মুদ্রা বিনিময়ে প্রবৃদ্ধি অব্যাহত, বেড়েছে ট্রেড মার্জিন আয় ও মূল্য সংযোজন

বিবিএসের অর্থনৈতিক জরিপ

বিশেষ সংবাদদাতা
Printed Edition

  • ট্রেড মার্জিন এক বছরে ২০ শতাংশ বৃদ্ধি
  • মার্কিন ডলার এখনো বাজারের প্রধান চালিকাশক্তি
  • মূল্য সংযোজন ২২.৫ শতাংশ বৃদ্ধি

দেশের বৈদেশিক মুদ্রা বিনিময় খাত গত দুই অর্থবছরে স্থিতিশীল প্রবৃদ্ধির ধারা বজায় রেখেছে। বৈদেশিক ভ্রমণ, প্রবাসী লেনদেন, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য এবং বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবস্থাপনার ক্রমবর্ধমান চাহিদার ফলে মুদ্রা বিনিময় প্রতিষ্ঠানগুলোর ট্রেড মার্জিন, আউটপুট, কর্মসংস্থান ব্যয় এবং মূল্য সংযোজন সব ক্ষেত্রেই ইতিবাচক প্রবৃদ্ধি পরিলক্ষিত হয়েছে। একই সাথে এ খাতে মার্কিন ডলারের আধিপত্য আরো সুস্পষ্ট হয়েছে।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর সাম্প্রতিক এক অর্থনৈতিক সমীক্ষায় এ চিত্র উঠে আসে। দেশের ৯৫টি মুদ্রা বিনিময় প্রতিষ্ঠানকে অন্তর্ভুক্ত করে পরিচালিত সমীক্ষার বিশ্লেষণে দেখা গেছে, মুদ্রা বিনিময় শিল্প এখনো মূলত ব্যক্তিমালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হলেও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর সম্প্রসারণও ধীরে ধীরে ঘটছে।

সমীক্ষা অনুযায়ী, দেশের মোট ৯৫টি মুদ্রা বিনিময় প্রতিষ্ঠানের মধ্যে প্রায় ৬৮ দশমিক ৪২ শতাংশ ব্যক্তি মালিকানাধীন। প্রাইভেট লিমিটেড কোম্পানি রয়েছে ১৬ দশমিক ৮৪ শতাংশ এবং অংশীদারত্বভিত্তিক প্রতিষ্ঠান রয়েছে ১৪ দশমিক ৭৪ শতাংশ।

পারিবারিক অংশীদারত্বভিত্তিক কোনো প্রতিষ্ঠান সমীক্ষায় পাওয়া যায়নি। বিশ্লেষকদের মতে, এটি প্রমাণ করে যে দেশের মুদ্রা বিনিময় খাত এখনো প্রধানত ক্ষুদ্র ও স্বতন্ত্র উদ্যোক্তাদের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে, যদিও করপোরেট কাঠামোর উপস্থিতিও ক্রমশ বাড়ছে।

মুদ্রা বিনিময় প্রতিষ্ঠানের নেতৃত্বেও লিঙ্গ বৈষম্য স্পষ্ট। সমীক্ষা অনুযায়ী, মোট প্রতিষ্ঠানের প্রায় ৯৪ দশমিক ৭৪ শতাংশের নেতৃত্বে রয়েছেন পুরুষ উদ্যোক্তা ও ব্যবস্থাপক। নারী নেতৃত্বাধীন প্রতিষ্ঠানের হার মাত্র ৫ দশমিক ২৬ শতাংশ।

এ ছাড়া কোনো হিজড়া ব্যক্তির নেতৃত্বাধীন প্রতিষ্ঠান পাওয়া যায়নি। অর্থনীতিবিদদের মতে, আর্থিক সেবা খাতে নারীর অংশগ্রহণ বাড়লেও মালিকানা ও ব্যবস্থাপনার পর্যায়ে তাদের উপস্থিতি এখনো সীমিত।

মুদ্রা বিনিময় খাতে কর্মসংস্থান তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল রয়েছে। ২০২২-২৩ অর্থবছরে প্রথম প্রান্তিকে মোট কর্মসংস্থান ছিল ৪১৪ জন, যা বছরের শেষ প্রান্তিকে বেড়ে দাঁড়ায় ৪২২ জনে।

পরবর্তী ২০২৩-২৪ অর্থবছরে কর্মসংস্থানে সামান্য প্রবৃদ্ধি লক্ষ করা গেছে। প্রথম প্রান্তিকে কর্মরত জনবল ছিল ৪২২ জন, যা চতুর্থ প্রান্তিকে বেড়ে হয়েছে ৪২৫ জন। উভয় অর্থবছরেই কর্মরত মালিকের সংখ্যা অপরিবর্তিত ছিল ১৩৫ জন। নিয়মিত বেতনভুক্ত কর্মীরাই খাতটির প্রধান শ্রমশক্তি হিসেবে রয়েছেন। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে নিয়মিত কর্মীর সংখ্যা ২৪০ থেকে ২৪২ জনের মধ্যে স্থিতিশীল ছিল। অন্যদিকে চুক্তিভিত্তিক কর্মীর সংখ্যা ছিল ৩২ জন এবং অবৈতনিক পারিবারিক শ্রমিকের সংখ্যা সামান্য বৃদ্ধি পেয়ে ১৫-১৬ জনে উন্নীত হয়েছে।

২০২২-২৩ অর্থবছরে মুদ্রা বিনিময় প্রতিষ্ঠানের মোট কর্মসংস্থান ব্যয় ছিল ৫৫ দশমিক ০৭ মিলিয়ন টাকা। পরবর্তী অর্থবছরে এই ব্যয় বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৬১ দশমিক ৪১ মিলিয়ন টাকায়, যা প্রায় ১১ দশমিক ৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধির ইঙ্গিত দেয়।

এ সময় নিয়মিত বেতনভুক্ত কর্মীদের জন্য ব্যয় সবচেয়ে বেশি ছিল। তাদের পেছনে ব্যয় হয়েছে ৩৭ দশমিক ৪৩ মিলিয়ন টাকা, যা আগের অর্থবছরের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি।

একই সাথে কর্মরত মালিকদের পারিশ্রমিক ১৭ দশমিক ৬১ মিলিয়ন টাকা থেকে বেড়ে ২০ দশমিক ৪৭ মিলিয়ন টাকায় উন্নীত হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, এটি খাতটির লাভজনকতা ও আর্থিক সক্ষমতা বৃদ্ধির প্রতিফলন।

সমীক্ষায় ওঠে এসেছে যে, দেশের মুদ্রা বিনিময় খাত মূলত মার্কিন ডলারনির্ভর। ২০২২-২৩ অর্থবছরে মোট ট্রেড মার্জিন ছিল ৯০ দশমিক ৩৭ মিলিয়ন টাকা, যার মধ্যে মার্কিন ডলার থেকেই এসেছে ৬৭ দশমিক ৫৯ মিলিয়ন টাকা বা মোট মার্জিনের ৭৪ শতাংশের বেশি।

২০২৩-২৪ অর্থবছরে মোট ট্রেড মার্জিন বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১০৮ দশমিক ৪৬ মিলিয়ন টাকায়। এর মধ্যে প্রায় ৭৯ দশমিক ৯৩ মিলিয়ন টাকা এসেছে মার্কিন ডলার লেনদেন থেকে।

ডলারের পাশাপাশি ইউরো, সৌদি রিয়াল ও ভারতীয় রুপিও গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছে। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ইউরো থেকে আয় হয়েছে ১০ দশমিক ২৬ মিলিয়ন টাকা, সৌদি রিয়াল থেকে ৬ দশমিক ৬৯ মিলিয়ন টাকা এবং ভারতীয় রুপি থেকে প্রায় ২ দশমিক ৯২ মিলিয়ন টাকা।

বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রবাসী আয়, আন্তর্জাতিক ভ্রমণ এবং আমদানি-রফতানি কার্যক্রমের কারণে ডলারের আধিপত্য আগামী দিনেও অব্যাহত থাকতে পারে।

মুদ্রা বিনিময় খাতের মোট আউটপুটও ধারাবাহিকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। ২০২২-২৩ অর্থবছরে মোট আউটপুট ছিল ১০৩ দশমিক ০১ মিলিয়ন টাকা, যা ২০২৩-২৪ অর্থবছরে বেড়ে দাঁড়ায় ১২২ মিলিয়ন টাকায়। এর মধ্যে প্রায় ৮৯ শতাংশ আয় এসেছে সরাসরি মুদ্রা বিনিময় কার্যক্রম থেকে। পাসপোর্টে বৈদেশিক মুদ্রা অনুমোদন (এন্ডোর্সমেন্ট) থেকেও উল্লেখযোগ্য আয় হয়েছে, যা ২০২৩-২৪ অর্থবছরে দাঁড়ায় প্রায় ১৩ দশমিক ৪৭ মিলিয়ন টাকায়।

সমীক্ষায় দেখা গেছে, মুদ্রা বিনিময় প্রতিষ্ঠানের পরিচালন ব্যয়ের সবচেয়ে বড় খাত হলো অফিস ভাড়া। ২০২২-২৩ অর্থবছরে মোট মধ্যবর্তী ভোগ ব্যয়ের প্রায় ৭০ শতাংশ অর্থাৎ ১৫ দশমিক ১০ মিলিয়ন টাকা ব্যয় হয়েছে অফিস ভাড়ায়।

পরবর্তী অর্থবছরেও এই প্রবণতা অব্যাহত ছিল। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে অফিস ভাড়া বাবদ ব্যয় হয়েছে প্রায় ১৫ দশমিক ০৬ মিলিয়ন টাকা। এ ছাড়া ইউটিলিটি বিল, ইন্টারনেট, টেলিফোন এবং স্টেশনারি খরচ ছিল অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ ব্যয় খাত।

মুদ্রা বিনিময় খাতের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অর্জন হলো মূল্য সংযোজনের ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য প্রবৃদ্ধি। ২০২২-২৩ অর্থবছরে মোট স্থূল মূল্য সংযোজন (জিভিএ) ছিল ৮১ দশমিক ৪৩ মিলিয়ন টাকা।

পরবর্তী অর্থবছরে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৯৯ দশমিক ৭৩ মিলিয়ন টাকায়, যা প্রায় ২২ দশমিক ৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধির ইঙ্গিত দেয়।

বিশ্লেষকদের মতে, এটি প্রমাণ করে যে, খাতটি শুধু আয় বাড়াচ্ছে না, বরং তুলনামূলক কম পরিচালন ব্যয়ে অধিক মূল্য সংযোজন করতেও সক্ষম হচ্ছে। তবে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রবণতা বিশ্লেষকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। ২০২২-২৩ অর্থবছরে মোট মূল্য সংযোজনের মধ্যে শ্রমের অংশ ছিল প্রায় ৬৭ দশমিক ৬২ শতাংশ, যা ২০২৩-২৪ অর্থবছরে কমে দাঁড়ায় ৬১ দশমিক ৫৮ শতাংশে।

অর্থনীতিবিদদের মতে, এর অর্থ হলো খাতটির উৎপাদনশীলতা বাড়লেও অতিরিক্ত মূল্য সংযোজনের একটি বড় অংশ শ্রমের পরিবর্তে মূলধন, প্রযুক্তি অথবা অন্যান্য উৎপাদন উপকরণে স্থানান্তরিত হচ্ছে। দীর্ঘমেয়াদে এটি মজুরি কাঠামো ও কর্মসংস্থানের মানের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশের বৈদেশিক বাণিজ্য, প্রবাসী আয় এবং আন্তর্জাতিক ভ্রমণ বৃদ্ধির সাথে সাথে মুদ্রা বিনিময় খাতের গুরুত্ব আরো বাড়বে। তবে খাতটিকে আরো প্রাতিষ্ঠানিক, প্রযুক্তিনির্ভর এবং স্বচ্ছ করতে হলে ডিজিটাল লেনদেন, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা, নিয়ন্ত্রক তদারকি এবং দক্ষ মানবসম্পদ উন্নয়নের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে।

বর্তমান প্রবণতা অব্যাহত থাকলে দেশের মুদ্রা বিনিময় খাত আগামী কয়েক বছরে আর্থিক সেবা খাতের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ও উচ্চ মূল্য সংযোজনকারী উপখাতে পরিণত হতে পারে।