মালয়েশিয়ার স্থগিত শ্রমবাজারে আনুষ্ঠানিকভাবে চলতি মাসের শেষ সপ্তাহ থেকে শ্রমিক যাওয়ার কার্যক্রম শুরু হতে পারে। মালয়েশিয়ায় জরুরি সফরে গিয়ে দেশটির মন্ত্রী ও উচ্চ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের সাথে সফল বৈঠকের পর এমন ঘোষণা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের প্রবাসী কল্যাণ বিষয়ক উপদেষ্টা ড. মাহদী আমিন। এ সময় প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থাণ মন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী উপস্থিত ছিলেন। এর পর থেকেই দুই দেশের ব্যবসায়ীসহ এই পেশার মানুষদের মধ্যে জল্পনা কল্পনা শুরু হয়। তাদের প্রশ্ন, এবার কি সিন্ডিকেট মুক্ত থাকবে শ্রমবাজার নাকি সিন্ডিকেটেই কর্মী যাবে?
তবে গতকাল সন্ধ্যা পর্যন্ত প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়, জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরো (বিএমইটি), রিক্রুটিং এজেন্সির মালিকদের অফিসসহ পথে-প্রান্তরে শুধু একই আলোচনা, কোন ভাগ্যবান রিক্রুটিং এজেন্সিগুলো এবার তালিকায় ঢুকে কর্মী পাঠাতে পারবে? আসলে কত টাকা লাগবে? কিভাবে কোন প্রক্রিয়ায় কর্মী যাবে। যদিও প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বশীল সূত্রগুলো বলছে, যে প্রক্রিয়াতেই শ্রমবাজার খুলুক, এর পর যাতে কয়েক লাখ লোক দ্রুত মালয়েশিয়াতে যেতে পারেন।
গতকাল সন্ধ্যার পর নয়াপল্টনের বিএনপি অফিসের ১০০ গজ পূর্বে একটি চায়ের দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে কথা বলছিলেন বিদেশে শ্রমিক পাঠানোর ব্যবসার সাথে জড়িত দুই ব্যক্তি। তাদের কথোপকথন অনুযায়ী, এবার মালয়েশিয়ায় কর্মী যেতে কমপক্ষে সাত-আট লাখ টাকা লাগতে পারে। এর কমে কোনোভাবেই লোক যাওয়ার সুযোগ নেই। ইতোমধ্যে মালয়েশিয়ায় কলিং ভিসার দাম উঠে গেছে ১০-১৪ হাজার রিংগিত পর্যন্ত। তবে এবার কলিং ভিসাকে নাকি কয়েকটি ভাগ করা হয়েছে। এর মধ্যে কোম্পানি ভিসা ‘এ ক্যাটাগরি’, কন্সট্রাকশনসহ অন্যান্য বি ক্যাটাগরি এবং সাবাহ সারওয়াক যারা যাবে সেই ভিসাকে সি ক্যাটাগরি নির্ধারণ করা হয়েছে। এই প্রতিবেদক ‘জনশক্তি ব্যবসার সাথে কমবেশি জড়িত’ জানিয়ে তাদের সাথে এগিয়ে কথা বলতে গেলে তাদের মধ্যে একজন বলেন, এবার সিন্ডিকেটের রেট নাকি দুই লাখ টাকা করে ধার্য করা হয়েছে! ভিসার দামও বেশি। আমি এই মাত্র ভিসার দাম ১০ হাজার রিংগিত ধরে একজনের সাথে কন্ট্রাক্ট করে এলাম। সব ঠিক থাকলে আগামী ১০ তারিখ থেকেই মালয়েশিয়াগামী কর্মীদের স্বাস্থ্য পরীক্ষা শুরু হয়ে যাবে। এ সময় একজন আরেকজনকে তিন ক্যাটাগরির কলিং ভিসার রেট খাতায় লেখা বের করে কথা বলাবলি করছিলেন। এরপর নিজেরা বলাবলি করেন, এত টাকা দিয়ে লোক কি যাবে? এবার ডাইরেক্ট কর্মীর কাছ থেকে পাসপোর্ট সংগ্রহ করতে হবে। ভায়া হলে কর্র্মী পাঠিয়ে খুব একটা লাভ করা কঠিন হয়ে যাবে। পরে তাদের একজন নিজেকে এ প্রতিবেদককে বললেন, তাদের একজনের অফিস চায়না টাউনের ২০ তলার কর্নারে। শুধু এই দুই ব্যক্তিই এখন বিদেশগামী অফিসসহ গ্রাম পর্যন্ত এভাবে ব্যবসায়ী ও মধ্যস্বত্বভোগীরা কিভাবে কর্মী পাঠাবেন সেগুলো হিসাব নিকাশ শুরু করেছেন।
এর আগে গতকাল বিকেলে প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ে খোঁজ নিতে গেলে একাধিক কর্মকর্তা ও রিক্রুটিং এজেন্সির মালিক নিজেদের পরিচয় গোপন রাখার শর্তে নয়া দিগন্তকে বলেন, মালয়েশিয়া নিয়ে এখনই কেউ কোন কথা বলবেন না। তাই এখনই রিপোর্ট না করার জন্য তারা অনুরোধ করেন। এ সময় এক কর্মকর্তা বলেন, এখন পর্যন্ত শ্রমিক যাওয়াই তো শুরু হয়নি। আনুষ্ঠনিক ঘোষণাও আসেনি। আমি মনে করি এবার সবাই পাঠাতে পারবে। এ সময় উত্তরার একটি রিক্রুটিং এজেন্সির মালিক ওই কর্মকর্তাকে বলেন, স্যার ইতোমধ্যে মালয়েশিয়ার শ্রমবাজারে কিন্তু শক্তিশালী সিন্ডিকেট হয়ে গেছে! কিন্তু তিনি নাম প্রকাশ করে প্রতিবেদকের কাছে কথা বলতে রাজি হননি। শুনছি ২৫ সদস্যের এবারো সিন্ডিকেট হচ্ছে। এখন সেখানে কারা থাকতে পারেন, সেটি আজকালের মধ্যে মালয়েশিয়া থেকে একটি ঘোষণা আসার কথা রয়েছে। এই পর্যন্ত ধৈর্য ধরার অনুরোধ জানিয়ে তারা বলেন, এবার কম খরচে যেভাবে কর্মী যেতে পারবে সেভাবেই আমাদের সরকার, মন্ত্রণালয় থেকে কার্যক্রম চলছে।
এর আগে মালয়েশিয়ার বাংলাদেশ হাইকমিশন থেকে এক কর্মকর্তা নাম না প্রকাশের শর্তে নয়া দিগন্তকে বলেন, আমরা সরকারের নির্দেশনা মোতাবেক কাজ করব। কোনো সমস্যা যাতে না হয় সেগুলো নিশ্চিত করব। আমরা কোনো সিন্ডিকেট বুঝি না। অপর এক কর্মকর্তা নয়া দিগন্তকে বলেন, দাতো আমিন নুর এবারো সিন্ডিকেটের ফর্মুলা সাজাচ্ছেন। এখন তিনি কোনো ২৫-৩০-৫০ নাকি আরো বেশি জনকে তার তালিকায় রাখবেন সেটি দেখার বিষয়। ইতোমধ্যে অন্তর্বর্তী সরকারের সময় পাঠানো ৪২৩টি রিক্রুটিং এজেন্সির তালিকা থেকেই মালয়েশিয়া সরকার এজেন্সি বাছাইয়ের কাজ করছে। এখন সেখান থেকে কতজন রিক্রুটিং এজেন্সি এসডব্লিওসিএমএস-এর সার্ভারে সরাসরি কাজ করতে পারবে সেটি দেখার অপেক্ষায় রয়েছেন তিন হাজারের বেশি রিক্রুটিং এজেন্সির মালিক। যদিও দুই দেশের সরকারের পক্ষ থেকে বার্তা রয়েছে, এবার স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় এবং কম খরচেই মালয়েশিয়ায় কর্মী যাবে।



