সমঝোতা চুক্তিতে ট্রাম্প-মাসুদ সই, এখনো ৩ চ্যালেঞ্জ

Printed Edition

নয়া দিগন্ত ডেস্ক

যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের প্রকাশিত অন্তর্বর্তী চুক্তিতে নিজ নিজ দেশের পক্ষে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান স্বাক্ষর করেছেন। মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে ছড়িয়ে পড়া যুদ্ধ শেষ করার লক্ষ্যে বুধবার এ চুক্তিতে স্বাক্ষর করেন তারা। ট্রাম্প ও পেজেশকিয়ান উভয়েই ইংরেজি ও ফারসি ভাষায় সমঝোতা স্মারকটিতে ডিজিটালভাবে স্বাক্ষর করেছেন বলে মার্কিন ও ইরানি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, বুধবার থেকে অন্তর্বর্তী চুক্তিটি কার্যকর হওয়া শুরু হয়ে গেছে। ফ্রান্সের ভার্সাই প্রাসাদে প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল মাক্রোঁর সাথে একটি জমকালো নৈশভোজ শুরুর আগ মুহূর্তে ট্রাম্প এই সমঝোতা চুক্তিটিতে স্বাক্ষর করেন বলে জানিয়েছে রয়টার্স।

যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের প্রতিনিধিরা সুইজারল্যান্ডের পাহাড়ি অবকাশকেন্দ্র বুর্গেনস্টকে বৈঠকে বসার তথ্য নিশ্চিত করেছে সুইস পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। আজ শুক্রবার এ বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে। রয়টার্সের খবর মতে, সুইস পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে বলেছে, ‘বর্তমান পরিস্থিতি অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান, মধ্যস্থতাকারী পাকিস্তান ও কাতার এবং সংশ্লিষ্ট অন্যান্য দেশগুলো ১৯ জুন বুর্গেনস্টকে বৈঠক করবে। সেখানে চুক্তি বাস্তবায়ন নিয়ে প্রাথমিক আলোচনা অনুষ্ঠিত হবে।’

তবে বৈঠকের সময়সূচি বা বিস্তারিত বিষয়ে আর কোনো তথ্য দেয়নি সুইস কর্তৃপক্ষ। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার গুরুত্বপূর্ণ সমঝোতা স্মারকটি আজ শুক্রবার সুইজারল্যান্ডের জেনেভায় আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাক্ষরিত হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু নির্ধারিত সময়ের দু’দিন আগেই অর্থাৎ বুধবার এটি স্বাক্ষরিত হয়েছে।

এই চুক্তিতে ইরানি কর্মকর্তারা যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন তার প্রতি সম্মান দেখাতে ব্যর্থ হলে যুক্তরাষ্ট্র আবার আক্রমণ শুরু করবে ও এই কর্মকর্তাদের হত্যা করবে বলে হুমকি দিয়েছেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। ট্রাম্প জি৭ সম্মেলনে যোগ দিয়ে অন্যান্য নেতাদের সাথে এখন ফ্রান্সে আছেন। চুক্তিতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ইরানকে আক্রমণ করার পেছনে তার দেয়া অন্তত একটি যুক্তি প্রত্যাহারও করে নিয়েছেন। তিনি বলেছেন, তেহরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র না থাকাটা ‘অন্যায্য’ হবে। অথচ আগে ইরানের এসব ক্ষেপণাস্ত্র নিশ্চিহ্ন করার প্রত্যয় জানিয়েছিলেন তিনি।

এক সংবাদ সম্মেলনে ইরানকে নিয়ে ট্রাম্প বলেন, ‘তারা যদি চুক্তি লঙ্ঘন করে আমরা ওদের ওপর বোমা মেরে সব ধ্বংস করে দেবো। আমি চাই না তারা তা (করুক)। আমি চাই তারা চুক্তির প্রতি সম্মান দেখাক।’ এ সময় তিনি ইরানিদের ‘স্মার্ট মানুষ’ বলে অভিহিত করেন। দুই পক্ষের মধ্যে হওয়া অন্তর্বর্তী চুক্তি বা সমঝোতা স্মারকটি শুক্রবার সুইজারল্যান্ডে দুই পক্ষের উপস্থিতিতে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাক্ষর হওয়ার কথা ছিল।

কিন্তু আল জাজিরার খবরে বলা হয়েছে যে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাকায়ি জানিয়েছেন, যেহেতু চুক্তিটি ডিজিটালভাবে স্বাক্ষর হয়ে গেছে তাই সুইজারল্যান্ডে দুই পক্ষের উপস্থিতিতে কোনো স্বাক্ষর অনুষ্ঠান হবে না। তবে এর পরবর্তী ৬০ দিনে একটি স্থায়ী চুক্তিতে পৌঁছতে আলোচনা শুরু করবেন মার্কিন ও ইরানি কর্মকর্তারা।

ট্রাম্প আশা প্রকাশ করে বলেছেন, এই চুক্তি পশ্চিম এশিয়ায় শান্তি আনবে আর তেলের দাম কমাবে। এর আগে তিনি বলেছিলেন, ‘যদি আমি এটি (চুক্তি) পছন্দ না করি, তারা যদি ভালো আচরণ না করে, আমরা গিয়ে ঠিক তাদের মাথার মাঝখানে বোমা ফেলব, ঠিক আছে?’

রয়টার্স জানিয়েছে, ইরানি নেতারা মুহূর্তটি উদযাপন করার সময় ট্রাম্পের এই নতুন হুমকি নিয়ে কিছু বলেননি। তারা চুক্তির ছবি প্রকাশ করেছেন। এই চুক্তিকে ১৯৭৯ সালে ইসলামিক প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর থেকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের প্রেসিডেন্টের স্বাক্ষরিত প্রথম চুক্তি হিসেবে মনে করা হচ্ছে।

যুক্তরাষ্ট্রের সাথে আলোচনায় ইরানি পক্ষের নেতৃত্ব দেয়া পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাকের গালিবাফ বলেন, ‘সামরিক পদক্ষেপের মাধ্যমে আমরা যা কিছু অর্জন করতে চেয়েছিলাম, আলোচনার মাধ্যমে আমরা তার কয়েকগুণ বেশি পেয়েছি, এ নিয়ে কোনো তুলনাই চলে না।’

বিবিসি জানায়, তবে যুদ্ধের অবসান ঘটানো কতটা জটিল হবে- সেই চ্যালেঞ্জগুলোর দিকেই এখন দৃষ্টি যাচ্ছে।

এই সমঝোতার পর এখন ৬০ দিনের মধ্যে ‘চূড়ান্ত চুক্তি’ নিয়ে আলোচনার পথ তৈরি হবে এবং পারস্পরিক সম্মতিতে সময় বাড়ানোও যাবে। এতে যুক্তরাষ্ট্রের নৌ-অবরোধ ধীরে ধীরে তুলে নেয়া, হরমুজ প্রণালী দিয়ে জাহাজ চলাচল আবার শুরু করা এবং ইরানের ওপর ‘সব ধরনের নিষেধাজ্ঞা’ প্রত্যাহার নিয়ে আলোচনা শুরু করার অঙ্গীকার রয়েছে।

সমঝোতা স্মারকে ইরানের পুনর্গঠন ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য অন্তত ৩০০ বিলিয়ন ডলার (৩০ হাজার কোটি) তহবিল গঠনের পরিকল্পনাও রয়েছে। পাশাপাশি তেহরানের পক্ষ থেকে আবার অঙ্গীকার করা হয়েছে যে তারা পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করবে না।

এখনো তিন চ্যালেঞ্জ

বিশেষজ্ঞদের মতে, আলোচনাকে বিপন্ন করতে পারে এমন তিনটি বড় হুমকি রয়েছে। প্রথমত লেবাননে ইসরাইলের হামলা। উভয় পক্ষ লেবাননসহ সব ফ্রন্টে সামরিক অভিযান অবিলম্বে এবং স্থায়ীভাবে বন্ধ করার ঘোষণা দিয়েছে- প্রাথমিক চুক্তি ঘোষণার সময় পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ এ কথা বলেন, যিনি প্রধান মধ্যস্থতাকারীদের একজন হিসেবে কাজ করেছেন।

বুধবার পড়ে শোনানো এই চুক্তিতে লেবাননকেও স্পষ্টভাবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে, যাতে তার ভৌগোলিক অখণ্ডতা ও সার্বভৌমত্ব নিশ্চিত করা হয়। তবে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ফ্রান্সে জি-৭ সম্মেলনে ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুকে লেবাননের বিষয়ে আরো দায়িত্বশীল হওয়ার কথা বলার পরও ইসরাইল লেবাননে তাদের হামলা অব্যাহত রেখেছে।

বুধবার ইসরাইলি যুদ্ধবিমান নাবাতিয়েহ আল-ফাওকা এলাকা এবং পাশের কফর তেবনিতের উপকণ্ঠে হামলা চালিয়েছে বলে লেবাননের রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা ন্যাশনাল নিউজ এজেন্সি বা এনএনএ জানিয়েছে। এ ছাড়া মার্কিন কর্মকর্তারা বলেছেন, যদিও লেবানন যুদ্ধবিরতির কাঠামোর মধ্যে রয়েছে, তবুও লেবাননের ভূখণ্ড থেকে ইসরাইলি বাহিনী প্রত্যাহার এই চুক্তির শর্ত নয়। তারা আরো বলেন, ইসরাইল আত্মরক্ষার অধিকার বজায় রাখবে। কিন্তু ইরান বলেছে, লেবাননের যুদ্ধের অবসান যুদ্ধ শেষ করার চুক্তির অবিচ্ছেদ্য অংশ। হিজবুল্লাহও এ অবস্থান সমর্থন করেছে। হিজবুল্লাহর জনসংযোগ দফতর বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে জানিয়েছে, ইরান তাদের মিত্রকে আশ্বস্ত করেছে যে, আলোচনার পরবর্তী ধাপে তারা লেবানন থেকে ইসরাইলি সেনা সম্পূর্ণ প্রত্যাহারের দাবি জানাবে। ইসরাইলও স্পষ্টভাবে ইঙ্গিত দিয়েছে যে, তারা এই চুক্তি সম্পর্কে ইরানের ব্যাখ্যায় নিজেদের বাধ্য মনে করে না।

দ্বিতীয়ত ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি। ইরানের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম, যদিও ট্রাম্প বলেছেন এটি জব্দ করার কোনো তাড়াহুড়া নেই। আন্তর্জাতিক পারমাণবিক শক্তি সংস্থার (আইএইএ) তথ্য অনুযায়ী, গত বছর পর্যন্ত ইরান প্রায় ৬০ শতাংশ পর্যন্ত সমৃদ্ধ প্রায় ৪০০ কেজি ইউরেনিয়াম জমা করেছিল। একটি পারমাণবিক অস্ত্রের ক্ষেত্রে সমৃদ্ধির মাত্রা প্রায় ৯০ শতাংশ হয়।

তেহরান ধারাবাহিকভাবে দাবি করে এসেছে যে, তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি শান্তিপূর্ণ এবং চুক্তিতে তারা পুনর্ব্যক্ত করেছে যে তারা পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করতে চায় না। তবে বিদ্যমান সমৃদ্ধ পদার্থের ব্যবস্থাপনা কিভাবে হবে- এটাসহ গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নগুলো এখনো একটি চূড়ান্ত চুক্তির জন্য আলোচনার ওপর ছেড়ে দেয়া হয়েছে।

উভয় পক্ষ নীতিগতভাবে জমাকৃত সমৃদ্ধ পদার্থ কিভাবে পরিচালনা করা হবে, সে বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে সম্মত হয়েছে। ন্যূনতমভাবে, ইউরেনিয়াম ডাউনব্লেন্ড করা হবে, অর্থাৎ এর মান কমানো হবে এবং তা আইএইএর তত্ত্বাবধানে সংশ্লিষ্ট স্থানেই সম্পন্ন হবে। এ মুহূর্তে, ৬০ দিনের আলোচনা চলাকালে উভয় পক্ষ ‘স্থিতাবস্থা’ বজায় রাখবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। সম্ভবত ইরান তাদের পারমাণবিক কার্যক্রম সম্প্রসারণ করবে না, আর যুক্তরাষ্ট্র নতুন নিষেধাজ্ঞা আরোপ বা অঞ্চলে তাদের সামরিক উপস্থিতি বৃদ্ধি থেকে বিরত থাকবে।

তৃতীয়ত হরমুজ প্রণালী : সমঝোতা চুক্তিটির লক্ষ্য হরমুজ প্রণালী আবার খুলে দেয়া, যা ফেব্রুয়ারি থেকে প্রায় সম্পূর্ণভাবে অচল হয়ে আছে। যুদ্ধের আগে বৈশ্বিক তেল ও গ্যাস সরবরাহের প্রায় ২০ শতাংশই এই গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ দিয়ে যেত। এতে বলা হয়েছে, চুক্তি স্বাক্ষরের পর নৌপথটি আবার খুলে দেয়া হবে। এই নৌপথের প্রযুক্তিগত ও নিরাপত্তাজনিত বাধা, যার মধ্যে ইরানের পক্ষ থেকে মাইন অপসারণও রয়েছে, দূর হওয়ার সাথে সাথে ৩০ দিনের মধ্যে পূর্ণাঙ্গ কার্যক্রম শুরু হওয়ার আশা করা হচ্ছে। চুক্তিতে বলা হয়েছে, প্রাথমিক ৬০ দিনের জন্য প্রণালীটি পারস্য উপসাগর থেকে ওমান সাগর এবং এর বিপরীত দিকেও টোলমুক্ত থাকবে। এতে আরো বলা হয়েছে, আন্তর্জাতিক আইনের সাথে সামঞ্জস্য রেখে জলপথের ভবিষ্যৎ ব্যবস্থাপনা ও সামুদ্রিক পরিষেবা নিয়ে ওমানসহ অন্যান্য উপসাগরীয় রাষ্ট্রের সাথে আলোচনা করবে ইরান। এর ফলে ভবিষ্যতে কিছু ফি আরোপের সম্ভাবনাও উন্মুক্ত হতে পারে।

তেহরান ইতোমধ্যেই ইঙ্গিত দিয়েছে যে, প্রণালী পরিচালনায় তারা আরো বড় ভূমিকা চায়। ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই বলেছেন, প্রণালী দিয়ে যাওয়া জাহাজগুলোর কাছ থেকে তারা সেবা ফি নেবে। তবে এসব ফি কোন কোন বিষয় অন্তর্ভুক্ত করবে তা স্পষ্ট নয়। আন্তর্জাতিক আইনের অধীনে যাতায়াতের জন্য টোল নেয়া অনুমোদিত নয়, যদিও নির্দিষ্ট কিছু সেবার জন্য চার্জ নেয়া যেতে পারে। তবে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, আলোচনার পর প্রণালীটি টোলমুক্তই থাকবে বলে তারা আত্মবিশ্বাসী।