- জুলাই হত্যাকাণ্ডের বিচারে বিলম্ব হলে জাতি তা মেনে নেবে না : বিরোধীদলীয় নেতা
- প্রয়োজনে ট্রাইব্যুনালের সংখ্যা বাড়ানো হবে : স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী
- বিচারে গতি আনতে ট্রাইব্যুনাল বাড়াতে হবে : নাহিদ ইসলাম
জুলাই গণ-অভ্যুত্থান ও গণহত্যার বিচার দ্রুত সম্পন্ন, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের সক্ষমতা বৃদ্ধি, শেখ হাসিনাসহ অভিযুক্তদের দেশে ফিরিয়ে এনে বিচারের আওতায় আনা, আওয়ামী লীগের দলগত বিচার, সারা দেশে দায়ের হওয়া মামলার তদন্ত দ্রুত শেষ করা এবং শহীদ ও আহত পরিবারের পুনর্বাসন নিশ্চিত করার জোর দাবি উঠেছে জাতীয় সংসদে। একই সাথে বিচারপ্রক্রিয়ার ধীরগতি, ট্রাইব্যুনালে জনবল সঙ্কট, সাক্ষীদের নিরাপত্তা, জুলাই জাদুঘরের অগ্রগতি এবং মামলায় অনিয়মের অভিযোগ তোলেন বিরোধী দলের সদস্যরা। আইনমন্ত্রী আসাদুজ্জামান সংসদকে জানান, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে জুলাইকেন্দ্রিক এখন পর্যন্ত ১৬ জনের মৃত্যুদণ্ড, ১১ জনের যাবজ্জীবন কারাদণ্ড এবং ৩৫ জনের বিভিন্ন মেয়াদে সাজা হয়েছে। একজন রাজসাক্ষী খালাস পেয়েছেন এবং আরো ২৬টি মামলা বিচারাধীন রয়েছে।
গতকাল মঙ্গলবার ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের দ্বিতীয় অধিবেশনের ২৪তম দিনে জাতীয় নাগরিক পার্টির আখতার হোসেন কার্যপ্রণালী বিধির ৬৮ অনুযায়ী জনগুরুত্বপূর্ণ ‘জুলাই গণ-অভ্যুত্থান ও গণহত্যার বিচার সম্পর্কে সাম্প্রতিক আলোচনা’ শীর্ষক বিষয়টি জাতীয় সংসদে উত্থাপন করেন। ডেপুটি স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামাল অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন।
আখতার হোসেনের বক্তব্যের পর শুরুতেই সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য ও জুলাই শহীদ জাবিরের মা রোকেয়া বেগম বক্তব্য রাখেন। এরপর পর্যায়ক্রমে ঢাকা-১৪ আসনের সংসদ সদস্য মীর আহমেদ বিন কাসেম আরমান, প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী নুরুল হক নুর, বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম, আইনমন্ত্রী মো: আসাদুজ্জামান, বিরোধীদলীয় নেতা ডা: শফিকুর রহমান ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বক্তব্য দেন।
ইতিহাস বিকৃত না করার আহ্বান বিরোধীদলীয় নেতার
বিরোধীদলীয় নেতা ডা: মো: শফিকুর রহমান বলেন, জুলাই ছিল দীর্ঘ সাড়ে ১৭ বছরের আন্দোলন-সংগ্রামের চূড়ান্ত ফলাফল। তাই শুধু জুলাই নয়, সেই দীর্ঘ সময়ের সব শহীদ, আহত, গুম ও নির্যাতিত ব্যক্তিদেরও রাষ্ট্রীয়ভাবে মূল্যায়ন করতে হবে। ডা: শফিকুর রহমান বলেন, ব্যাংককের হাসপাতালে চিকিৎসাধীন জুলাইযোদ্ধাদের সাথে তিনি কথা বলেছেন। অনেককে আগের সরকারের সময় চিকিৎসার জন্য পাঠানো হলেও এখনো বহু আহত ব্যক্তি চিকিৎসার জন্য বিভিন্ন মহলে ঘুরছেন। তিনি সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, আহত ও পঙ্গু জুলাইযোদ্ধাদের যথাযথ চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করতে হবে। প্রয়োজনে সংসদ সদস্যদের সুযোগ-সুবিধা কমিয়ে হলেও তাদের পাশে দাঁড়ানো উচিত।
জুলাই জাদুঘর ও ফাউন্ডেশন চালুর দাবি
বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, দ্রুত জুলাই জাদুঘর জনসাধারণের জন্য খুলে দেয়া উচিত। ভবনের কিছু কাজ বাকি থাকলেও জাদুঘর চালু করা যেতে পারে। তিনি আরো বলেন, জুলাই ফাউন্ডেশনকে কার্যকর প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। যদি সত্যিই কর্মকর্তারা কয়েক মাস ধরে বেতন না পেয়ে থাকেন, তবে সরকারকে দ্রুত বিষয়টি সমাধান করতে হবে।
বিচারে গড়িমসি না করার আহ্বান জানিয়ে ডা: শফিকুর রহমান বলেন, জুলাই হত্যাকাণ্ডের বিচার বিলম্বিত হলে জাতি তা মেনে নেবে না। তবে বিচার যেন অবশ্যই ন্যায়বিচার হয় এবং কারো প্রতি অন্যায় না হয়, সেদিকেও সতর্ক থাকতে হবে।
সীমান্ত ও রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তায় ঐক্যের আহ্বান জানিয়ে বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, সীমান্তে উসকানিমূলক কর্মকাণ্ড নিয়ে সরকারকে আরো স্পষ্ট অবস্থান নিতে হবে। দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষায় সরকার ও বিরোধী দলসহ সব রাজনৈতিক শক্তির ঐক্য প্রয়োজন। তিনি বলেন, প্রতিবেশী দেশের সাথে সম্পর্কের প্রশ্নে জাতীয় ঐকমত্য থাকা জরুরি।
গণভোটের ফল বাস্তবায়নের আহ্বান জানিয়ে ডা: শফিকুর রহমান বলেন, গণভোটে জনগণ যে রায় দিয়েছে, তার যথাযথ মূল্যায়ন হওয়া উচিত। জনগণের ভোটের প্রতিফলন বাস্তবায়িত না হলে গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানের প্রতি মানুষের আস্থা দুর্বল হবে।
প্রয়োজনে ট্রাইব্যুনালের সংখ্যা বাড়ানো হবে : স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে জুলাই গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার চলছে। বর্তমানে ৫৯০টি মামলা বিচারাধীন রয়েছে এবং আরো ১২টি মামলার তদন্ত শেষ হয়ে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ গঠনের অপেক্ষায় আছে। প্রয়োজন হলে ট্রাইব্যুনালের সংখ্যা, প্রসিকিউটর, তদন্তকারী কর্মকর্তা ও লজিস্টিক সহায়তা আরো বাড়ানো হবে, যাতে দ্রুত বিচার নিশ্চিত করা যায়। আওয়ামী লীগের দলগত বিচার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এ দাবিতে বিএনপি শুরু থেকেই সোচ্চার ছিল। পরে আইন সংশোধনের মাধ্যমে দলগত বিচারের আইনি ভিত্তিও তৈরি হয়েছে।
সংবিধান সংস্কার নিয়ে বিরোধী দলের উদ্দেশে তিনি বলেন, গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, গণমাধ্যমের স্বাধীনতা এবং ভবিষ্যতে ফ্যাসিবাদ ঠেকাতে সরকার সংবিধান সংস্কারে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। এ লক্ষ্যে গঠিত সংবিধান সংস্কার কমিটিতে বিরোধী দলের জন্য এখনো পাঁচটি আসন খালি রাখা হয়েছে। তিনি তাদের আলোচনায় ফিরে আসার আহ্বান জানান।
জুলাই যোদ্ধা ও শহীদ পরিবারের জন্য সরকারের নেয়া পদক্ষেপ তুলে ধরে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, প্রতিটি শহীদ পরিবারের জন্য এককালীন ৩০ লাখ টাকা, ক শ্রেণীর আহতদের পাঁচ লাখ টাকা, খ শ্রেণীর আহতদের তিন লাখ টাকা এবং গ শ্রেণীর আহতদের এক লাখ টাকা আর্থিক সহায়তা দেয়া হয়েছে। পাশাপাশি শহীদ পরিবার ও আহতদের জন্য মাসিক ভাতাও চালু করা হয়েছে। গুরুতর আহতদের প্রয়োজনে বিদেশে চিকিৎসার ব্যবস্থাও করা হবে। জুলাই ফাউন্ডেশনের কার্যক্রম আরো সম্প্রসারণের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।
তিনি আরো জানান, আগামী ৫ আগস্ট জুলাই স্মৃতি জাদুঘর উদ্বোধন করা হবে। গণমাধ্যমের স্বাধীনতার প্রসঙ্গে মন্ত্রী বলেন, সরকার মতপ্রকাশের স্বাধীনতায় বিশ্বাস করে। তবে সংবিধানের ৩৯ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী রাষ্ট্রের স্বার্থে যে যৌক্তিক সীমাবদ্ধতা রয়েছে, তা আইন অনুযায়ী কার্যকর হবে। সীমান্ত ও পররাষ্ট্রনীতি নিয়ে তিনি বলেন, বর্তমান সরকার দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষায় কঠোর অবস্থানে রয়েছে। প্রতিবেশী দেশের সাথে সম্পর্ক হবে পারস্পরিক সম্মান, মর্যাদা ও সমতার ভিত্তিতে। সরকারের নীতি- ‘সবার আগে বাংলাদেশ’।
শেখ হাসিনাকে ফেরানোর চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে
শেখ হাসিনাকে দেশে ফিরিয়ে আনার বিষয়ে তিনি বলেন, প্রত্যর্পণ চুক্তির আওতায় সরকার তাকে ফেরানোর চেষ্টা অব্যাহত রেখেছে। দেশে ফিরলে আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী আইনি ব্যবস্থা নেয়া হবে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, সরকারি হিসাব অনুযায়ী গেজেটভুক্ত শহীদের সংখ্যা ৮৪৩ জন এবং আহতসহ স্বীকৃত জুলাই যোদ্ধার সংখ্যা ১৫ হাজার ২১২ জন। শহীদদের ঘটনায় ৭৫১টি হত্যা মামলা, একটি অপমৃত্যু মামলা, ৩৩টি সিআর মামলা এবং ৪৮টি আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের মামলা বিচারাধীন রয়েছে।
বক্তব্যের শেষে তিনি বলেন, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের শহীদ, আহত ও নির্যাতিত প্রত্যেক মানুষের ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে সরকার দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। বিচার প্রক্রিয়া দ্রুত সম্পন্ন করতে প্রয়োজনীয় সব ধরনের আইনগত ও প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
সংবিধান সংস্কারে বিরোধী দলকে ফের আলোচনায় আসার আহ্বান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের প্রথম ও সবচেয়ে বড় অর্জন ছিল জুলাই ঘোষণাপত্র। সেই ঘোষণাপত্রের ধারাবাহিকতায় জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের উদ্যোগে জুলাই জাতীয় সনদ প্রণীত হয়েছে। কিন্তু সংসদে জুলাই গণ-অভ্যুত্থান নিয়ে আলোচনায় এ দু’টি গুরুত্বপূর্ণ অর্জনের কথা যথাযথভাবে উঠে আসেনি বলে মন্তব্য করেছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। তিনি বলেন, জুলাই ঘোষণাপত্র ও জাতীয় সনদে শহীদ পরিবার, আহত জুলাই যোদ্ধাদের সুরক্ষা, সাংবিধানিক স্বীকৃতি এবং গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার যে অঙ্গীকার করা হয়েছে, সরকার তা বাস্তবায়নে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
তিনি বলেন, জুলাই গণ-অভ্যুত্থান কোনো একক রাজনৈতিক দল বা ছাত্রসংগঠনের আন্দোলন ছিল না; এটি ছিল সমগ্র বাংলাদেশের মানুষের গণ-অভ্যুত্থান। একই সাথে তিনি স্মরণ করিয়ে দেন, এই অভ্যুত্থানের পেছনে ছিল ১৭ বছরের গণতান্ত্রিক আন্দোলন, যেখানে গুম, খুন, বিচারবহির্ভূত হত্যা, আয়নাঘরে নির্যাতনসহ নানা নিপীড়নের শিকার হয়েছেন হাজারো মানুষ।
জুলাই চেতনা রাষ্ট্রগঠনের ভিত্তি : আইনমন্ত্রী
আইনমন্ত্রী বলেন, জুলাই গণ-অভ্যুত্থান এখন বাংলাদেশের স্বীকৃত সত্য। যতদিন বাংলাদেশ থাকবে, জুলাই ততদিন জাতীয় চেতনা, অহংকার ও রাজনৈতিক অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে থাকবে। তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে গিয়ে কৃষক, শ্রমিক, সাধারণ মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে যে জনসম্পৃক্ত নেতৃত্বের পরিচয় দিচ্ছেন, সেটিই জুলাই চেতনার বাস্তব প্রতিফলন।
তিনি বলেন, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের মাধ্যমে বিচার কার্যক্রম দৃশ্যমান অগ্রগতি অর্জন করেছে। দায়িত্ব গ্রহণের পর ১৬টি তদন্ত সম্পন্ন হয়েছে, যার মধ্যে ১২টির তদন্ত প্রতিবেদন জমা পড়েছে এবং চারটি মামলায় অভিযোগ গঠন হয়েছে। ইতোমধ্যে তিনটি মামলার রায়ও হয়েছে, যার মধ্যে আবু সাঈদ হত্যা মামলাও রয়েছে।
আইনমন্ত্রী জানান, জুলাই হত্যাকাণ্ডকে কেন্দ্র করে ট্রাইব্যুনালে ৫৯০টি অভিযোগ জমা পড়েছিল। সেখান থেকে যাচাই-বাছাই শেষে ১০৯টি মামলা গ্রহণ করা হয়। এর মধ্যে ৪৩টি মামলার তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল হয়েছে, ছয়টি মামলার বিচার সম্পন্ন হয়েছে এবং চারটি মামলার রায় অপেক্ষমাণ রয়েছে। তিনি বলেন, এসব মামলায় এখন পর্যন্ত ১৬ জনের মৃত্যুদণ্ড, ১১ জনের যাবজ্জীবন কারাদণ্ড এবং ৩৫ জনের বিভিন্ন মেয়াদে সাজা হয়েছে। একজন রাজসাক্ষী খালাস পেয়েছেন এবং আরো ২৬টি মামলা বিচারাধীন রয়েছে।
আইনমন্ত্রী আরো জানান, শাপলা চত্বরের হত্যাকাণ্ড, আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে সংগঠন হিসেবে তদন্ত এবং জুলাই হত্যাকাণ্ডে দেশের বিভিন্ন জেলায় সংঘটিত ঘটনাগুলোর তদন্তও শুরু হয়েছে বা পরিকল্পনার পর্যায়ে রয়েছে।
আওয়ামী লীগের পুনর্বাসনের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান
আইনমন্ত্রী বলেন, যারা বিদেশে বসে আত্মসমর্পণের হুমকি দিচ্ছেন, বাংলাদেশের আইনে তাদের আত্মসমর্পণের কোনো সুযোগ নেই। তারা দেশের সীমানায় প্রবেশ করলেই গ্রেফতার হবেন।
তিনি বলেন, জুলাই চেতনায় বিশ্বাসী মানুষ কখনোই ফ্যাসিবাদী আওয়ামী লীগের পুনর্বাসন হতে দেবে না। দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষায় সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, বিভক্তির রাজনীতি নয়, জুলাইয়ের চেতনা ধারণ করে দেশ গঠনে সবাইকে একসাথে কাজ করতে হবে।
আওয়ামী লীগের দলগত বিচার দ্রুত শুরু করতে হবে
আলোচনা উত্থাপন করে আখতার হোসেন বলেন, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানকে অস্বীকার করার নানা চেষ্টা থাকলেও জাতিসঙ্ঘের প্রতিবেদনে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, ২০২৪ সালের জুলাইয়ে আওয়ামী লীগ মানবতাবিরোধী অপরাধ করেছে। ফলে অপপ্রচার চালিয়ে সেই সত্য আড়াল করা সম্ভব নয়। তিনি বলেন, বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে ব্যাপক জনসম্পৃক্ত আন্দোলন ছিল জুলাই গণ-অভ্যুত্থান। দেশের সব শ্রেণী-পেশার মানুষ, এমনকি প্রবাসীরাও এতে অংশ নিয়েছিলেন। এত বড় আত্মত্যাগের পরও বিচারকাজ কাক্সিক্ষত গতিতে এগোচ্ছে না।
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, নতুন সরকার দায়িত্ব নেয়ার পরও নতুন প্রসিকিউশন টিম কোনো নতুন তদন্ত প্রতিবেদন বা আনুষ্ঠানিক অভিযোগপত্র দাখিল করতে পারেনি। আগের তদন্তের ভিত্তিতেই বিচার চলছে। তিনি জানান, বর্তমানে ট্রাইব্যুনালে মাত্র ২৩ জন তদন্ত কর্মকর্তা ও প্রায় ২০ জন প্রসিকিউটর কাজ করছেন। অথচ ৪৫০টির বেশি অভিযোগ জমা পড়েছে এবং শতাধিক মামলা এখনও বিচারের আওতায় আসেনি।
বিচারে গতি আনতে ট্রাইব্যুনাল বাড়াতে হবে
বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম বলেন, ২০২৪ সালের ১৪ জুলাই বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের পক্ষ থেকে রাষ্ট্রপতির কাছে স্মারকলিপি দেয়া হয়েছিল। ওই রাতেই শেখ হাসিনার ‘রাজাকারের নাতি-নাতনি’ মন্তব্যের প্রতিবাদে দেশব্যাপী শিক্ষার্থীরা বিক্ষোভে নেমে আসে এবং সেখান থেকেই আন্দোলন রাজনৈতিক চরিত্র লাভ করে।
তিনি বলেন, ১৪ জুলাইকে অন্তর্বর্তী সরকার ‘জুলাই উইমেন্স ডে’ হিসেবে পালন করেছিল। বর্তমান সরকারও চাইলে দিনটিকে রাষ্ট্রীয়ভাবে পালন করতে পারত।
নাহিদ ইসলাম অভিযোগ করেন, এখনো জুলাই গণ-অভ্যুত্থান নিয়ে বিভ্রান্তিকর প্রচারণা চলছে। আওয়ামী লীগ ও ভারতীয় কিছু গণমাধ্যমের পাশাপাশি সরকারদলীয় কয়েকজন সংসদ সদস্যও আন্দোলনকে ষড়যন্ত্র হিসেবে উপস্থাপন করছেন, যা দুঃখজনক।
তিনি বলেন, ৫ আগস্টের পর দায়ের হওয়া প্রায় এক হাজার ৪৯৯টি মামলার মধ্যে অনেকগুলোতে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে নিরীহ মানুষকে আসামি করা হয়েছে। কোথাও কোথাও অর্থ লেনদেনের অভিযোগও উঠেছে। এসব মামলা নিরপেক্ষভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।
তিনি আরো বলেন, সরকার প্রধান প্রসিকিউটর (ট্রাইব্যুনাল) পরিবর্তন করলেও নতুন প্রসিকিউশন টিম এখনো নতুন কোনো তদন্ত শেষ করতে পারেনি। আগের তদন্তের ভিত্তিতেই বর্তমান বিচার এগোচ্ছে। সরকারের কাছে তিনি জানতে চান, নতুন ট্রাইব্যুনাল গঠন, দক্ষ বিচারক ও প্রসিকিউটর নিয়োগ এবং প্রয়োজনীয় জনবল বৃদ্ধির বিষয়ে কী পরিকল্পনা রয়েছে।
তিনি বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় জুলাই জাদুঘর, শহীদ পরিবারের ভাতা ও ট্রাইব্যুনালের মতো উদ্যোগ নেয়া হয়েছিল। বর্তমান সরকার তা অব্যাহত রেখেছে, তবে বিচার দ্রুত শেষ করতে আরো কার্যকর পদক্ষেপ প্রয়োজন।
বক্তব্যের শেষে নাহিদ ইসলাম বলেন, আওয়ামী লীগকে রাজনৈতিক দল হিসেবেই আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে বিচারের আওতায় আনতে হবে। একই সাথে শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে দেয়া রায় দ্রুত কার্যকর করতে প্রয়োজনীয় কূটনৈতিক ও আইনি উদ্যোগ গ্রহণের আহ্বান জানান তিনি।
সব শহীদের বিচার নিশ্চিত করতে হবে
সংরক্ষিত মহিলা আসনের সংসদ সদস্য এবং জুলাই শহীদ জাবিরের মা রোকিয়া বেগম বলেন, একজন শহীদ সন্তানের মা হিসেবে প্রতিদিনই তিনি সন্তানের শোক বয়ে বেড়ান। তবুও সংসদে দাঁড়িয়েছেন শুধু একটি দাবির জন্য-সব শহীদের বিচার নিশ্চিত করতে হবে। তিনি বলেন, শুধু তার ছেলে নয়, প্রায় এক হাজার ৪০০ শহীদ পরিবার এবং জুলাইয়ের আহত যোদ্ধাদেরও ন্যায়বিচার ও যথাযথ চিকিৎসা নিশ্চিত করতে হবে।
বিচার থমকে আছে
ঢাকা-১৪ আসনের সংসদ সদস্য মীর আহমেদ বিন কাসেম আরমান বলেন, সংসদের প্রতিটি সদস্যই জুলাই শহীদদের আত্মত্যাগের ঋণে আবদ্ধ। কিন্তু শহীদদের প্রথম দাবি-বিচার-এখনও কাক্সিক্ষতভাবে এগোয়নি। তিনি অভিযোগ করেন, নতুন সরকার দায়িত্ব নেয়ার পরও নতুন কোনো তদন্ত প্রতিবেদন জমা পড়েনি। ট্রাইব্যুনাল, তদন্ত সংস্থা ও প্রসিকিউশন জনবল ও অর্থসঙ্কটে রয়েছে। সরকারও মামলাগুলো তদারকিতে দৃশ্যমান উদ্যোগ নেয়নি।
তিনি জানতে চান, শত শত অভিযোগ, হাজার হাজার পৃষ্ঠার নথি এবং বিপুল ভিডিও-অডিও প্রমাণ দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য সরকারের পরিকল্পনা কী।
মীর আহমেদ আরো বলেন, শেখ হাসিনা ও সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বিরুদ্ধে দেয়া রায়ে সম্পদ বাজেয়াপ্ত করে ভুক্তভোগীদের পুনর্বাসনের নির্দেশ রয়েছে। কিন্তু সম্পদ শনাক্ত, জব্দ ও ব্যবস্থাপনার বিষয়ে সরকার কী পদক্ষেপ নিয়েছে, তা সংসদে জানানো উচিত।
১৭ বছরের আন্দোলনের স্বীকৃতি দিতে হবে
প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী নুরুল হক নুর বলেন, জুলাই গণ-অভ্যুত্থান ১৭ বছরের ধারাবাহিক আন্দোলন-সংগ্রামের ফল। তাই শুধু ৩৬ দিনের আন্দোলন নয়, পুরো আন্দোলনের ইতিহাস রাষ্ট্রীয়ভাবে স্বীকৃতি দেয়া প্রয়োজন।



