নিজস্ব প্রতিবেদক
দেশে অবৈধ চাঁদাবাজি, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ও প্রশাসনিক জটিলতা মোকাবেলায় সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলার আহ্বান জানিয়েছেন ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (ডিসিসিআই) সভাপতি তাসকীন আহমেদ।
গতকাল শনিবার রাজধানীর মতিঝিলে ডিসিসিআই অডিটোরিয়ামে ‘ব্যবসা-বাণিজ্য সহজীকরণে নির্বাচন-পরবর্তী উন্নত আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি বজায় রাখার অত্যাবশ্যকীয়তা’ শীর্ষক মতবিনিময় সভায় তিনি বলেন, শুধু আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বা সংশ্লিষ্ট সরকারি দফতরের ওপর দায় চাপিয়ে দিয়ে এ সঙ্কটের স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়; বরং ব্যবসায়ী, ভোক্তা ও নাগরিক, সবার সম্মিলিত উদ্যোগ প্রয়োজন।
এ সময় বিভিন্ন খাতের ব্যবসায়ী নেতারা বলেন, যানজট, চাঁদাবাজি ও প্রশাসনিক জটিলতা ব্যবসার ব্যয় বাড়াচ্ছে এবং বাজার ব্যবস্থাপনায় অস্থিরতা সৃষ্টি করছে। পণ্য পরিবহনে চাঁদাবাজির কারণে ভোক্তাপর্যায়ে মূল্য বৃদ্ধি পাচ্ছে বলেও অভিযোগ তোলা হয়। স্বল্পসংখ্যক প্রতিষ্ঠানকে আমদানির অনুমতি দেয়ার ফলে অনেক ক্ষেত্রে সিন্ডিকেট তৈরি হয়ে বাজারে কৃত্রিম সঙ্কট সৃষ্টি হয় এমন মতও দেন কেউ কেউ।
স্বাগত বক্তব্যে তাসকীন আহমেদ বলেন, চাঁদাবাজি, যানজট ও আইনশৃঙ্খলার অবনতি কেবল ব্যবসায়ী বা বেসরকারি খাতের সমস্যা নয়, এগুলো সামগ্রিকভাবে রাষ্ট্র ও সমাজের প্রতিটি স্তরকে প্রভাবিত করছে। সরকারি কর্মকর্তা, এমনকি পুলিশ সদস্যদের পরিবারও এসব সমস্যার প্রভাব থেকে মুক্ত নয়। তিনি বলেন, পুলিশ বা কোনো একটি দফতর একা এই সঙ্কট মোকাবেলা করতে পারবে না। এখন সময় এসেছে সামাজিকভাবে চাঁদাবাজি ও অনিয়মের বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়ার এবং নিজেদের মধ্যেও দায়িত্ববোধ তৈরি করার।
তিনি আরো বলেন, নির্বাচনের মাধ্যমে একটি শক্তিশালী সরকার দায়িত্ব নেয়ায় ব্যবসায়ী সমাজ আশাবাদী। সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার পাশাপাশি নিরাপদ ও অনুমেয় ব্যবসা পরিবেশ নিশ্চিত করা জরুরি। বিগত কয়েক বছরে কঠোর মুদ্রানীতি, আইনশৃঙ্খলা সংক্রান্ত উদ্বেগ, প্রশাসনিক দীর্ঘসূত্রতা ও অনিয়মের কারণে বেসরকারি খাত প্রত্যাশিত অগ্রগতি অর্জন করতে পারেনি। অবৈধ চাঁদাবাজি ও দুর্নীতি ব্যবসার ব্যয় বাড়াচ্ছে এবং দেশীয়-বিদেশী বিনিয়োগ নিরুৎসাহিত করছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন। রমজান মাসে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা এবং মূল্য স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা জাতীয় অর্থনীতি ও ভোক্তাদের স্বার্থে গুরুত্বপূর্ণ বলেও মত দেন তিনি।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন বাংলাদেশ প্রতিযোগিতা কমিশনের চেয়ারপারসন এ এইচ এম আহসান। তিনি বলেন, সরকার ও বেসরকারি খাতের যৌথ উদ্যোগে চলতি রমজানে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজার তুলনামূলক স্থিতিশীল রয়েছে। বাজার ব্যবস্থাপনায় চাহিদা-সরবরাহের সঠিক সমন্বয় এবং তথ্য-উপাত্তের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা জরুরি। ব্যবসা সহায়ক পরিবেশ তৈরি হলে প্রাতিষ্ঠানিক ব্যয় কমে, যা পণ্যের দামে ইতিবাচক প্রভাব ফেলে বলেও তিনি উল্লেখ করেন। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি উন্নয়নে পুলিশকে সহযোগিতায় জনগণকে এগিয়ে আসার আহ্বান জানান তিনি।
বিশেষ অতিথির বক্তব্যে এফবিসিসিআইর প্রশাসক মো: আবদুর রহিম খান বলেন, ব্যবসা-বাণিজ্যের জন্য সুষ্ঠু বাজার ব্যবস্থাপনা ও উন্নত আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির বিকল্প নেই। দ্রুত সংস্কার কার্যক্রম বাস্তবায়ন করলে দৃশ্যমান পরিবর্তন আসবে এবং জনগণের মধ্যে আস্থা তৈরি হবে।
এ সময় বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব শিবির বিচিত্র বড়ুয়া বলেন, উন্নত আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি না থাকলে স্থানীয় ও বিদেশী বিনিয়োগ স্থবির হয়ে পড়ে। তিনি জানান, আইপিও নীতিমালা ২০২৫-২৮ প্রণয়নের কাজ চলছে, যা বিনিয়োগ সহজীকরণে সহায়ক হবে। জাতীয় ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধিদফতরের পরিচালক (যুগ্মসচিব) আব্দুল জলিল বলেন, অতিরিক্ত সার ও কীটনাশক ব্যবহারের কারণে দেশের আলুর গুণগত মান আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে উত্তীর্ণ হতে পারছে না। ফলে রফতানি সম্ভাবনা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে এবং এ বিষয়ে সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।
ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) উপপুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ হারুন অর রশীদ বলেন, নির্বাচন-পরবর্তী সময়ে রাজধানীতে প্রায় পাঁচ লাখ নতুন ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা যুক্ত হওয়ায় যানজট বেড়েছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ইতোমধ্যে উদ্যোগ নেয়া হয়েছে এবং ঈদের পর ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি। অটোরিকশা নিয়ন্ত্রণে যন্ত্রাংশ আমদানি নীতিমালা ও চার্জিং গ্যারেজগুলোকে নজরদারির আওতায় আনার প্রয়োজনীয়তার কথাও তিনি তুলে ধরেন। পাশাপাশি ফুটপাথ ও রাস্তা দখলমুক্ত রাখতে জনগণের সহযোগিতা কামনা করেন এবং চাঁদাবাজি নিয়ন্ত্রণে পুলিশের পক্ষ থেকে সর্বোচ্চ উদ্যোগ নেয়া হবে বলে আশ্বাস দেন।
এ সময় ব্যবসায়ীরা একমত হন যে, ব্যবসা-বাণিজ্য সহজীকরণ ও বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করতে আইন প্রয়োগকারী সংস্থা, নীতিনির্ধারক প্রতিষ্ঠান ও বেসরকারি খাতের সমন্বয় জোরদার করতে হবে। চাঁদাবাজি ও অনিয়ম রোধে সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি এবং নাগরিক অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা গেলে অর্থনীতিতে ইতিবাচক গতি ফিরবে বলে তারা আশাবাদ ব্যক্ত করেন।



