গৃহহীন হচ্ছে হাজার হাজার মানুষ
নদীর বুক চিরে চলছে বালু উত্তোলন, যার ৭০ ভাগই অবৈধ। এতে গিলছে ফসলি জমি, হুমকিতে পড়ছে কোটি টাকার সরকারি বাঁধ। বদলে যাচ্ছে নদীর স্বাভাবিক গতিপথ।
দেশে অপরিকল্পিত ও অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের ফলে পরিবেশ, অর্থনীতি এবং জনজীবনে মারাত্মক বিপর্যয় নেমে আসছে। ভিটেমাটি হারিয়ে গৃহহীন হচ্ছেন হাজার হাজার মানুষ। নদীগুলোর তলদেশে শক্তিশালী ড্রেজার বা ‘বোমা ড্রেজার’ বসিয়ে দিন-রাত বালু উত্তোলনে অনেক তীরবর্তী ফসলি জমি ধ্বংস হচ্ছে। বালু ও মাটি পরিবহনের সুবিধার্থে অনেক জায়গায় স্বাভাবিক প্রবাহ বন্ধ করে নদীর বুকেই তৈরি করা হচ্ছে মাটির রাস্তা। এতে নদীভাঙন তীব্র্র রূপ নিচ্ছে। এ ছাড়া ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নেমে গিয়ে চাষাবাদের জমিতে দেখা দিচ্ছে সেচ সঙ্কট। ধসে পড়ছে কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত সরকারের নদীরক্ষা বাঁধ এবং সিসি ব্লক। ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছে সেতু ও কালভার্ট। ড্রেজার দিয়ে নদীর তলদেশ গভীর করায় তীরের মাটি আলগা হয়ে ভেঙে পড়ছে। এতে তীব্র হচ্ছে নদীভাঙন, বিলীন হচ্ছে কৃষিজমি ও অনেক বসতভিটা।
স্থানীয়রা বলছেন, এতে জড়িত অবৈধ বালু ব্যবসায়ী, রাজনৈতিক প্রভাবশালী ব্যক্তি এবং স্থানীয় ইজারাদার। তারা প্রশাসনের নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে ড্রেজার ও অন্যান্য যন্ত্রের সাহায্যে বালু উত্তোলন করছেন। দেশে অনুমোদিত বালুমহালের চেয়ে নদী থেকে লুকিয়ে বা রাতে আঁধারে অবৈধ উপায়ে অনেক বেশি বালু তোলা হয়। কোনো পয়েন্টে দিনে পাঁচ হাজার ঘনফুট তোলার সরকারি অনুমতি থাকলে, ইজারাদাররা আইন অমান্য করে তার চেয়ে কয়েক গুণ বেশি বালু তুলে নেন। বাংলাদেশে প্রতিদিন নদী থেকে ঠিক কত টন বালু উত্তোলন করা হয়, তার সুনির্দিষ্ট ও নির্ভুল কোনো সরকারি পরিসংখ্যান বা ডাটা নেই। তবে জাতিসঙ্ঘের পরিবেশ কর্মসূচির প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিশ্বজুড়ে প্রতি বছর নদী ও সমুদ্র থেকে তিন হাজার ২০০ থেকে পাঁচ হাজার কোটি (৩২-৫০ বিলিয়ন) টন বালু ও পাথর উত্তোলন করা হয়। এই বিশাল পরিমাণের একটি বড় অংশ বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার দ্রুত নগরায়ন হওয়া উন্নয়নশীল দেশগুলোতেই উত্তোলিত হচ্ছে।
অন্য দিকে বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতি (বেলা) এবং বেসরকারি একাধিক প্রতিষ্ঠানের পরিসংখ্যান বলছে, দেশের বাজারে সরবরাহ হওয়া বালুর প্রায় ৬০ থেকে ৭০ ভাগই অবৈধভাবে তোলা হয়, যার হিসাব কোনো খাতায় থাকে না। তবে বিভিন্ন বৈশ্বিক গবেষণা, ড্রেজার ধারণক্ষমতা এবং আংশিক ইজারার হিসাব থেকে দৈনিক বালু উত্তোলনের একটি বড় ধারণা পাওয়া যায়। তাতে বলা হয়, সিলেট অঞ্চলের মাঝারি আকারের একটি নদী (যেমন- সারি নদী) থেকেই প্রতিদিন প্রায় ৩৭ হাজার ৫০০ ঘনফুট বালু বাণিজ্যিকভাবে তোলা হয়। আর দেশের প্রধান নদীগুলোতে (পদ্মা, মেঘনা, যমুনা) শত শত মাঝারি ও বড় ড্রেজার চলে। প্রতিটি মাঝারি ড্রেজার দৈনিক ২০ থেকে ৫০ হাজার ঘনফুট এবং বড় ‘বোমা ড্রেজার’ দিনে এক লাখ ঘনফুটের বেশি বালু তুলতে পারে। সেই হিসাবে দেশের শত শত পয়েন্টে চলমান ড্রেজারগুলোর মাধ্যমে প্রতিদিন নদী থেকে কয়েক লাখ টন বালু উত্তোলন করা হচ্ছে।
বাংলাদেশে নদী রক্ষা কমিশন ও পরিবেশবাদী সংগঠনগুলোর বিভিন্ন সমীক্ষা অনুসারে, দেশের প্রধান এবং বড় নদীগুলো থেকেই সবচেয়ে বেশি বালু উত্তোলন করা হয়। এর মধ্যে পদ্মা, মেঘনা, যমুনা, ব্রহ্মপুত্র এবং সুরমা-কুশিয়ারা নদী থেকে সবচেয়ে বেশি পরিমাণে বালু তোলা হয়। যার মধ্যে পদ্মা নদীর কুষ্টিয়া, রাজবাড়ী (গোয়ালন্দ) থেকে পাবনার পাকশী চ্যানেল এবং মুন্সীগঞ্জ অংশে ব্যাপকহারে বালু তোলা হয়।
মেঘনা নদীর চাঁদপুর (ষাটনল, এখলাসপুর), নারায়ণগঞ্জ (সোনারগাঁও, আড়াইহাজার) এবং ভৈরব অংশ বালু উত্তোলনের বড় কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। যমুনা নদীর সিরাজগঞ্জ, টাঙ্গাইল এবং মানিকগঞ্জ জেলাসংলগ্ন যমুনা নদীর বিভিন্ন পয়েন্ট থেকেও দিন-রাত বালু তোলা হচ্ছে।
সিলেট ও সুনামগঞ্জে সুরমা, কুশিয়ারা ও যাদুকাটা নদী থেকে অবাধে বালু ও পাথর উত্তোলন করা হচ্ছে। এ ছাড়া অন্যান্য মাঝারি ও পাহাড়ি মহাদেও নদ (নেত্রকোনা) থেকে আদালতের নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে প্রতিদিন শতাধিক নৌকায় বালু তোলা হচ্ছে। নবগঙ্গা নদী (নড়াইল) ইজারার সীমানা অতিক্রম করে অবৈধ ড্রেজার বসিয়ে বালু কাটার বিরুদ্ধে স্থানীয়রা আন্দোলন করছেন। পাহাড়ি ছড়া ও নদী (মৌলভীবাজার/শ্রীমঙ্গল) সমতলের পাশাপাশি শ্রীমঙ্গলের পাহাড়ি ছড়া ও নদীগুলো থেকেও অবৈধভাবে বালু লুটপাট করছে শক্তিশালী সিন্ডিকেট।
সেন্টার ফর এনভায়রনমেন্টাল অ্যান্ড জিওগ্রাফিক ইনফরমেশন সার্ভিসেসের তথ্যমতে, দেশের প্রধান নদীগুলোর ভাঙনে প্রতি বছর হাজার হাজার হেক্টর জমি বিলীন হয়, যার অন্যতম প্রধান কারণ অপরিকল্পিত বালু উত্তোলন। এ ছাড়া প্রতি বছর নদীভাঙনের শিকার হয়ে হাজার হাজার মানুষ নিঃস্ব ও গৃহহীন হয়ে শহরে বস্তিবাসী হতে বাধ্য হচ্ছেন। যা দেশের ওপর সামাজিক ও অর্থনৈতিক চাপ বাড়াচ্ছে।
সরকারি হিসাবে দেশে মাত্র কয়েকটি বালুমহাল কয়েক লাখ টাকায় ইজারা দেয়া হলেও, অবৈধ সিন্ডিকেটগুলো ড্রেজার বসিয়ে প্রতিদিন গড়ে ১৫ থেকে ২০ লাখ টাকা মূল্যের বালু অবৈধভাবে বিক্রি করে লুটে নিচ্ছে। এতে সরকার কোটি কোটি টাকার রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।
এ বিষয়ে পরিবেশ বিজ্ঞানী ও মানারাত ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির ভিসি বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ, গবেষক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল ও পরিবেশ বিভাগের সাবেক বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আব্দুর রব নয়া দিগন্তকে বলেন, নদীর তলদেশ খুঁড়ে ফেলায় জলজ প্রাণীর প্রজনন ক্ষেত্র ধ্বংস হচ্ছে এবং মাছের উৎপাদন কমে যাওয়ায় জেলে সম্প্রদায় জীবিকা হারাচ্ছে। বনের ভেতরের ছড়া ও নদী থেকে বালু তোলায় মাটির ক্ষয় ও পাহাড় ধসের ঝুঁকি বাড়ছে, যা দেশের দীর্ঘমেয়াদি পরিবেশগত ভারসাম্য নষ্ট করছে।
বালু উত্তোলনে নদীর তলদেশের প্রাকৃতিক পরিবেশ নষ্ট হয় মন্তব্য করে তিনি বলেন, তাতে মাছ ও অন্যান্য জলজ প্রাণীর বংশবৃদ্ধি ব্যাহত হচ্ছে, বদলে যাচ্ছে নদীর স্বাভাবিক গতিপথ। যত্রতত্র বালু তোলায় নদীর স্বাভাবিক স্রোত বাধাগ্রস্তের সাথে নতুন নতুন এলাকায় সৃষ্টি হচ্ছে জলাবদ্ধতা। বালু পরিবহনে ব্যবহৃত ভারী ডাম্প ট্রাক বা ট্রাক্টরের ওজনে গ্রামীণ পাকা রাস্তাগুলো ভেঙে চলাচলের অযোগ্য হয়ে হয়ে যাচ্ছে। শুষ্ক মৌসুমে বালু বহনের সময় বাতাসে প্রচুর ধুলো ওড়ে, যা স্থানীয়দের শ্বাসকষ্টসহ বিভিন্ন স্বাস্থ্য সমস্যা তৈরি করে।
অন্য দিকে নদীরক্ষা কমিশনের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে নয়া দিগন্তকে বলেন, অনেক নদীতে রাতের আঁধারে বালু তোলার অভিযোগ রয়েছে। নদীর পাড় কেটে বালু তোলায় দেশের অনেক স্থানে নদী তীরবর্তী গ্রাম এবং কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত সেতু এখন চরম ঝুঁকিতে রয়েছে। যমুনার তলদেশ থেকে অতিরিক্ত বালু তোলায় এই অঞ্চলে প্রতি বছর তীব্র নদীভাঙন দেখা দেয়। অন্য দিকে চাঁদপুরের মেঘনা নদীতে অবৈধ বালু চক্রের বিরুদ্ধে কোস্টগার্ড ও নৌ-পুলিশের ধারাবাহিক অভিযান চলছে, যেখানে বহু ড্রেজার ও বাল্কহেড জব্দ করা হয়েছে। নদী রক্ষায় ধারাবাহিক এসব চেষ্টা অব্যাহত থাকবে।



