নতুন বাস্তবতায় তরুণদের দক্ষতা উন্নয়নের তাগিদ

এআই যুগে বদলে যাচ্ছে চাকরির বাজার

শাহ আলম নূর
Printed Edition

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই প্রযুক্তির দ্রুত বিস্তারে বিশ্বজুড়ে চাকরির বাজারে বড় ধরনের পরিবর্তন দেখা দিয়েছে। যে কাজগুলো একসময় শুধুমাত্র মানুষের দক্ষতার ওপর নির্ভরশীল ছিল, এখন তার অনেকাংশই সম্পন্ন হচ্ছে এআইভিত্তিক সফটওয়্যার ও অটোমেশন প্রযুক্তির মাধ্যমে। এতে বদলে যাচ্ছে চাকরির ধরন, নিয়োগের কাঠামো এবং কর্মীদের কাছ থেকে প্রত্যাশিত দক্ষতার ধরনও। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই পরিবর্তিত বাস্তবতায় বাংলাদেশের তরুণদের শুধু অ্যাকাডেমিক ডিগ্রি নয়, প্রযুক্তিগত দক্ষতা, সৃজনশীল চিন্তাশক্তি, যোগাযোগ সক্ষমতা এবং দ্রুত নতুন কিছু শেখার মানসিকতা গড়ে তুলতে হবে।

আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) এক গবেষণায় বলা হয়েছে, এআই পুরোপুরি মানুষের চাকরি কেড়ে নিচ্ছে না; বরং কাজের ধরন পরিবর্তন করছে। তবে পুনরাবৃত্তিমূলক ও নিয়মভিত্তিক কাজগুলো সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে। ব্যাংকিং, কাস্টমার সার্ভিস, ডাটা এন্ট্রি, সাধারণ হিসাবরক্ষণ, কনটেন্ট প্রসেসিং এবং প্রশাসনিক বিভিন্ন কাজে অটোমেশন দ্রুত বাড়ছে। একই সাথে নতুন ধরনের দক্ষ কর্মীর চাহিদাও তৈরি হচ্ছে।

বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের (ডব্লিউএফ) সাম্প্রতিক এক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, ২০৩০ সালের মধ্যে বিশ্বব্যাপী প্রায় ২২ শতাংশ চাকরি প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের কারণে রূপান্তরের মধ্য দিয়ে যাবে। একই সময়ে প্রায় ১৭ কোটি নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হলেও প্রায় ৯ কোটি চাকরি বিলুপ্ত বা সঙ্কুচিত হতে পারে। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, ভবিষ্যতের চাকরির বাজারে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দক্ষতার মধ্যে থাকবে বিশ্লেষণধর্মী চিন্তা, প্রযুক্তি ব্যবহারের সক্ষমতা, সৃজনশীলতা, সমস্যা সমাধানের দক্ষতা এবং অভিযোজন ক্ষমতা।

বাংলাদেশেও এআই প্রযুক্তির প্রভাব দৃশ্যমান হতে শুরু করেছে। বিশেষ করে তথ্যপ্রযুক্তি, গণমাধ্যম, ই-কমার্স, ডিজিটাল মার্কেটিং, সফটওয়্যার ডেভেলপমেন্ট, আর্থিক খাত এবং গ্রাহকসেবা খাতে এআই টুল ব্যবহারের হার দ্রুত বাড়ছে। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান এখন কম জনবল দিয়ে বেশি কাজ সম্পন্ন করতে পারছে। এতে প্রচলিত কিছু চাকরির চাহিদা কমে গেলেও নতুন দক্ষতাভিত্তিক কাজের সুযোগ তৈরি হচ্ছে।

দেশের তথ্যপ্রযুক্তি খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আগে শুধুমাত্র সফটওয়্যার ব্যবহারের সাধারণ জ্ঞান থাকলেই অনেক চাকরি পাওয়া যেত। কিন্তু এখন প্রতিষ্ঠানগুলো এমন কর্মী খুঁজছে যারা চ্যাটজিপিটি, জেমিনি, কপিলট, মিডজারনি কিংবা বিভিন্ন অটোমেশন প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে কাজের গতি ও মান বাড়াতে পারে। ফলে ‘এআই লিটারেসি’ বা এআই প্রযুক্তি বোঝার সক্ষমতা এখন গুরুত্বপূর্ণ যোগ্যতা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব সফটওয়্যার অ্যান্ড ইনফরমেশন সার্ভিসেসের (বেসিস) তথ্য অনুযায়ী, দেশে আইটি ও আইটিইএস খাতে বর্তমানে প্রায় ২০ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান রয়েছে। তবে খাত সংশ্লিষ্ট উদ্যোক্তারা বলছেন, আগামী পাঁচ বছরে চাকরির বড় অংশই দক্ষতাভিত্তিক হয়ে উঠবে এবং সাধারণ ডিগ্রিধারীদের তুলনায় প্রযুক্তি-সক্ষম কর্মীরা বেশি অগ্রাধিকার পাবেন।

ঢাকার একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের কম্পিউটার বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক ড. মাহফুজ রহমান নয়া দিগন্তকে বলেন, এআই এমন অনেক কাজ করতে পারে যা নিয়মভিত্তিক ও পুনরাবৃত্তিমূলক। কিন্তু নেতৃত্ব, সৃজনশীলতা, আবেগ বোঝা, সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং জটিল সমস্যা সমাধানের মতো দক্ষতা এখনো মানুষের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। তাই ভবিষ্যতের চাকরির বাজারে প্রযুক্তিগত ও মানবিক দক্ষতার সমন্বয় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হবে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশের তরুণদের জন্য এখন সবচেয়ে প্রয়োজন ডিজিটাল দক্ষতা, ডাটা বিশ্লেষণ, প্রোগ্রামিং, সাইবার নিরাপত্তা, ক্লাউড কম্পিউটিং, এআই টুল ব্যবহারের সক্ষমতা এবং ইংরেজি যোগাযোগ দক্ষতা। পাশাপাশি ‘সফট স্কিল’ বা মানবিক দক্ষতার গুরুত্বও দ্রুত বাড়ছে। সময় ব্যবস্থাপনা, দলগতভাবে কাজ করার সক্ষমতা, সমালোচনামূলক চিন্তা এবং নতুন পরিবেশের সাথে খাপখাওয়ানোর ক্ষমতা এখন নিয়োগদাতাদের কাছে বড় বিবেচ্য বিষয় হয়ে উঠেছে।

ফ্রিল্যান্সিং খাতেও এআই বড় ধরনের পরিবর্তন এনেছে। আগে সাধারণ গ্রাফিক ডিজাইন, ডাটা প্রসেসিং বা কনটেন্ট রাইটিংয়ের মাধ্যমে সহজে আয় করা গেলেও এখন সেখানে প্রতিযোগিতা অনেক বেড়েছে। কারণ এআইভিত্তিক সফটওয়্যার কয়েক মিনিটের মধ্যেই অনেক সাধারণ কাজ সম্পন্ন করতে পারছে। ফলে ফ্রিল্যান্সারদের এখন আরো বিশেষায়িত দক্ষতা অর্জন করতে হচ্ছে।

তথ্যপ্রযুক্তি উদ্যোক্তা রেদওয়ান ইসলাম নয়া দিগন্তকে বলেন, ‘বর্তমানে শুধু ফটোসপ বা ক্যানভা জানলেই হবে না। একজন ডিজাইনারকে এখন এআই অ্যাসেস্টেন ডিজাইন, ক্রিয়েটিভ স্ট্র্যাটেজি এবং গেস প্রোমিট ইঞ্জিনিয়ারিংও জানতে হচ্ছে। একইভাবে কনটেন্ট রাইটারদের শুধু লেখা নয়, গবেষণা, বিশ্লেষণ এবং ব্র্যান্ডভিত্তিক কৌশলগত চিন্তার দক্ষতাও থাকতে হচ্ছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থা এখনো অনেকাংশে তাত্ত্বিক জ্ঞানের ওপর নির্ভরশীল। ফলে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাশ করা অনেক শিক্ষার্থী বাস্তব চাকরির বাজারের সাথে তাল মেলাতে পারছে না। আন্তর্জাতিক গবেষণাগুলোতেও বাংলাদেশের এআই প্রস্তুতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। গবেষকদের মতে, দেশের অধিকাংশ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কারিকুলামে এখনো আধুনিক প্রযুক্তি, এআই শিক্ষা এবং বাস্তবমুখী প্রশিক্ষণের ঘাটতি রয়েছে।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্য অনুযায়ী, দেশে তরুণ জনগোষ্ঠীর সংখ্যা প্রায় ৪ কোটির বেশি। প্রতি বছর লাখ লাখ তরুণ চাকরির বাজারে প্রবেশ করলেও দক্ষতার ঘাটতির কারণে অনেকেই কাক্সিক্ষত চাকরি পাচ্ছেন না। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, এই বিশাল জনগোষ্ঠীকে দক্ষ মানবসম্পদে রূপান্তর করা না গেলে ভবিষ্যতে বেকারত্ব আরো বাড়তে পারে।

আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) ব্যবস্থাপনা পরিচালক ক্রিস্টালিনা জর্জিয়েভা সম্প্রতি সতর্ক করে বলেছেন, এআই তরুণদের চাকরির বাজারে ‘সুনামির’ মতো প্রভাব ফেলতে পারে। কারণ অনেক এন্ট্রি-লেভেল চাকরি অটোমেশনের কারণে কমে যেতে পারে। তবে একই সাথে নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগও তৈরি হবে, যেখানে দক্ষতার ভিত্তিতেই প্রতিযোগিতা হবে।

বিশ্বব্যাপী বর্তমানে এআই ট্রেইনার, মেশিন লার্নিং ইঞ্জিনিয়ার, সাইবার নিরাপত্তা বিশ্লেষক, ডাটা সায়েন্টিস্ট, এআই কনটেন্ট স্ট্র্যাটেজিস্ট, প্রম্পট ইঞ্জিনিয়ার এবং ডিজিটাল প্রোডাক্ট ম্যানেজারের মতো পেশার চাহিদা দ্রুত বাড়ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশের তরুণরা যদি সময়োপযোগী প্রশিক্ষণ ও দক্ষতা অর্জনে মনোযোগী হয়, তাহলে বৈশ্বিক ডিজিটাল অর্থনীতিতে বড় সুযোগ সৃষ্টি হতে পারে।

বিশ্বব্যাংক ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন নয়া দিগন্তকে বলেন, সরকার, বিশ্ববিদ্যালয় এবং বেসরকারি খাতকে যৌথভাবে দ্রুত রিস্কিলিং ও আপস্কিলিং উদ্যোগ নিতে হবে। শিল্পখাতভিত্তিক প্রশিক্ষণ, প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষা, অনলাইন কোর্স এবং বাস্তবভিত্তিক দক্ষতা উন্নয়নে বিনিয়োগ বাড়ানো প্রয়োজন। একই সাথে গ্রামীণ তরুণদের ডিজিটাল প্রশিক্ষণের আওতায় আনার ওপরও গুরুত্ব দিচ্ছেন তারা। তিনি বলেন, আগামী দিনের চাকরির বাজারে সবচেয়ে বড় যোগ্যতা হবে দ্রুত নতুন কিছু শেখার সক্ষমতা। প্রযুক্তি প্রতিনিয়ত বদলাবে, কাজের ধরনও পরিবর্তিত হবে। সেই বাস্তবতায় যারা প্রযুক্তিকে ভয় না পেয়ে নিজেদের দক্ষতা উন্নয়নে মনোযোগী হবে, তারাই ভবিষ্যতের প্রতিযোগিতামূলক চাকরির বাজারে এগিয়ে থাকবে বলে তিনি মনে করেন।