নয়া দিগন্ত ডেস্ক
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে দুই দিন পাল্টাপাল্টি তীব্র হামলার পর যুদ্ধবিরতি ও কূটনৈতিক আলোচনা পুনরুজ্জীবিত করার প্রচেষ্টা শুরু হয়েছে। ওয়াশিংটন তেহরানের সাথে একটি স্থায়ী শান্তিচুক্তিতে পৌঁছানোর বিষয়ে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ এবং এ লক্ষ্যে কারিগরি আলোচনা অব্যাহত থাকবে বলে আলজাজিরাকে জানিয়েছে এক শীর্ষ মার্কিন কর্মকর্তা। গত ১৭ জুন স্বাক্ষরিত একটি সমঝোতা স্মারকের (এমওইউ) অধীনে ৬০ দিনের আলোচনা প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল। তবে চলতি সপ্তাহে মঙ্গলবার রাত থেকে বৃহস্পতিবার পর্যন্ত দুই দেশের মধ্যে তুমুল সঙ্ঘাতের জেরে তিন সপ্তাহের পুরনো সেই যুদ্ধবিরতি চুক্তি বড় ধরনের হুমকির মুখে পড়ে।
হরমুজ প্রণালীতে বাণিজ্যিক জাহাজগুলোর ওপর ইরানের ইসলামী রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) চড়াও হলে এই সঙ্ঘাত শুরু হয়। ওয়াশিংটনের দাবি, ইরানের বেঁধে দেয়া রুট অনুসরণ না করায় জাহাজগুলোতে হামলা চালায় তেহরান। এর জবাবে মঙ্গলবার রাতে এবং বুধবার সকালে ইরানের ৮৫টি লক্ষ্যবস্তুতে একযোগে বিমান হামলা চালায় মার্কিন বাহিনী।
প্রতিশোধ হিসেবে বুধবার উপসাগরীয় দেশগুলোতে থাকা মার্কিন সামরিক ঘাঁটি ও অবকাঠামো লক্ষ্য করে পাল্টা হামলা চালায় ইরান। এর পরিপ্রেক্ষিতে বুধবার রাতে এবং বৃহস্পতিবার ইরানের দক্ষিণ উপকূলীয় ও পূর্বাঞ্চলীয় প্রদেশগুলোর আরো ৯০টি লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালায় যুক্তরাষ্ট্র। তেহরানের দাবি, মার্কিন হামলায় বেসামরিক অবকাঠামোও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। গতকাল শুক্রবারও পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র থাকা বুশেহরসহ ইরানের দক্ষিণাঞ্চলীয় কোনারাক, চোগাদাক ও বন্দর আব্বাস শহরে একাধিক শক্তিশালী বিস্ফোরণের খবর দেয় ইরানি সংবাদমাধ্যম। তবে এই বিস্ফোরণের সাথে জড়িত থাকার কথা অস্বীকার করেছে যুক্তরাষ্ট্র। গতকাল সকাল থেকে দুই পক্ষই হামলা বন্ধ রাখায় মধ্যস্থতাকারী দেশগুলো কূটনীতি সচল করার সুযোগ পেয়েছে। কোনো পক্ষই সমঝোতা চুক্তি বাতিল না করলেও একে অপরের বিরুদ্ধে শর্ত লঙ্ঘনের অভিযোগ এনেছে।
এ দিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে নতুন সঙ্ঘাতের ফলে বৈশ্বিক জ্বালানি সঙ্কট আরো দীর্ঘায়িত হতে পারে বলে সতর্ক করেছে আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থা (আইইএ)। বৈশ্বিক তেলের বাজারে দ্রুত যে স্থিতিশীলতার আশা করা হচ্ছিল, এই বৈরিতার কারণে তা নস্যাৎ হয়ে যেতে পারে বলে জানিয়েছে সংস্থাটি। আইইএ তাদের মাসিক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যে অব্যাহত সঙ্ঘাতের কারণে তেল উৎপাদন ও রফতানি ব্যাহত হওয়ায় ২০২০ সালের পর এই প্রথম বিশ্বব্যাপী তেলের চাহিদা হ্রাসের মুখে পড়েছে। গত মাসের সমঝোতা চুক্তির পর হরমুজ প্রণালী আবার উন্মুক্ত হওয়ায় জুনে বিশ্বব্যাপী দৈনিক তেল সরবরাহ ৪১ লাখ ব্যারেল বাড়লেও তা যুদ্ধপূর্ব পরিস্থিতির চেয়ে এখনো ৯৪ লাখ ব্যারেল কম। বিশ্বের মোট তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) এক-পঞ্চমাংশ পরিবাহিত হয় হরমুজ প্রণালী দিয়ে। সঙ্ঘাতের কারণে এই নৌপথ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় দৈনিক প্রায় এক কোটি ৪০ লাখ ব্যারেল অপরিশোধিত তেলের সরবরাহ বন্ধ হয়ে গেছে, যা বিশ্ব অর্থনীতিতে বড় ধরনের ধাক্কা।
সবুজ সঙ্কেতের অপেক্ষায় ইসরাইল
গত দুই দিনের উত্তেজনার পরিপ্রেক্ষিতে ইরানের ওপর সামরিক হামলা চালাতে ডোনাল্ড ট্রাম্পের অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে ইসরাইল। ইসরাইলের সরকারি সম্প্রচার মাধ্যম ‘কান ১১’ জানিয়েছে, সঙ্ঘাতটি কেবল যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রয়েছে, এতে ইসরাইলের কোনো সরাসরি সম্পৃক্ততা নেই। তবে নিউ ইয়র্ক পোস্টের এক প্রতিবেদনে ইসরাইলি সূত্রের বরাত দিয়ে বলা হয়েছে, ওয়াশিংটন চাইলে যুক্তরাষ্ট্রের এই সামরিক অভিযানে যোগ দিতে প্রস্তুত রয়েছে তেল আবিব। যদিও ইসরাইলি নেতাদের ধারণা, ওয়াশিংটন এই মুহূর্তে চাচ্ছে না যে ইসরাইল সরাসরি এই সঙ্ঘাতে জড়াক।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কাতার, পাকিস্তান ও তুরস্ক মধ্যস্থতার চেষ্টা চালাচ্ছে বলে জানা গেছে। এরই মধ্যে ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সাথে ফোনে আলোচনা করেছেন এবং বিভিন্ন ফ্রন্টে দুই দেশের সমন্বয় বজায় রাখার বিষয়ে একমত হয়েছেন।
অন্যদিকে হরমুজ প্রণালীর ওপর ইরানের সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠার চেষ্টা এবং পানিপথটি নিয়ন্ত্রণের ‘একতরফা সিদ্ধান্ত’ প্রত্যাহার করার আহ্বান জানিয়েছে জাতিসঙ্ঘের নৌ চলাচলবিষয়ক সংস্থা আইএমও (আন্তর্জাতিক মেরিটাইম অর্গানাইজেশন)। লন্ডনে অনুষ্ঠিত আইএমও-এর ৪০ সদস্যের গভর্নিং কাউন্সিলের বৈঠকে হরমুজ প্রণালীতে ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণের জন্য ইরানের একটি পৃথক কর্তৃপক্ষ গঠন করার সিদ্ধান্তের নিন্দা জানানো হয়েছে। সদস্য দেশগুলোকে ইরানের এই সার্বভৌমত্বের দাবি এবং আন্তর্জাতিক নৌ চলাচলে বাধা সৃষ্টির যেকোনো সিদ্ধান্তকে স্বীকৃতি না দেয়ার অনুরোধ করা হয়েছে।
বৈঠকে ইরানের প্রতিনিধি দল এই অভিযোগকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ও আইনগতভাবে ভিত্তিহীন বলে প্রত্যাখ্যান করেছে। আন্তর্জাতিক সমুদ্র আইনবিষয়ক চুক্তি ‘আনক্লজ’-এ ইরান স্বাক্ষর করেনি, তাই তারা এই নিয়ম মানতে বাধ্য নয়। সমুদ্রসীমার নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষার্থেই এই পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে এবং এর অর্থ হরমুজ প্রণালী পুরোপুরি বন্ধ করে দেয়া নয় বলেও জানিয়েছে ইরানের প্রতিনিধিরা।
খামেনি হত্যায় প্রতিশোধের হুমকি
ইরানের ইসলামী বিপ্লবী গার্ড কর্পসের (আইআরজিসি) শীর্ষ কমান্ডার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আহমাদ ওয়াহিদি দেশটির সাবেক সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিকে হত্যার কঠিন প্রতিশোধ নেয়ার অঙ্গীকার করেছেন। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের বিরুদ্ধে প্রতিশোধ নেয়ার ঘোষণায় তিনি বলেন, এই হত্যাকাণ্ড কখনো ‘ইতিহাসের স্মৃতিপট থেকে মুছে যাবে না’।
এক বিবৃতিতে জেনারেল ওয়াহিদি ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা এবং ‘শিশুহত্যাকারী মার্কিন সামরিক বাহিনীর বিরুদ্ধে উপযুক্ত জবাব দেয়ার আহ্বান জানান। বিবৃতিতে ওয়াহিদি বলেন, শহীদদের রক্তের প্রতিশোধ এবং এই অপরাধের পেছনের কুশীলবদের শাস্তি দেয়া একটি চূড়ান্ত ও বৈধ দাবি।
মার্কিন ও ইসরাইলি বিমান হামলায় আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি এবং তার পরিবারের চার সদস্য নিহত হওয়ার চার মাস পর গত বৃহস্পতিবার তার জন্মভূমি মাশহাদ নগরীতে তাকে দাফন করা হয়। খামেনিকে দাফনের পরপরই আইআরজিসি প্রধানের কাছ থেকে এই কঠোর প্রতিশোধের বার্তাটি এলো।



