হাবিবুল বাশার
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক্ষক কেন্দ্র (টিএসসি) মানেই তারুণ্যের স্পন্দন আর মুক্তচিন্তার চত্বর। তবে রমজান এলে এই প্রাঙ্গণ ধারণ করে এক অনন্য মানবিক রূপ। ১ রমজানের শুরু থেকে এই ইফতার আয়োজনে রাজু ভাস্কর্য থেকে ডাস-সংলগ্ন মাঠ পর্যন্ত এখন শত শত মানুষের মিলনমেলা। এখানে নেই কোনো আভিজাত্যের দেয়াল; একই দস্তরখানে বসে ইফতার করছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী, ধুলোমাখা পথশিশু, রিকশাচালক আর দূর-দূরান্ত থেকে আসা ছন্নছাড়া মানুষ।
টিএসসির এই বিশাল কর্মযজ্ঞের সবচেয়ে বিস্ময়কর দিক হলো এর অর্থায়ন ও অংশগ্রহণ। এখানে কোনো করপোরেট স্পন্সর বা বড় দাতা সংস্থার অপেক্ষায় কেউ বসে থাকে না। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই বিভিন্ন বিভাগ বা বন্ধুদের ছোট ছোট গ্রুপ নিজেদের হাতখরচ ও মেসের টাকা বাঁচিয়ে এই আয়োজন করে। এক বাটি মুড়ি, ছোলা আর পিঁয়াজু মাখানোর পেছনে থাকে শিক্ষার্থীদের নিজস্ব শ্রম ও অর্থ। ‘নিজের টাকা, সবার খাবার’- এই অলিখিত নীতিতেই প্রতিদিন মুখরিত হচ্ছে টিএসসি।
তবে কেবল অভাবী মানুষই নয়, টিএসসির এই উন্মুক্ত ইফতারের টানে অনেক সচ্ছল মানুষও ছুটে আসেন। অনেকে কেবল ‘শখ’ করে বা এই অনন্য পরিবেশের অংশ হতে দূর-দূরান্ত থেকে ইফতার নিয়ে এখানে চলে আসেন। রাজধানীর বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা এসব দর্শনার্থী জানান, দামি রেস্টুরেন্টের চেয়েও খোলা আকাশের নিচে শত শত মানুষের সাথে বসে ইফতার করার মধ্যে এক অদ্ভুত প্রশান্তি খুঁজে পান।
হামলার স্মৃতি থেকে বর্তমানের মুক্তি
টিএসসির এই ইফতার আয়োজন সবসময় এতটা নির্বিঘœ ছিল না। বিগত হাসিনা সরকারের আমলে ক্যাম্পাসে ভিন্নমতের শিক্ষার্থীদের ইফতার আয়োজনে বারবার বাধা ও হামলার ন্যক্কারজনক ঘটনা ঘটেছে। বিশেষ করে ২০২৪ সালের রমজানে সাধারণ শিক্ষার্থীদের একটি ইফতার মাহফিলে তৎকালীন ক্ষমতাসীন দলের ছাত্র সংগঠন ছাত্রলীগ অতর্কিত হামলা চালায়। ইফতার সামগ্রী বুটের নিচে পিষে ফেলার সে দৃশ্য আজও শিক্ষার্থীদের মনে ক্ষতের মতো জেগে আছে। সে সময় প্রশাসনের অলিখিত নিষেধাজ্ঞা আর রাজনৈতিক ভয়ের কারণে ছন্নছাড়া বা সাধারণ মানুষকে নিয়ে এমন উন্মুক্ত ইফতার করা ছিল প্রায় অসম্ভব। তবে ২০২৬-এর এই রমজানে টিএসসি ফিরে পেয়েছে তার পুরনো প্রাণ। কোনো ভয় বা রক্তচক্ষু ছাড়াই সাধারণ মানুষ আজ শিক্ষার্থীদের পাশে বসে ইফতারের তৃপ্তি নিচ্ছে।
আয়োজনে সক্রিয় যারা
গত পহেলা রমজান থেকে ক্যাম্পাসে বেশ কিছু সংগঠনের সক্রিয়তা লক্ষ্য করা গেছে। ১৯ ফেব্রুয়ারি থেকে জাতীয় ছাত্রশক্তি টিএসসিতে ধারাবাহিক ‘গণ ইফতার’ কর্মসূচি পালন করছে, যেখানে সমাজের সব স্তরের মানুষকে আমন্ত্রণ জানানো হচ্ছে। ২০ ফেব্রুয়ারি ‘ইনসাফ’ নামক ভলান্টিয়ার প্ল্যাটফর্মটি প্রায় এক হাজার ৫০০ মানুষের মাঝে ইফতার উপহার পৌঁছে দিয়েছে। এ ছাড়াও বিভিন্ন হলের শিক্ষার্থীরা প্রতিদিন ছোট ছোট গ্রুপে ভাগ হয়ে ভাসমান মানুষের জন্য খাবারের প্যাকেট তৈরি করছেন।
বিকেলে ডাসের সামনে দেখা যায় এক বৃদ্ধ রিকশাচালককে শিক্ষার্থীদের সাথে একই প্লেটে ইফতার করতে। আবেগাপ্লুত কণ্ঠে তিনি বলেন, আগে তো পুলিশ আর ক্যাডাররা এখানে বসতেই দিত না। এখন ছাত্ররা নিজেরা ডাইকা নিয়া খাওয়ায়। এ এক মাস আমাগো কোনো অভাব থাকে না। পথশিশু রুবেলের গল্পটাও একই। সে জানায়, অন্য সময় অনেকে দূর-দূর করে তাড়িয়ে দিলেও ইফতারের সময় ছাত্র ভাইয়েরা তাকে পরম মমতায় নিজের পাশে বসান।
টিএসসির ইফতার এখন আর কেবল পেট ভরার মাধ্যম নয়, এটি বিগত দিনের দমন-পীড়নের বিরুদ্ধে এক নীরব প্রতিবাদ এবং সামাজিক সংহতির প্রতীক। নিজের গাঁটের পয়সা খরচ করে অন্যের মুখে হাসি ফোটানোর এই চর্চা প্রমাণ করে মানবিকতা ও মুক্তচিন্তা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ধূলিকণায় মিশে আছে। শৃঙ্খলমুক্ত টিএসসি আজ কেবল শিক্ষার্থীদের নয়, বরং সমাজের প্রতিটি ‘ছন্নছাড়া’ মানুষের আপন ঠিকানা।



