বিশ্বকাপ ফুটবল ২০২৬

প্রথমার্ধের ৩ গোলেই স্বস্তি ফেরাল ব্রাজিল

Printed Edition
দ্বিতীয় গোল করার পর কুনহাকে নিয়ে সতীর্থদের সাম্বা নৃত্যের নতুন স্টাইলে ব্রাজিলের উদযাপন  : ইন্টারনেট
দ্বিতীয় গোল করার পর কুনহাকে নিয়ে সতীর্থদের সাম্বা নৃত্যের নতুন স্টাইলে ব্রাজিলের উদযাপন : ইন্টারনেট

ক্রীড়া প্রতিবেদক

সমর্থকদের যেন হাফ ছেড়ে বাঁচাল পাঁচবারের বিশ্বকাপজয়ীরা। দাপটের সাথে খেলেই গ্রুপসেরা হওয়ার সম্ভাবনা ভালোভাবে টিকিয়ে রেখেছে তারা। মরক্কোর বিপক্ষে ১-১ গোলের ড্র দিয়ে মিশন শুরু করে সমর্থকদের নিরাশ করেছিল ব্রাজিল। আফ্রিকার দেশটির বিপক্ষে ম্যাচে তাদের রক্ষণভাগ ছিল ছন্নছাড়া। মাঝমাঠের অবস্থাও ছিল যাচ্ছেতাই। পুরো ম্যাচে সেলেকাওদের চিরাচরিত ফুটবলসৌন্দর্যের দেখা মেলেনি। শুরুতে পিছিয়ে পড়ার পর ভিনিসিয়াস জুনিয়রের চোখ ধাঁধানো গোলে ১ পয়েন্ট নিয়ে মাঠ ছাড়ে কার্লো অ্যানচেলোত্তির দল। আফ্রিকানদের সাথে ড্র’র ফলে দ্বিতীয় ম্যাচে হাইতির বিপক্ষে জয়ের বিকল্প ছিল না ব্রাজিলের সামনে। অপেক্ষাকৃত দুর্বল দলটির বিপক্ষে গোছাল নৈপুণ্যে ৩-০ গোলের স্বস্তির জয় নিয়ে মাঠ ছাড়ে সেলেকাওরা। তবে দ্বিতীয়ার্ধে তাদের ধারাবাহিক আক্রমণ হাইতির জাল খুঁজে না পাওয়াটা সমর্থকদের জন্য ছিল অস্বস্তির। তিন গোলের শেষটি করেছেন ভিনিসিয়াস। আর ম্যাথিউস কুনহার করা দুই গোলেও অবদান ছিল রিয়াল মাদ্রিদের এই উইঙ্গারের। ক্লাব ফুটবলে রিয়াল মাদ্রিদের হয়ে দারুণ ছন্দে থাকা ভিনিসিয়াস প্রত্যাশা পূরণ করতে পারছিলেন না জাতীয় দলের জার্সিতে। এবার টানা দুই ম্যাচেই পেলেন গোল।

ফিলাডেলফিয়ার লিঙ্কন ফিল্ড স্টেডিয়ামে বিশ্বকাপের ‘সি’ গ্রুপের ম্যাচে বল পজিশন ও আক্রমণে আধিপত্য ছিল ব্রাজিলের। ৫৭ শতাংশ সময় বল নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রেখে গোলের জন্য নেয়া ৯ শটের পাঁচটি লক্ষ্যে রেখে তিন গোলের জয় নিশ্চিত করে রেকর্ড পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়নরা। অপর দিকে ৮ শটের চারটি লক্ষ্যে রেখে ব্রাজিলের রক্ষণে ভালোই চাপ সৃষ্টি করেছিল ৫২ বছর পর দ্বিতীয়বার বিশ্বকাপে ফেরা ক্যারিবীয় দ্বীপপুঞ্জের দেশটি। গোটা ম্যাচে ব্রাজিলকে খুব বেশি চ্যালেঞ্জে পড়তে হয়নি। শেষ দিকে কিছু আক্রমণ ছাড়া গোলরক্ষক আলিসন বেকারের পরীক্ষা তেমন একটা নিতে পারেনি হাইতি।

ম্যাচের শুরু থেকে বলের নিয়ন্ত্রণ নেয়ার চেষ্টা করে ব্রাজিল। দানিলোর পা মাড়িয়ে চতুর্থ মিনিটেই হলুদ কার্ড দেখে হাইতির আর্কাস। পরের মিনিটে গোল কিক নিতে একটু দেরি করেন হাইতির গোলরক্ষক। এতে ফিফার নতুন নিয়ম অনুযায়ী কর্নার পায় ব্রাজিল। যদিও তা কাজে লাগাতে পারেনি তারা। ১৩ মিনিটে প্রথমবার রাফিনহার বল জালের দেখা পেলেও অফসাইডের কারণে গোল বাতিল করেন রেফারি।

১৮ মিনিটে ডান দিক থেকে রাফিনহা বক্সে একটি জোরাল শট নেন। হাইতির গোলরক্ষক বলটি ঘুষি মেরে নিরাপদ করতে পারেননি। বল চলে যায় বক্সের বাঁ দিকে ভিনিসিয়াসের কাছে। এই ফরোয়ার্ড ডান দিকে ওপরে শট নেয়ার চেষ্টা করেন; কিন্তু তার শট প্রতিহত হয়ে কর্নার হয়। এত সুযোগ হাতছাড়া হলেও মনে হচ্ছিল, যেকোনো সময় গোল আসবে। সেই গোল ধরা দেয় ম্যাচের ২৩ মিনিটে। ব্রাজিলের আক্রমণ থেকে জটলা তৈরি হয় হাইতির বক্সে। এতে ডিফেন্ডাররা পরস্পরের ওপর পড়ে গেলে সেই সুযোগে কোনোরকমে বল ঠেলে দেন কুনহা। কিন্তু হাইতির একজনের গায়ে লেগে দিক পরিবর্তনে বলটি ফের তার শরীরে লেগে জালে প্রবেশ করে।

ব্রাজিলের দ্বিতীয় গোলটি ছিল চোখ ধাঁধানো। মাঝমাঠের একটু ওপর থেকে বল নিয়ে দ্রুতগতিতে এগিয়ে প্রতিপক্ষের তিনজনের মধ্য দিয়ে দারুণ পাস দেন ভিনিসিয়াস। বল ধরে বক্সে ঢুকে প্রায় ‘রঙ ফুটেড’ হয়ে যাচ্ছিল কুনহার। কিন্তু সামলে নিয়ে বাঁ পায়ের জোরাল শটে বল জালে পাঠিয়ে দেন। কিছুই করার ছিল না হাইতির গোলরক্ষক জনি প্লাসিডের। গোলের পর সতীর্থদের নিয়ে নতুন ধরনের এক নাচ দিয়ে উদযাপন করেন ম্যানচেস্টার ইউনাটেডের এই ফরোয়ার্ড।

ব্রাজিলের জন্য অনেকটা দুঃসংবাদ বলা যায় ম্যাচের ৩৯ মিনিটটি। চোট পেয়ে মাঠ ছাড়েন রাফিনহা। ধারাভাষ্যকাররা বলছিলেন, হয়তো সতর্কতার জন্যই বার্সেলোনার ফরোয়ার্ডকে তুলে নিচ্ছেন কোচ। তবে কারো সাথে লেগে বা দৃশ্যমান কোনো ঘটনায় এই চোট হয়নি। যেটির মানে, হ্যামস্ট্রিংয়ে টান লাগতে পারে তার। অনেক সময় এটি গুরুতর হয়ে থাকে। তার বদলে নামেন তরুণ প্রতিভা রায়ান।

প্রথমার্ধের যোগ করা সময়ের তৃতীয় মিনিটে গোল পান ভিনিসিয়াস। নিজেদের অর্ধ থেকে হাইতির হাই-লাইন ডিফেন্সের ওপর দিয়ে দারুণ বুদ্ধিদীপ্ত ও নিখুঁত চিপ করেন লুকাস পাকুয়েতা। বল ধরে দ্রুত ঢুকে আগুয়ান গোলরক্ষকের পায়ের নিচ দিয়ে ঠাণ্ডা মাথায় বল জালে পাঠান রিয়ালের এই উইঙ্গার।

দ্বিতীয়ার্ধের শুরুতে কিছু ঝটিকা আক্রমণে ম্যাচে ফেরার চেষ্টা করে হাইতি। তবে ব্রাজিলের রক্ষণকে বিপাকে ফেলতে পারেনি খুব একটা। উল্টো ৫৫ মিনিটে বিপজ্জনকভাবে বক্সে ঢুকে যান ভিনিসিয়াস। তবে এবার তাকে শট নেয়ার জায়গা দেননি হাইতির ডিফেন্ডাররা। গোল করার সেরা সুযোগ পায় হাইতি ৬৪ মিনিটে। কর্নার থেকে অনেকটা লাফিয়ে হেড করেন রিকার্ডো আদে। দারুণ রিফ্লেক্সে তা ফিরিয়ে দেন ব্রাজিলিয়ান গোলরক্ষক বেকার। তবে দলকে পুরো বিপদমুক্ত করতে পারেননি তিনি। বল ভেসে ওপরে উঠলে ছুটে এসে ওভারহেড কিকে দলকে রক্ষা করেন দানিলো। ৬৫ মিনিটে কুনহা ও পাকুয়েতাকে উঠিয়ে কোচ মাঠে নামান এন্দ্রিক ও গ্যাব্রিয়েল মার্টিনেল্লিকে।

তিন মিনিট পরই ভিনিসিয়াসের নান্দনিক ব্যাক হিল থেকে পাওয়া বলে আর্সেনালের এই ফরোয়ার্ডের জোরাল শট ক্রসবারে লেগে ফেরত আসে। ৭৫ মিনিটে রায়ানের চমৎকার পাস থেকে ডগলাসের জোরাল শট ক্রসবারের একটু ওপর দিয়ে চলে যায়। দুই মিনিট পর রায়ানের পাস থেকে হাইতির গোলরক্ষকের পায়ের ফাঁক দিয়ে বল জালে জড়িয়ে উদযাপন শুরু করেন এন্দ্রিক। কিন্তু বিশ্বকাপ অভিষেকে তাকে হতাশ হয়ে থামতে হয় অফসাইডের বাঁশি শুনে। ৯০ মিনিট শেষে যোগ করা সময়ে দারুণ কয়েকটি আক্রমণ ও পাল্টা আক্রমণে ম্যাচ জমে উঠলেও গোল পায়নি কোনো দলই। গ্রুপ সেরা হওয়ার জন্য বাংলাদেশ সময় ২৫ জুন ভোর ৪টায় মিয়ামিতে স্কটল্যান্ডের বিপক্ষে ভালভাবেই জিততে হবে ব্রাজিলকে। মরক্কো হাইতির বিপক্ষে খেলবে একই সময়ে আটলান্টায়।