সংশোধন শেষে ফের ঊর্ধ্বমুখী পুঁজিবাজার

বেক্সিমকো ও ইসলামী ব্যাংকের দরপতন

Printed Edition

অর্থনৈতিক প্রতিবেদক

সোমবার সংশোধনের শিকার হওয়া পুঁজিবাজার ফের ঘুরে দাঁড়িয়েছে। দেশের প্রধান পুঁজিবাজারটির সূচকের যেমন উন্নতি ঘটেছে তেমনি বৃদ্ধি পেয়েছে বাজারটির লেনদেনও। দিনের শুরুতে সাময়িক বিক্রয়চাপের মুখে পড়া বাজার শেষদিকে এসে ঘুরে দাঁড়ায়। এর ফলে দুই বাজারেই লেনদেনে অংশ নেয়া কোম্পানি ও ফান্ডের বেশির ভাগের মূল্যবৃদ্ধি ঘটে। পুঁজিবাজার সংশ্লিষ্টরা মনে করেন, এটাই বাজারের স্বাভাবিক আচরণ। বাজারে যেমন মূল্যবৃদ্ধি ঘটবে তেমনি যথারীতি সংশোধন ঘটতে হবে। এভাবেই একসময় টেকসই বাজার আশা করা যায়।

সোমবারের সংশোধনের ধারাবাহিকতায় গতকাল মঙ্গলবারও লেনদেনের শুরুতে দুই পুঁজিবাজারেই সাময়িক বিক্রয়চাপ তৈরি হয়। এ সময় বাজারগুলোতে সূচকের কিছুটা অবনতি ঘটে। তবে দ্রুতই এ চাপ কমে যায়। দিনের বাকি সময় এ চাপ আর বাড়েনি। এতে দুই পুঁজিবাজরই সূচকের কমবেশি উন্নতি ধরে রাখতে সক্ষম হয়। ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) প্রধান সূচক ডিএসইএক্স গতকাল ৩৬ দশমিক ৪৮ পয়েন্ট উন্নতি ধরে রাখে। ৫ হাজার ৪৮২ দশমিক ৯৯ পয়েন্ট থেকে সকালে লেনদেন শুরু করা সূচকটি দিনশেষে পৌঁছে যায় ৫ হাজার ৫১৯ দশমিক ৪৮ পয়েন্টে। একই সময় বাজারটির দুই বিশেষায়িত সূচক ডিএসই-৩০ ও ডিএসইএক্স সূচকের উন্নতি ঘটে যথাক্রমে ১০ দশমিক ৯৯ ও ৩ দশমিক ৩১ পয়েন্ট।

দেশের দ্বিতীয় পুঁজিবাজার চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জে (সিএসই) সার্বিক মূল্যসূচক সিএএসপিআই গতকাল ৩ দশমিক ০১ পয়েন্ট উন্নতি ধরে রাখতে সক্ষম হয়। সকালে ১৫ হাজার ৩১৪ দশমিক ৭২ পয়েন্ট থেকে যাত্রা করা সূচকটি লেনদেনশেষে ১৫ হাজার ৩১৭ দশমিক ৭৩ পয়েন্টে স্থির হয়। এ সময় বাজারটির দুই বিশেষায়িত সূচক সিএসই-৩০ ও সিএসইএক্স সূচকের উন্নতি রেকর্ড করা হয় যথাক্রমে ৩৫ দশমিক ৬১ ও ০ দশমিক ৮৩ পয়েন্ট।

সূচকের উন্নতিতে ঢাকা স্টকে লেনদেনের গতিও কিছুটা বৃদ্ধি পেয়েছে। গতকাল বাজারটি এক হাজার ৩৮৭ কোটি টাকার লেনদেন নিষ্পত্তি করে যা আগের দিন অপেক্ষা ৩১৫ কোটি টাকা বেশি। আগের দিন ডিএসইর লেনদেন ছিল এক হাজার ৭২ কোটি টাকা। তবে লেনদেন হ্রাস পেয়েছে চট্টগ্রাম স্টকে। সিএসই গতকাল ২৬ কোটি টাকা থেকে ২৩ কোটিতে নেমে আসে লেনদেন।

এ দিকে ফ্লোর প্রাইস প্রত্যাহারের দিনই দুই কোম্পানি বেক্সিমকো লি: ও ইসলামী ব্যাংক পিএলসি গতকাল দিনের সার্কিট ব্রেকারের সর্বোচ্চ ১০ শতাংশ দরপতনের শিকার হয়েছে। ১১০ দশমিক ১০ টাকা থেকে বেক্সিমকো লিমিটেডের দর গতকাল নেমে আসে ৯৯ দশমিক ১০ টাকায়। অন্য দিকে ইসলামী ব্যাংকের শেয়ারদর ৩২ দশমিক ৬০ টাকা থেকে নেমে আসে ২৯ দশমিক ৪০ টাকায়। দিনের সার্কিট ব্রেকারের সর্বনিম্ন এ দরে কোম্পানি দু’টির যথাক্রমে ৮ হাজার ২৬ ও ৪০ হাজার ৪১৬টি শেয়ার বেচাকেনা হয়।

পুঁজিবাজার সংশ্লিষ্টরা এ দুই কোম্পানির শেয়ারের ওপর দীর্ঘদিন ধরে কার্যকর থাকা ফ্লোর প্রাইস প্রত্যাহারের বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের সিদ্ধান্তকে ইতিবাচক হিসেবে অভিহিত করেছেন। ডিএসই ব্রোকার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ডিবিএ) এ উপলক্ষে গতকাল এক বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করেছে। সংগঠনটির মতে, এ সিদ্ধান্ত বাজারে স্বাভাবিক লেনদেন পুনঃপ্রতিষ্ঠা, মূল্য আবিষ্কার প্রক্রিয়া সচল করা এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থা পুনর্গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। ডিবিএর সভাপতি সাইফুল ইসলাম স্বাক্ষরিত ওই বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করা হয়, বেক্সিমকো লিমিটেড এবং ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসির শেয়ারে দীর্ঘ সময় ধরে ফ্লোর প্রাইস বহাল থাকায় স্বাভাবিক লেনদেন ব্যাহত হচ্ছিল। একই সাথে বাজারে প্রকৃত চাহিদা ও জোগানের ভিত্তিতে মূল্য নির্ধারণের প্রক্রিয়াও বাধাগ্রস্ত হচ্ছিল।

সংগঠনটি আরো জানায়, ফ্লোর প্রাইসের কারণে মার্জিন ঋণ ব্যবহারকারী বিনিয়োগকারীদের মধ্যে নেতিবাচক ইকুইটির ঝুঁকি বৃদ্ধি পাচ্ছিল। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের কাছেও দেশের পুঁজিবাজার সম্পর্কে নেতিবাচক ধারণা তৈরি হচ্ছিল, যা বাজারের ভাবমূর্তির জন্য অনুকূল ছিল না। ডিবিএর মতে, সামগ্রিক বাজার পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে বিএসইসির নবগঠিত কমিশন বেক্সিমকো লিমিটেড ও ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসির শেয়ারের ওপর আরোপিত ফ্লোর প্রাইস প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করায় বিনিয়োগকারীরা দীর্ঘদিন ধরে ওই দুই কোম্পানিতে আটকে থাকা বিনিয়োগ প্রত্যাহার করে নতুন বিনিয়োগ পরিকল্পনা গ্রহণ করার সুযোগ পাবে।

সংগঠনটি মনে করে, কমিশনের এই সময়োপযোগী উদ্যোগ বাজারে দীর্ঘদিনের স্থবিরতা দূর করতে সহায়ক হবে। একই সাথে স্বাভাবিক লেনদেন কার্যক্রম পুনরায় সচল হবে এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থা বৃদ্ধির ক্ষেত্রেও ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে। পাশাপাশি বাজারভিত্তিক মূল্য নির্ধারণ ব্যবস্থাকে আরো কার্যকর, স্বচ্ছ ও গতিশীল করতে এ সিদ্ধান্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

গতকাল ডিএসইতে লেনদেনের শীর্ষে ছিল ব্যাংকিং খাতের এনসিসি ব্যাংক। ৪৯ কোটি ৫২ লাখ টাকায় কোম্পানিটির ২ কোটি ৯৩ লাখ ৩১ হাজার শেয়ার হাতবদল হয় গতকাল। ২৯ কোটি ২৪ লাখ টাকায় ৩৪ লাখ ৩৮ হাজার শেয়ার বেচাকেনা করে সানলাইফ ইন্স্যুরেন্স উঠে আসে দ্বিতীয় স্থানে। ডিএসইর লেনদেনের শীর্ষ দশ কোম্পানির অন্যগুলো ছিল যথাক্রমে ডমিনেজ স্টিল বিল্ডিং সিস্টেমস, আইপিডিসি, সিভিও পেট্রোকেমিক্যাল রিফাইনারি, পিপলস ইন্স্যুরেন্স, সামিট অ্যালাইয়েন্স পোর্ট, আনোয়ার গ্যালভেনাইজিং, বেক্সিমকো ফার্মাসিউটিক্যালস ও রানার অটোমোবাইলস।

এদিন ডিএসইর মূল্যবৃদ্ধির শীর্ষস্থানে জায়গা করে নেয় সাধারণ বীমা কোম্পানি পিপলস ইন্স্যুরেন্স। কোম্পানিটির ৯ দশমিক ৯৮ শতাংশ মূল্যবৃদ্ধি ঘটে গতকাল। ৯ দশমিক ৮৩ শতাংশ মূল্যবৃদ্ধি পেয়ে এ তালিকায় দ্বিতীয় কোম্পানি ছিল একই খাতের মার্কেন্টাইল ইসলামী ইন্স্যুরেন্স। মূল্যবৃদ্ধিতে ডিএসইর শীর্ষ দশ কোম্পানির অন্যগুলো ছিল যথাক্রমে এপেক্স স্পিনিং, সামিট অ্যালাইয়েন্স পোর্ট, এশিয়ান ইন্স্যুরেন্স, সমতা লেদার, তাশরিফা ইন্ডাস্ট্রিজ, প্যারামাউন্ট ইন্স্যুরেন্স, নিটল ইন্স্যুরেন্স ও সিভিও পেট্রোকেমিক্যালস রিফাইনারি।

দিনের দরপতনের শীর্ষ দুই কোম্পানি ছিল বেক্সিমকো লিমিটেড ও ইসলামী ব্যাংক। দু’টি কোম্পানিই ১০ শতাংশ করে দর হারায়। দরপতনে ডিএসইর শীর্ষ দশ কোম্পানির অন্যগুলো ছিল যথাক্রমে- তুং হাই টেক্সটাইলস, ফারইস্ট ফিন্যান্স, পিপলস লিজিং, এফএ এস ফিন্যান্স, ক্রাউন সিমেন্ট, মেঘনা কনডেন্সড মিল্ক, সিএপিএম, বিডিবিএল, মিউচুয়াল ফান্ড ও প্রাইম টেক্সটাইলস।