নিজস্ব প্রতিবেদক
দেশের চলমান বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সঙ্কট সমাধানে প্রধানমন্ত্রী বিরোধী দলগুলোর কাছে কার্যকর পরিকল্পনা চাওয়াকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছে জামায়াতে ইসলামী। তবে দলটির সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেছেন, সঙ্কট সমাধানে তাদের দেয়া ১০ দফা পরিকল্পনা তিন মাস আগেই সরকারের কাছে জমা দেয়া হয়েছে। এখন নতুন পরিকল্পনা নয়, ওই পরিকল্পনার কতটুকু বাস্তবায়ন হয়েছে- সরকারকে তার হিসাব দিতে হবে।
তিনি বলেন, গত ২১ মে জাতীয় সংসদের জ্বালানি সঙ্কটসংক্রান্ত বিশেষ কমিটিতে বিরোধী দলের সদস্যরা লিখিতভাবে ১০ দফা সুপারিশ দিয়েছিলেন। পরে ৭ জুন জ্বালানিমন্ত্রী ওই প্রতিবেদন জাতীয় সংসদে উপস্থাপন করেন। বিভিন্ন গণমাধ্যমেও এসব সুপারিশ প্রকাশিত হয়েছে।
গতকাল রোববার সন্ধ্যায় রাজধানীর মগবাজারের আল-ফালাহ মিলনায়তনে ‘চলমান বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সঙ্কট এবং জনদুর্ভোগ’ নিয়ে আয়োজিত জরুরি সংবাদ সম্মেলনে তিনি এসব কথা বলেন।
মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, ‘আজকের মূল প্রশ্ন পরিকল্পনা আছে কি নেই, সেটি নয়। মূল প্রশ্ন হলো- ২১ মে থেকে সরকারের হাতে থাকা এই পরিকল্পনার কতটুকু বাস্তবায়ন হয়েছে, কোন সুপারিশে কাজ শুরু হয়েছে এবং কোনগুলো এখনো কাগজেই পড়ে আছে।’
তিনি জানান, জামায়াতের প্রস্তাবের মধ্যে রয়েছে দেশীয় গ্যাস উৎপাদন বাড়াতে দ্রুত ফলদায়ক কূপে ওয়ার্কওভার, ভোলা, জামালপুর ও জকিগঞ্জের গ্যাস জাতীয় ব্যবস্থায় যুক্ত করার উদ্যোগ, স্থল ও সমুদ্রভাগে গ্যাস অনুসন্ধান জোরদার, বাপেক্সের সক্ষমতা বাড়ানো, সিঙ্গেল পয়েন্ট মুরিং (এসপিএম) দ্রুত চালু, ডিপো থেকে গ্রাহক পর্যায় পর্যন্ত ডিজিটাল মনিটরিং, কার্যকর নেট মিটারিংয়ের মাধ্যমে রুফটপ সোলার সম্প্রসারণ এবং ভবিষ্যৎ বিদ্যুৎ ও জ্বালানি চাহিদা নিরূপণে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত স্বাধীন বিশেষজ্ঞদের সম্পৃক্ত করা।
৯০ দিনে ছয় কাজের প্রস্তাব
জ্বালানি সঙ্কট মোকাবেলায় আগামী ৯০ দিনের মধ্যে অন্তত ছয়টি দৃশ্যমান পদক্ষেপ নেয়া সম্ভব বলে মনে করে জামায়াত। এর মধ্যে রয়েছে দ্রুত ফলদায়ক গ্যাসকূপে ওয়ার্কওভার, বন্ধ ও কম উৎপাদনশীল কূপের পূর্ণ তালিকা প্রকাশ, ভোলার গ্যাস ব্যবহারে অন্তর্বর্তী ব্যবস্থা সম্প্রসারণ, সিস্টেম লস ও অবৈধ গ্যাস সংযোগের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা, গ্যাস বণ্টনের প্রকাশ্য সময়সূচি এবং এসপিএম ও ডিজিটাল পর্যবেক্ষণ দ্রুত কার্যকর করা।
গোলাম পরওয়ার বলেন, তিন মাসে সমুদ্রভাগে নতুন গ্যাস অনুসন্ধানের ফল পাওয়া, বড় নতুন পাইপলাইন নির্মাণ কিংবা ইস্টার্ন রিফাইনারি-২ পুরোপুরি বাস্তবায়ন সম্ভব নয়। তাই জনগণকে অবাস্তব প্রতিশ্রুতি না দিয়ে স্বল্পমেয়াদে বাস্তবায়নযোগ্য পদক্ষেপ নিতে হবে।
তিনি প্রস্তাব করেন, প্রথম ১৫ দিনের মধ্যে পেট্রোবাংলা ও বাপেক্স দ্রুত ফলদায়ক ওয়ার্কওভারযোগ্য কূপের অগ্রাধিকার তালিকা প্রকাশ করবে এবং ৩০ দিনের মধ্যে প্রয়োজনীয় অনুমোদন শেষ করবে। একই সাথে কারিগরি কারণে বন্ধ থাকা কূপগুলোর পূর্ণ তালিকা প্রকাশ করে কোন কূপ সংস্কারের মাধ্যমে আবার উৎপাদনে আনা সম্ভব, তাও জানাতে হবে।
এফএসআরইউ নিয়ে প্রশ্ন
গ্যাসসঙ্কট মোকাবেলায় নতুন এফএসআরইউ নির্মাণের বিরোধিতা না করলেও এর ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতার বিষয়ে সতর্ক করেছেন গোলাম পরওয়ার।
তিনি বলেন, এফএসআরইউ নিজে গ্যাস উৎপাদন করে না। এটি পরিচালনার জন্য এলএনজি আমদানি করতে হয়। এজন্য বৈদেশিক মুদ্রার প্রয়োজন হয় এবং আমদানি করা এলএনজিকে গ্যাসে রূপান্তরের পর জাতীয় গ্রিডে সরবরাহের জন্য পর্যাপ্ত পাইপলাইনও দরকার।
তার প্রশ্ন, ‘এলএনজি কোথা থেকে আসবে, কত দামে আসবে, দীর্ঘমেয়াদি সরবরাহ চুক্তি কী হবে, পাইপলাইন কখন হবে এবং দেশীয় গ্যাস উৎপাদন কত বাড়বে- এসব প্রশ্নের উত্তর ছাড়া শুধু একটি নতুন ভাসমান টার্মিনালকে পুরো সঙ্কটের সমাধান হিসেবে দেখানো বাস্তবসম্মত হবে না।’
২০২৫-২৬ অর্থবছরে এলএনজি আমদানিতে প্রায় ৫৯ হাজার কোটি টাকা ব্যয় এবং প্রায় ১৪ হাজার ৬০০ কোটি টাকা সরকারি ভর্তুকির তথ্য উল্লেখ করে তিনি বলেন, প্রয়োজন হলে তৃতীয় এফএসআরইউ নির্মাণে জামায়াত সমর্থন করবে। তবে একই সাথে দেশীয় গ্যাস উৎপাদন বাড়ানোর উদ্যোগও নিতে হবে।
‘হারিকেনের সামনে ফ্যান’ প্রসঙ্গে
প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যে হারিকেনের সামনে ফ্যান চলার ছবি প্রসঙ্গেও প্রতিক্রিয়া জানান জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল। তিনি বলেন, ‘হারিকেনের সামনে ফ্যান চলার ছবি দিয়ে দেশের জ্বালানি সঙ্কটের বাস্তবতা খণ্ডন করা যায় না।’
তার মতে, একটি নির্দিষ্ট সময়ে একটি নির্দিষ্ট স্থানে ফ্যান চলছিল কি না, সেটি দেশের সামগ্রিক গ্যাস ও বিদ্যুৎ পরিস্থিতি মূল্যায়নের মানদণ্ড হতে পারে না। হারিকেন রাজনৈতিক প্রতিবাদের প্রতীক হতে পারে; কিন্তু এর জবাব হওয়া উচিত তথ্য দিয়ে।
মিয়া গোলাম পরওয়ার দাবি করেন, দেশে গ্যাসের চাহিদা ও সরবরাহের মধ্যে বড় ব্যবধান রয়েছে। জুলাইয়ে একটি এফএসআরইউ বন্ধ হওয়ার পর দৈনিক প্রায় ৪৫০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ কমে যাওয়ার তথ্যও প্রকাশিত হয়েছে। তাদের আগের নথিতে দেশে গ্যাসের চাহিদা প্রায় তিন হাজার ৮০০ থেকে চার হাজার মিলিয়ন ঘনফুট এবং সরবরাহ দুই হাজার ৬০০ থেকে দুই হাজার ৭০০ মিলিয়ন ঘনফুটের মধ্যে থাকার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
তিনি বলেন, ‘মানুষ চুলায় গ্যাস চায়, কারখানায় উৎপাদন চায়, নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ চায়। এ দাবির জবাব রাজনৈতিক ব্যঙ্গ দিয়ে নয়, কার্যকর সমাধান দিয়ে দেয়া উচিত।’
জাতীয় জরুরি জ্বালানি সেল গঠনের প্রস্তাব
সঙ্কট মোকাবেলায় চারটি প্রশাসনিক সংস্কারের প্রস্তাবও তুলে ধরেন গোলাম পরওয়ার। এর মধ্যে রয়েছে সব অংশীজনকে নিয়ে ন্যাশনাল ইমার্জেন্সি এনার্জি সেল গঠন, নির্দিষ্ট আর্থিক সীমার মধ্যে জরুরি ওয়ার্কওভার ও সংস্কারকাজের অনুমোদনক্ষমতা পেট্রোবাংলা ও বাপেক্সের পরিচালনা পর্ষদকে দেয়ার বিষয় বিবেচনা, জরুরি দরপত্র মূল্যায়নে স্থায়ী ব্যবস্থা এবং অগ্রাধিকার প্রকল্পে একক তদারকি ব্যবস্থা চালু করা।
তিনি বলেন, রূপপুর বেস লোড প্ল্যান্ট কবে উৎপাদনে আসবে এবং এর ট্যারিফ কত হবে, জনগণকে তা জানাতে হবে। একই সাথে কোন ফাইল কোথায় কত দিন আটকে আছে- সেই তথ্যও নিয়মিত প্রকাশ করা উচিত।
৯০ দিন পর সংসদে অগ্রগতি প্রতিবেদন
প্রধানমন্ত্রীর আহ্বানের জবাবে সরকারকে নতুন পরিকল্পনা না চেয়ে ইতোমধ্যে দেয়া বিরোধী দলের ১০ দফা এবং সংসদীয় বিশেষ কমিটির সুপারিশ সামনে রেখে যৌথ বাস্তবায়ন কাঠামো গঠনের প্রস্তাব দিয়েছেন গোলাম পরওয়ার।
তিনি বলেন, সরকার, বিরোধী দল, পেট্রোবাংলা, বাপেক্স, বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড, প্রকৌশলী, ব্যবসায়ী ও স্বাধীন জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের নিয়ে নিয়মিত পর্যালোচনার ব্যবস্থা করতে হবে। ৯০ দিন পর জাতীয় সংসদে অগ্রগতি প্রতিবেদন দিতে হবে।
‘কোন সুপারিশ বাস্তবায়িত হয়েছে, কোনটি হয়নি, কত গ্যাস বেড়েছে, কত সিস্টেম লস কমেছে এবং কত অবৈধ সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়েছে- জনগণ সেই হিসাব দেখুক,’ বলেন তিনি।
তিনি আরো বলেন, জামায়াত সরকারকে ব্যর্থ দেখতে চায় না। জ্বালানি সঙ্কটে সরকার ব্যর্থ হলে শুধু সরকার নয়, দেশ ও অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। তাই রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকলেও জ্বালানি নিরাপত্তার প্রশ্নে প্রতিযোগিতা হওয়া উচিত কার্যকর সমাধান, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির ক্ষেত্রে।
শেষে গোলাম পরওয়ার বলেন, ‘আমাদের পরিকল্পনা আপনার সরকারের কাছেই আছে। আজ আবারো আমরা সেটি সামনে রাখলাম। এখন প্রশ্ন একটাই- বাস্তবায়ন শুরু হবে, নাকি আবার নতুন পরিকল্পনা ও নতুন কমিটির অপেক্ষায় থাকতে হবে? আমরা ৯০ দিন পর হিসাব চাইব- সরকারকে বিব্রত করার জন্য নয়, দেশের মানুষের পক্ষে।’
সংবাদ সম্মেলনে জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মাওলানা এ টি এম মা’ছুম, হামিদুর রহমান আযাদ, মোয়াযযম হোসাইন হেলাল, নির্বাহী পরিষদ সদস্য সাইফুল আলম খান মিলন এমপি, নূরুল ইসলাম বুলবুল এমপি, ড. শফিকুল ইসলাম মাসুদ এমপি ও নাজিবুর রহমান মোমেন এমপিসহ দলের নেতারা উপস্থিত ছিলেন।



