আগ্রহের কথা জানিয়েছি।

প্রণয় ভার্মা বলেন, আমাদের দুই দেশের মধ্যে অত্যন্ত শক্তিশালী বাণিজ্য, অর্থনৈতিক ও ব্যবসায়িক সম্পর্ক রয়েছে। কিভাবে এটিকে আরো এগিয়ে নেয়া যায়, তা নিয়ে আলোচনা করেছি। কিভাবে দুই দেশের বিভিন্ন খাতে ব্যবসাগুলোর জন্য পারস্পরিক সম্পৃক্ততা সহজ করা যায় এবং কিভাবে আমরা একসাথে কাজ করতে পারি যাতে আমাদের ভৌগোলিক নৈকট্য, দুই দেশের মধ্যে যে ঘনিষ্ঠতা রয়েছে, তা নতুন অর্থনৈতিক সুযোগে রূপান্তরিত করা যায় সেটি নিয়ে আলোচনা হয়েছে।

এ ছাড়া নতুন প্রেক্ষাপটে, আমাদের নতুন অর্থনৈতিক সক্ষমতার সাথে সামঞ্জস্য রেখে কিভাবে অর্থনৈতিক সম্পর্ক এগিয়ে নেয়া যায়, সে বিষয়ে কী ধরনের কৌশল হওয়া উচিত, এগুলো নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা দুই দেশের বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের বিষয়। আমাদের খুব প্রাথমিক আলোচনা হয়েছে।

চা, চামড়া প্রক্রিয়াকরণ ও হালকা প্রকৌশল শিল্পে যুক্তরাজ্যের বিনিয়োগ আগ্রহ

বাংলাদেশে চা, চামড়া প্রক্রিয়াকরণ ও হালকা প্রকৌশল শিল্পের মতো খাতে বিনিয়োগ করতে যুক্তরাজ্যের বিনিয়োগকারীরা আগ্রহী বলে জানিয়েছেন ঢাকায় নিযুক্ত দেশটির হাইকমিশনার সারাহ কুক।

গতকাল বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদিরের সাথে সাক্ষাৎকালে তিনি এ তথ্য জানান। সকালে সচিবালয়ে মন্ত্রীর কার্যালয়ে এ সাক্ষাৎ হয়।

এ সময় দুই দেশের মধ্যকার বিদ্যমান বাণিজ্য সম্পর্ক আরো জোরদার করা এবং নতুন নতুন খাতে বিনিয়োগের সম্ভাবনা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়।

বাণিজ্যমন্ত্রী মুক্তাদির বলেন, বাংলাদেশ কার্যকর ও টেকসই অর্থনৈতিক সম্পর্ক উন্নয়নের মাধ্যমে পারস্পরিক সুবিধা নিশ্চিত করতে যুক্তরাজ্যের সাথে কাজ করতে চায়।

তিনি জানান, সিলেটের চা শিল্পের আধুনিকায়ন ও উৎপাদন বৃদ্ধিতে যুক্তরাজ্যের বিনিয়োগ প্রয়োজন। সেখানকার চা বাগানে বিনিয়োগের বিশাল সম্ভাবনা রয়েছে। বাংলাদেশের চা শিল্পে যুক্তরাজ্যের বিনিয়োগের অতীত অভিজ্ঞতা আছে। এ খাতে বিনিয়োগ বাড়ালে নতুন কর্মসংস্থান বাড়বে এবং একই সাথে পর্যটন শিল্পের বিকাশ ঘটবে।

বাণিজ্যমন্ত্রী আরো বলেন, বাংলাদেশের সার কারখানাগুলো গ্যাস-সঙ্কটে পুরো বছর চালু থাকে না। তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাসের (এলপিজি) মাধ্যমে বছরজুড়ে সার কারখানা চালু করার জন্য বিদেশী বিনিয়োগকারী প্রয়োজন।

তিনি ব্রিটিশ বিনিয়োগকারীদের সার কারখানাগুলোর পাশাপাশি দেশের ক্রমবর্ধমান তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি খাতে বিনিয়োগের আহ্বান জানান।

এ সময় ব্রিটিশ হাইকমিশনার সারাহ কুক দুই দেশের মধ্যকার দীর্ঘদিনের অংশীদারত্বমূলক বাণিজ্য সম্পর্ক এগিয়ে নেয়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন। তিনি বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের ট্রেড নেগোসিয়েশন পুলের সাথে যুক্ত কর্মকর্তাদের দক্ষতা বৃদ্ধিতে সহায়তা করার আগ্রহ প্রকাশ করেন।

হাইকমিশনার সিলেটের চা বাগান, সামুদ্রিক খাবার, চামড়া প্রক্রিয়াকরণ, রফতানি বৈচিত্র্যকরণ ও হালকা প্রকৌশল শিল্পে বিনিয়োগে বিশেষ আগ্রহ দেখান। তিনি বলেন, এসব খাতে যুক্তরাজ্যের বিনিয়োগকারীরা কাজ করতে আগ্রহী।

বৈঠকে বাণিজ্য প্রতিমন্ত্রী মো: শরীফুল আলম, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সচিব মাহবুবুর রহমান ও অতিরিক্ত সচিব (রফতানি) মো: আবদুর রহিম খান উপস্থিত ছিলেন।