জেলা তদারকিতে মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রীদের দায়িত্ব চ্যালেঞ্জ ১১ জামায়াত এমপির রিট

Printed Edition

নিজস্ব প্রতিবেদক

দেশের ৬৪ জেলায় সরকারের উন্নয়ন ও প্রশাসনিক কার্যক্রম তদারকি এবং সমন্বয়ে ৩০ জন মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী ও হুইপকে দেয়া বিশেষ দায়িত্বের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টে রিট দায়ের করেছেন জামায়াতে ইসলামীর ১১ জন সংসদ সদস্য। রিটে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ কর্তৃক জারি করা সংক্রান্ত প্রজ্ঞাপনটিকে আইনগত কর্তৃত্ববহির্ভূত ঘোষণার আরজি জানানো হয়েছে। গতকাল রোববার হাইকোর্টের সংশ্লিষ্ট শাখায় মামলাটি দায়ের করা হয়। মামলায় মন্ত্রিপরিষদ সচিবকে বিবাদি করা হয়েছে।

রিট আবেদনকারীদের পক্ষে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মোহাম্মদ শিশির মনির জানান, গত ২৭ আগস্ট মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ দেশের ৬৪টি জেলার আইনশৃঙ্খলা রক্ষা, দুর্নীতি ও মাদক নিয়ন্ত্রণ, সুশাসন প্রতিষ্ঠা, জবাবদিহি এবং উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ড দেখভালের জন্য মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী ও হুইপদের বিশেষ দায়িত্ব দিয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করে। রিট আবেদনে উক্ত প্রজ্ঞাপনের কার্যকারিতা স্থগিত চাওয়া হয়েছে। আইনজীবী শিশির মনির আরো জানান, সংবিধানের ৫৯ ও ৬০ অনুচ্ছেদে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের স্পষ্ট কাঠামো ও ক্ষমতার সীমারেখা দেয়া আছে। মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীদের জেলা পর্যায়ের প্রশাসনিক ও উন্নয়ন কার্যক্রমে সরাসরি তদারকির দায়িত্ব দেয়ায় স্থানীয় প্রশাসনে ‘ডায়ার্কি’ বা দ্বৈত শাসন প্রতিষ্ঠা পাবে। এর আগে ১৯৯১ ও ২০০১ সালেও একই ধরনের দায়িত্ব বণ্টন করা হলে তৎকালীন সংসদ সদস্য আনোয়ার হোসেন মঞ্জুর রিটের প্রেক্ষিতে হাইকোর্ট প্রজ্ঞাপনটিকে বেআইনি ঘোষণা করেছিলেন। বর্তমান প্রজ্ঞাপনে হাইকোর্টের ২০০৩ সালের রায় এবং ১৯৯৬ সালের ‘রুলস অব বিজনেস’-এর কথা বলা হলেও মূল রায়ের বক্তব্যের বিপরীতভাবেই এই দায়িত্ব দেয়া হয়েছে।

রিট দায়েরকারী জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্যরা হলেন মোহাম্মদ নাজিবুর রহমান (পাবনা-১), মীর আহমাদ বিন কাসেম (ঢাকা-১৪), গোলাম রব্বানী (রংপুর-৫), নূরুল ইসলাম (চাঁপাইনবাবগঞ্জ-৩), মাসুদ পারভেজ (চুয়াডাঙ্গা-১), মুহাম্মাদ আজীজুর রহমান (যশোর-১), শেখ মনজুরুল হক রাহাদ (বাগেরহাট-২), শফিকুল ইসলাম (পটুয়াখালী-২), রাশেদুল ইসলাম রাশেদ (শেরপুর-১), সালাহ উদ্দিন (গাজীপুর-৪) এবং মোহাম্মদ জহিরুল ইসলাম (চট্টগ্রাম-১৬)। চলতি সপ্তাহেই হাইকোর্টের একটি বেঞ্চে মামলাটির শুনানির সম্ভাবনা রয়েছে।

এর আগে দেশের বিভিন্ন জেলায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, দুর্নীতি ও মাদক নিয়ন্ত্রণ, সুশাসন, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার পাশাপাশি জনকল্যাণমূলক ও উন্নয়ন কার্যক্রমসহ সার্বিক সরকারি কার্যাবলি তদারকি ও সমন্বয়ের দায়িত্ব দেয়া হয়েছে মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী ও জাতীয় সংসদের হুইপদের।

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনোত্তর গঠিত সরকারের মন্ত্রিপরিষদের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী দেশের ৬৪ জেলার জন্য এ দায়িত্ব বণ্টন করে, গত ২৭ আগস্ট এ সংক্রান্ত প্রজ্ঞাপন জারি করেছে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ।

প্রজ্ঞাপনে বলা হয়, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনোত্তর গঠিত সরকারের মন্ত্রিপরিষদ গভীর উদ্বেগের সাথে দীর্ঘদিন ধরে লক্ষ্য করছে যে, বিগত ফ্যাসিস্ট আমলে দেশের বিভিন্ন জেলায় উন্নয়নের বরাদ্দ কাগজে-কলমে লেখা থাকলেও ব্যাপক দুর্নীতির মাধ্যমে লুটপাট সংগঠিত হয়েছে এবং এ সব লুটপাটের অর্থের একাংশ বিদেশে পাচার করা হয়েছে, যা জাতীয় ও আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমেও প্রকাশিত হয়েছে। লুটপাটের অর্থের অন্য অংশ দেশের অভ্যন্তরে মাদকসহ সামাজিক অবক্ষয়, জননিরাপত্তা ও রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকিস্বরূপ কাজে ব্যবহৃত হয়েছে, যা রাষ্ট্রের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর।

এতে বলা হয়, সরকার তথা মন্ত্রিপরিষদ দেশে উন্নয়ন, দুর্নীতি দমন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষা, সুশাসন প্রতিষ্ঠা এবং জাতীয় নিরাপত্তাসহ রাষ্ট্র পরিচালনার সব কার্যাবলির জন্য সমষ্টিগতভাবে জাতীয় সংসদ ও জনগণের নিকট দায়বদ্ধ। টেকসই উন্নয়ন, সুশাসন, স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা ও দুর্নীতি নির্মূল নিশ্চিত করা বর্তমান সরকারের অন্যতম অগ্রাধিকারমূলক জরুরি কর্মসূচি।

প্রজ্ঞাপনে বলা হয়, সংবিধানের ৫৫ (২) অনুচ্ছেদে সুস্পষ্টভাবে বলা আছে যে, প্রধানমন্ত্রী কর্তৃক বা তার কর্তৃত্বে এই সংবিধান অনুযায়ী প্রজাতন্ত্রের নির্বাহী ক্ষমতা প্রযুক্ত হবে। রুলস অব বিজনেস অনুযায়ী প্রধানমন্ত্রী প্রয়োজন মনে করলে, যেকোনো ক্ষেত্রে এই রুলস থেকে বিচ্যুতির অনুমতি দিতে বা তা মঞ্জুর করতে পারেন।

আরো বলা হয়, এ বিষয়গুলো পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে মন্ত্রিসভায় আলোচিত হয়েছে এবং সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। হাইকোর্ট বিভাগ থেকে দেয়া রিট পিটিশন মামলার (নং ৩৫১২/২০০৩) রায়ের মর্ম মতে এ ধরনের দায়িত্ব বণ্টন সরকারের এখতিয়ারের মধ্যেই পড়ে। সেজন্য স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলো এবং অন্যান্য সাংবিধানিক ও সংবিধিবদ্ধ সংস্থার আইনগত ক্ষমতা খর্ব না করে সংবিধান প্রদত্ত প্রধানমন্ত্রীর উল্লিখিত ক্ষমতা এবং রুলস অব বিজনেসের বিধান অনুসরণ করে মন্ত্রিসভার এ সিদ্ধান্তের আলোকে, সরকার এসব মন্ত্রী/প্রতিমন্ত্রী ও জাতীয় সংসদের হুইপকে নিচের জেলার আইনশৃঙ্খলা, দুর্নীতি ও মাদক নিয়ন্ত্রণ, সুশাসন, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা এবং জনকল্যাণমূলক ও উন্নয়ন কার্যক্রমসহ সার্বিক সরকারি কার্যাবলি তদারকি ও সমন্বয়ের দায়িত্ব প্রদান করল।