অর্থনৈতিক প্রতিবেদক
সারা দেশের সাথে পুঁজিবাজারেও যোগ হয়েছে ভোটের আমেজ। দীর্ঘদিনের মন্দা কাটিয়ে যেন গা ঝাড়া দিয়ে উঠেছে পুঁজিবাজার। গত দু’দিনের পুঁজিবাজার আচরণ দেখলে দীর্ঘদিন পর সারা দেশ যেমন নির্বাচন নিয়ে উৎসবমুখর দিন পার করছে তেমনি তার ঢেউ এসে যেন লেগেছে পুঁজিবাজারেও। এ দু’দিনে দেশের দুই পুঁজিবাজার সূচক পৌঁছে গেছে সাম্প্রতিক সময়ের সর্বোচ্চ অবস্থানে। সোমবার বাজারে খুব একটা গতি না থাকলেও গতকাল ঢাকা শেয়ারবাজারের লেনদেনও পৌঁছে যায় সাম্প্রতিক সময়ের সর্বোচ্চ স্থানে। বাজার সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন শান্তিপূর্ণভাবে নির্বাচন শেষ হওয়ার পর নতুন সরকার গঠিত হলে বাজারের এ ইতিবাচক প্রবণতা অব্যাহত থাকবে।
দেশের প্রধান পুঁজিবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) প্রধান সূচক ডিএসইএক্স গতকাল ৮৭ দশমিক ৯৯ পয়েন্ট উন্নতি ঘটে। সকালে পাঁচ হাজার ৩১১ দশমিক ৯৪ পয়েন্ট থেকে লেনদেন শুরু করা সূচকটি দিনশেষে পৌঁছে যায় পাঁচ হাজার ৩৯৯ দশমিক ৯৩ পয়েন্টে। এ নিয়ে গত দু’দিনে ডিএসইর প্রধান সূচকটির উন্নতি ঘটল ১৭০ দশমিক ৮৪ পয়েন্ট। আর এভাবে সাম্প্রতিক সময়ের সর্বোচ্চ অবস্থানে পৌঁছে গেল সূচকটি। একই আচরণ ছিল বাজারটির দুই বিশেষায়িত সূচকেরও। এদিন ডিএসই্র দুই বিশেষায়িত সূচক ডিএসই-৩০ ও ডিএসই শরিয়াহর উন্নতি ঘটে যথাক্রমে ২৭ দশমিক ৩৮ ও ১৯ দশমিক ৪৫ পয়েন্ট।
দেশের দ্বিতীয় পুঁজিবাজার চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জে (সিএসই) প্রধান সূচক সিএএসপিআই গতকাল ২৫৩ দশমিক ৭২ পয়েন্ট বৃদ্ধি পায়। ১৪ হাজার ৭৯২ দশমিক ৮৮ পয়েন্ট থেকে সকালে যাত্রা করা সূচকটি মঙ্গলবার দিনশেষে স্থির হয় ১৫ হাজার ৪৬ দশমিক ৬০ পয়েন্টে। এটি বিগত পাঁচ মাসের মধ্যে সূচকটির সর্বোচ্চ অবস্থান। গত বছরের সেপ্টেম্বরের পর আর এ পর্যায়ে পৌঁছেনি সূচকটি। একই সময় বাজারটির বিশেষায়িত দুই সূচক সিএসই-৩০ ও সিএসসিএক্স সূচকের উন্নতি ঘটে যথাক্রমে ২৩৮ দশমিক ০৮ ও ১৪৩ দশমিক ৮৪ পয়েন্টে।
সূচকের পাশাপাশি উন্নতি ঘটে পুঁজিবাজারের লেনদেনেও। ঢাকা শেয়ারবাজারে গতকাল ৭৯০ কোটি টাকার লেনদেন নিষ্পত্তি হয়েছে যা আগের দিন অপেক্ষা ১৪৪ কোটি টাকা বেশি। আগের দিন বাজারটিতে ৬৪৬ কোটি টাকার লেনদেন হয়েছিল। এটি গত বছরের ১০ সেপ্টেম্বরের পর ডিএসইর সর্বোচ্চ লেনদেন। তবে সূচকের বড় উন্নতি সত্ত্বেও চট্টগ্রাম শেয়ারবাজারের লেনদেন এক জায়গায়ই ঘুরপাক খাচ্ছে। গতকাল সিএসইর লেনদেন ছিল ৯ কোটি ৪০ লাখ টাকা। সোমবার বাজারটির লেনদেন ছিল আট কোটি ৮৫ লাখ টাকা।
পুঁজিবাজার বিশ্লেষকদের মতে, দীর্ঘদিন পর দেশের সাধারণ নির্বাচনে যেমন উৎসবমুখর পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে তেমনি পুঁজিবাজারেও তার ঢেউ এসে লেগেছে। বিনিয়োগকারীদের মধ্যে এক ধরনের উৎসব উৎসব ভাব যা তাদেরকে নতুন করে বিনিয়োগ সিদ্ধান্ত নিতে সাহায্য করছে। দেশে নতুন গণতান্ত্রিক সরকার আসলে নতুন করে বিনিয়োগের সুযোগ তৈরি হবে। এটি দেশের অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ খাত হিসেবে পুঁজিাবাজরকেও প্রভাবিত করবে। এ ধারণা থেকেই মূলত বাজার নিয়ে বেশ আশাবাদী হয়ে উঠেছেন বিনিয়োগকারীরা। এখন অপেক্ষা শুধু শান্তিপূর্ণভাবে নির্বাচন সম্পন্ন হওয়া। এটি ঠিকভাবে সম্পন্ন হলে সাধারণ মানুষের মধ্যে স্বস্তি ফিরে আসবে যা দেশের অর্থনীতিকেও দ্রুত গতিশীল করে তুলবে। আর এর সুফল থেকে বাইরে থাকবে না পুঁজিবাজারও।
এদিকে গতকাল মতিঝিলে অবস্থিত ডিএসইর বিভিন্ন ব্রোকার হাউজ ও মার্চেন্ট ব্যাংকের ট্রেডিং ফ্লোরগুলো ঘুরে দেখা যায় বাজার আচরণ নিয়ে বিনিয়োগকারীরা বেশ উচ্ছ্বসিত। আর তাদের এ মানসিক স্বস্তিই মূলত গত দু’দিন বাজারসূচকও লেনদেনকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে গেছে। বেশ কয়েকজন বিনিয়োগকারী নয়া দিগন্তকে বলেন, দীর্ঘদিন পর পুঁজিবাজারকে পুঁজিবাজারের মতো মনে হচ্ছে। দীর্ঘদিন ধরে ধারাবাহিক দরপতনের ফলে তাদের যে বিপুল পরিমাণ লোকসানের শিকার হতে হয়েছে তা ভুলে এ মুহূর্তে তারা নতুন করে শুরু করতে চান। তারা মনে করেন, নতুন সরকার এলে পুঁজিবাজারের বিনিয়োগে নতুন করে গতি আসবে। তা ছাড়া পুঁজিবাজারের সাম্প্রতিক সময়ে যেসব সংস্কার করা হয়েছে তার যথার্থ বাস্তবায়ন করা গেলে সাধারণ মানুষও বাজারে প্রতি আস্থাশীল হয়ে উঠবে। এতে নতুন অনেক বিনিয়োগকারী বাজারের সাথে যুক্ত হতে পারে। গতকাল লেনদেনের শেষদিকে এসে বাজারের গতিই প্রমাণ করে সামনের দিনগুলোতে বাজার ভালো পারফর্ম করবে।
গতকাল ডিএসইতে লেনদেনের শীর্ষে উঠে আসে ব্যাংকিং খাতের কোম্পানি ব্র্যাক ব্যাংক। ৩০ কোটি ৭৩ লাখ টাকায় কোম্পানিটির ৩৯ লাখ ৩১ হাজার শেয়ার হাতবদল হয় এ দিন। ২৩ কোটি ৫৫ লাখ টাকায় ৯৩ লাখ ২২ হাজার শেয়ার বেচাকেনা করে বস্ত্র খাতের সিমটেক্স ইন্ডাস্ট্রিজ ছিল দিনের দ্বিতীয় কোম্পানি। ডিএসইতে লেনদেনের শীর্ষ ১০ কোম্পানির অন্যগুলো ছিল যথাক্রমে ঢাকা ব্যাংক, এশিয়াটিক ল্যাবরেটরিজ, ইসলামী ব্যাংক, সিটি ব্যাংক, স্কয়ার ফার্মাসিউটিক্যালস, মালেক স্পিনিং, সায়হাম টেক্সটাইলস ও বেক্সিমকো ফার্মাসিউটিক্যালস।
এদিন ডিএসইর মূল্যবৃদ্ধিতে শীর্ষ কোম্পানি ছিল ব্যাংকিং কোম্পানি আল আরাফাহ ইসলামী ব্যাংক। গতকাল ১০ শতাংশ মূল্যবৃদ্ধি ঘটে কোম্পানিটির। ৯ দশমিক ৭০ শতাংশ মূল্য বৃদ্ধি পেয়ে শার্প ইন্ডাস্ট্রিজ ছিল দিনের দ্বিতীয় অবস্থানে। মূল্যবৃদ্ধিতে ডিএসইর শীর্ষ ১০ কোম্পানির অন্যগুলো ছিল যথাক্রমে আইএফআইসি ব্যাংক, এক্সিম ব্যাংক ফার্স্ট মিউচুয়াল ফান্ড, প্রিমিয়ার ব্যাংক, এনআরবিসি ব্যাংক, এবি ব্যাংক, আইএফআইসি ফার্স্ট মিউচুয়াল ফান্ড, ইসলামী ব্যাংক ও ডেফোডিল কম্পিউটার।
গতকাল ডিএসইতে দরপতনের শীর্ষে ছিল কেয়া কসমেটিকস। কোম্পানিটির দরপতনের হার ছিল ৫ দশমিক ৫৫ শতাংশ। ৫ দশমিক ৪০ শতাংশ দর হারিয়ে এ তালিকার দ্বিতীয় কোম্পানি ছিল ন্যাশনাল ফিড লিমিটেড। ডিএসইর দরপতনে শীর্ষ ১০ কোম্পানির অন্যগুলো ছিল যথাক্রমে আইসিবি অগ্রণী ব্যাংক ফার্স্ট মিউচুয়াল ফান্ড, উত্তরা ফিন্যান্স, ডিবিএইচ ফার্স্ট মিউচুয়াল ফান্ড, মেঘনা কনডেন্সড মিল্ক, প্রগতি লাইফ ইন্স্যুরেন্স, মার্কেন্টাইল ইসলামিক ইন্স্যুরেন্স, আইসিবি থার্ড এনআরবি মিউচুয়াল ফান্ড ও এশিয়া প্যাসিফিক ইন্স্যুরেন্স।


