বাংলাদেশ থেকে অবৈধভাবে অর্থ পাচারের প্রবণতা নতুন নয়, তবে সাম্প্রতিক সময়ে রেমিট্যান্স ও বৈদেশিক বাণিজ্য কাঠামো ব্যবহার করে পাচারের ঘটনা উদ্বেগজনক হারে বেড়েছে। খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, ব্যাংকিং চ্যানেল ও আমদানি-রফতানি ব্যবস্থার ফাঁকফোকর কাজে লাগিয়ে সংগঠিত চক্রগুলো নিয়মিতভাবে বিপুল পরিমাণ অর্থ বিদেশে সরিয়ে নিচ্ছে, যা দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ও সামগ্রিক অর্থনীতির ওপর চাপ সৃষ্টি করছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের বিভিন্ন প্রতিবেদন ও আন্তর্জাতিক সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, প্রতি বছর বাংলাদেশ থেকে কয়েক বিলিয়ন ডলার বিভিন্ন পদ্ধতিতে পাচার হচ্ছে। গ্লোবাল ফিন্যান্সিয়াল ইনটেলিজেন্সের একাধিক গবেষণায় দেখা গেছে, বাণিজ্যভিত্তিক (মানি লন্ডারিং ট্রেড বেস মানি লন্ডারিং) দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশে অন্যতম প্রধান চ্যালেঞ্জ।
তথ্যে দেখা যায়, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে রেমিট্যান্স প্রবাহ ও বৈদেশিক বাণিজ্য কার্যক্রমে উল্লেখযোগ্য প্রবৃদ্ধি দেখা গেলেও একই সাথে এই দু’টি খাতকে ব্যবহার করে অর্থ পাচারের প্রবণতা নতুন করে আলোচনায় এসেছে। অর্থনীতিবিদ ও সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ব্যাংকিং ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা, তদারকির ঘাটতি এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের জটিল কাঠামোর সুযোগ নিয়ে সংঘবদ্ধ চক্রগুলো নিয়মিতভাবে বিপুল পরিমাণ অর্থ বিদেশে সরিয়ে নিচ্ছে।
এ দিকে বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ হালনাগাদ তথ্যে দেখা যায়, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে দেশে মোট রেমিট্যান্স এসেছে প্রায় ২৪ দশমিক ৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার, যা আগের অর্থবছরের তুলনায় প্রায় ১৫ শতাংশ বেশি। একই সময়ে রফতানি আয় দাঁড়িয়েছে প্রায় ৫২ বিলিয়ন ডলার এবং আমদানি ব্যয় হয়েছে প্রায় ৬৫ বিলিয়ন ডলার। কিন্তু অর্থনীতিবিদদের মতে, এই বড় অঙ্কের বৈদেশিক লেনদেনের ভেতরেই লুকিয়ে রয়েছে পাচারের একটি বড় অংশ, যা সরাসরি পরিসংখ্যানে ধরা পড়ে না।
গ্লোবাল ফিন্যান্সিয়াল ইনটেলিজেন্সের পূর্ববর্তী গবেষণায় দেখা যায়, বাণিজ্যভিত্তিক মানি লন্ডারিং বা ট্রেড-বেইজড মানি লন্ডারিং (টিবিএমএল) উন্নয়নশীল দেশগুলোতে অর্থ পাচারের সবচেয়ে বড় মাধ্যমগুলোর একটি। তাদের মতে, আমদানিতে ওভার-ইনভয়েসিং এবং রফতানিতে আন্ডার-ইনভয়েসিংয়ের মাধ্যমে অর্থাৎ প্রকৃত লেনদেনের চেয়ে বেশি বা কম মূল্য দেখিয়ে বৈদেশিক মুদ্রা পাচার করা হচ্ছে।
বিশ্বব্যাংক ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন নয়া দিগন্তকে বলেন, রেমিট্যান্সের প্রবৃদ্ধি ইতিবাচক হলেও এর উৎস ও প্রবাহের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা জরুরি। হুন্ডি চ্যানেল বন্ধ না হলে এবং ডিজিটাল ট্র্যাকিং শক্তিশালী না হলে পাচার রোধ করা কঠিন হবে। তিনি বলেন, বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ২০২৫ সালের মাঝামাঝি সময়ে প্রায় ২০ বিলিয়ন ডলারের ঘরে ওঠানামা করছে, যা কয়েক বছর আগের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে কম। আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি, বৈদেশিক ঋণ পরিশোধ এবং অর্থ পাচারের মতো কারণগুলো একসাথে রিজার্ভের ওপর চাপ সৃষ্টি করছে বলে তিনি মনে করেন। তিনি বলেন, রফতানি-আমদানি যে বিশাল অঙ্কের লেনদেন হয়, সেখানে সামান্য শতাংশ অনিয়মও বড় অঙ্কের অর্থ পাচারের সুযোগ তৈরি করে। এই খাতে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা না গেলে অর্থনীতি দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
ব্যাংকিং খাতের সংশ্লিষ্টরা বলছেন, একই পণ্যের আন্তর্জাতিক বাজারমূল্যের সাথে ঘোষিত দামের বড় পার্থক্য থাকলেও অনেক ক্ষেত্রে তাৎক্ষণিকভাবে তা শনাক্ত করা সম্ভব হয় না। ফলে এই ব্যবধানের সুযোগ নিয়ে পাচারকারীরা বিদেশে অর্থ সরিয়ে নেয়। বিশেষ করে যেসব পণ্যের আন্তর্জাতিক বাজারমূল্য স্থিতিশীল নয় বা সহজে যাচাই করা যায় না, সেসব ক্ষেত্রে ঝুঁকি বেশি।
এ দিকে রেমিট্যান্স খাতেও একই ধরনের উদ্বেগ দেখা যাচ্ছে। যদিও সরকার প্রণোদনা দিয়ে বৈধ চ্যানেলে রেমিট্যান্স পাঠাতে উৎসাহ দিচ্ছে, তারপরও ‘হুন্ডি’ বা অবৈধ লেনদেন পুরোপুরি বন্ধ করা যায়নি। অনেক ক্ষেত্রে বিদেশে অর্জিত অবৈধ অর্থ বৈধ রেমিট্যান্স হিসেবে দেশে পাঠানো হচ্ছে, যা মানি লন্ডারিংয়ের একটি অংশ হিসেবে বিবেচিত।
ইন্টারন্যাশনাল মনিটরি ফান্ড (আইএমএফ) তাদের সাম্প্রতিক মূল্যায়নে বলেছে, অবৈধ অর্থপ্রবাহ নিয়ন্ত্রণে আনতে না পারলে উন্নয়নশীল দেশগুলোর মুদ্রানীতি ও আর্থিক স্থিতিশীলতা ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে। বাংলাদেশও এই ঝুঁকির বাইরে নয়।
পাচার প্রতিরোধে বাংলাদেশ ফিন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট ইতোমধ্যে সন্দেহজনক লেনদেন শনাক্তে নজরদারি জোরদার করেছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে সংস্থাটি কয়েক হাজার সন্দেহজনক লেনদেন রিপোর্ট (এসটিআর) বিশ্লেষণ করেছে এবং বেশ কিছু ক্ষেত্রে তদন্ত শুরু হয়েছে বলে জানা গেছে। সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা বলেন, ডাটা অ্যানালিটিক্স ও আন্তর্জাতিক তথ্য বিনিময়ের মাধ্যমে আমরা পাচারের নতুন নতুন কৌশল শনাক্ত করার চেষ্টা করছি।
ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (ডিসিসিআই) সভাপতি তাসকীন আহমেদ নয়া দিগন্তকে বলেন, কিছু অসাধু ব্যবসায়ীর কারণে পুরো বাণিজ্য খাত প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে। তিনি বলেন, টাকা পাচার রোধে কাস্টমস ও ব্যাংকিং খাতে সমন্বিত নজরদারি বাড়ানো জরুরি। আমদানি-রফতানির তথ্য আন্তর্জাতিক বাজারের সাথে মিলিয়ে দেখার জন্য আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারের ওপর তিনি জোর দেন। একই সাথে বিদেশে পাচার হওয়া অর্থ ফেরত আনতে দ্বিপক্ষীয় ও বহুপক্ষীয় সহযোগিতা বাড়ানোর বিষয়ে তিনি পরামর্শ দেন।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, রেমিট্যান্স ও বৈদেশিক বাণিজ্য বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রধান চালিকাশক্তি। তবে এই খাতগুলো যদি পাচারের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহৃত হয়, তাহলে তা দেশের দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়াবে বলে তারা মনে করছেন।



