নূরুল মোস্তফা কাজী চট্টগ্রাম
দেশের জ্বালানি খাতে বেসরকারি খাতকে সম্পৃক্ত করার উদ্যোগ এখনো থামেনি। জ্বালানি তেল আমদানি, পরিশোধন ও বিপণন শুধুমাত্র একটি ব্যবসায়িক বিষয় নয়, এটি দেশের সামগ্রিক স্থিতিশীলতা ও জাতীয় নিরাপত্তার সাথে সংশ্লিষ্ট। এ ধরনের একটি স্পর্শকাতর খাতে বেসরকারি খাতকে সম্পৃক্ত করতে নীতিমালা প্রস্তুতের উদ্যোগকেই ভালো চোখে দেখছেন না জ্বালানি খাত বিশেষজ্ঞরা। যদিও নীতিমালার বিষয়ে এখনো বিপিসি মতামত দেয়নি বলে জানা গেছে। রাষ্ট্রায়ত্ত জ্বালানি তেল পরিশোধন সক্ষমতা ৩০ লাখ মেট্রিক টন বাড়ানোর উদ্যোগের একই সাথে বেসরকারি খাতকেও জ্বালানি খাতে সম্পৃক্ত করার উদ্যোগ কুইক রেন্টাল বিদ্যুৎ ও এলপিজি সিলিন্ডারের মতো গলার কাঁটা হতে পারে বলে সতর্ক করছেন জ্বালানি খাত সংশ্লিষ্টরা।
যেখানে জ্বালানি তেল আমদানিতে সরকারকে বিপুল পরিমাণ ভর্তুকি দিতে হয়, সেখানে ক্রুড আমদানি করে পরিশোধনে ভর্তুকি ছাপিয়ে ব্যারেলপ্রতি আরো ১০ ডলার লাভ হয়। ব্যয়বহুল পরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানি হ্রাস করতে সরকার ইস্টার্ন রিফাইনারি পরিশোধন ক্ষমতা আরো ৩০ লাখ টন বাড়াতে দ্বিতীয় ইউনিট বাস্তবায়নে আইডিবির সাথে ঋণ চুক্তি করছে। খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ইআরএলের দ্বিতীয় ইউনিট বাস্তবায়িত হলে তো দেশে আর জ্বালানি তেল আমদানির তেমন প্রয়োজন থাকবে না, তাহলে বেসরকারিভাবে আরো ৪০ লাখ টন ক্ষমতার দু’টি রিফাইনারি হলে রাষ্ট্রায়ত্ত জ্বালানি তেল সরবরাহ চেইন মুখ থুবড়ে পড়ারও আশঙ্কা রয়েছে। একই সাথে নি¤œমানের জ্বালানি তেলের বিস্তৃতিরও আশঙ্কা রয়েছে বলে সূত্র জানায়।
খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন- একদিকে ক্রুড পরিবহন সহজ করতে সাড়ে আট হাজার কোটি টাকার এসপিএম (সিঙ্গেল পয়েন্ট মুরিং) প্রকল্প এবং জ্বালানি তেল পরিবহনে প্রায় চার হাজার কোটি টাকার ঢাকা-চট্টগ্রাম পাইপলাইন প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হয়েছে। অন্যদিকে বিশাল বিনিয়োগের এসব অবকাঠামো নির্মাণের পর এখন জ্বালানি তেল আমদানি ও বিপণনে বেসরকারি খাতকে সম্পৃক্ত করতে নীতিমালা প্রণয়নের উদ্যোগ পরস্পর সাংঘর্ষিক বলছেন খাতসংশ্লিষ্টরা। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আমাদের দেশে নীতিমালা হলেও সেগুলো অনেকটা কাগজেই সীমাবদ্ধ হয়ে যায়, বেসরকারি সিন্ডিকেটের প্রভাবে চাপা পড়ে যায়। বেসরকারি খাতে পরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানি, সংরক্ষণ ও বিপণনের জন্য নতুন খসড়া নীতিমালার উদ্যোগ মূলত দেশের করপোরেট সিন্ডিকেটের স্বার্থরক্ষা করতেই বলে মনে করছেন খাত সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, এর মধ্য দিয়ে কুইক রেন্টাল বিদ্যুৎ কেন্দ্র, এলএনজি সিন্ডিকেট এবং এলপি গ্যাসের সিলিন্ডার ও বিটুমিন ব্যবসার ন্যায় হাতেগোনা কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের হাতে গোটা দেশ ও দেশের মানুষকে জিম্মি করার আয়োজন চলছে।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের মতে, আমাদের দেশের সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো এখনো বেসরকারি প্রভাবশালীদের নিয়ন্ত্রণ করার মতো প্রশাসনিক ও নৈতিক কোনো ধরনের সক্ষমতাই অর্জন করতে পারেনি। ফলে আমাদের জ্বালানি খাতে বেসরকারি অংশীদারত্বের লেশমাত্রও থাকা উচিত নয়। অতীত অভিজ্ঞতার কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, রাষ্ট্রায়ত্ত এলপি গ্যাস কোম্পানির পাশাপাশি বেসরকারি খাতে সিলিন্ডার গ্যাস আমদানি ও বিপণনব্যবস্থা চালু হওয়ার পর আর ঘুরে দাঁড়াতে পারেনি রাষ্ট্র্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানটি। অভিযোগ রয়েছে, বেসরকারি এলপি গ্যাস ব্যবসায়ীদের নিজেদের স্বার্থেই রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানটিকে আর সক্ষমতা বাড়ানোর সুযোগ দেয়া হয়নি নানা কৌশলে। অথচ রাষ্ট্রায়ত্ত এলপি গ্যাস সিলিন্ডারের দামের সাথে বেসরকারি কোম্পানির সিলিন্ডারের দামের পার্থক্য প্রায় দ্বিগুণ। এর বাইরে বেসরকারি সিলিন্ডারে ওজন অনুযায়ী গ্যাসের পরিমাণ থাকা নিয়ে প্রশ্নতো আছেই।
খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ফিনিশড জ্বালানি তেল এলপি গ্যাস ও বিটুমিনের তুলনায় খুবই সেনসেটিভ আইটেম। জ্বালানি তেলের সাথে দেশের উৎপাদন, অর্থনীতি, বাজার নিয়ন্ত্রণ সব কিছুই জড়িত। উন্নয়নশীল দেশগুলো এই খাতে বেসকারি খাতকে কোনোভাবেই সম্পৃক্ত করে না। তাদের মতে, এই খাতে বেসরকারি খাতকে ন্যূনতম সম্পৃক্ততাও যদি দেয়া হয়, তাহলে পুরো সেক্টরে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হবে। জ্বালানি তেলের গুণগত মান নিশ্চিত করা যাবে না, ক্রাইসিসের সময় দাম বাড়লে তারা হাত গুটিয়ে বসে থেকে দেশকে অস্থিতিশীলতার দিকে ঠেলে দেবে। খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সরকার যদি এই ধরনের বিধ্বংসী উদ্যোগে সায় দেয়, তাহলে দেশটাকে শেষ করার জন্য এটা করতে পারে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এই খাতে বেসরকারি কাউকে সম্পৃক্ত করলে সরকার কোনোভাবেই নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে না, বিপিসির সার্ভেয়ারকে তাদের জাহাজের কিনারেও পৌঁছাতে দেবে না। সরকারকে জ্বালানি নিরাপত্তায় বেসরকারি খাতকে সম্পৃক্ত করার ঝুঁকিপূর্ণ পথে না হেঁটে দ্বিতীয় রিফাইনারি দ্রুত বাস্তবায়নে মনোযোগী হওয়ার পরামর্শ দেন খাত সংশ্লিষ্টরা।
খাত সংশ্লিষ্টরা প্রশ্ন তুলছেন, বর্তমানে এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) কি এলপিজির বাজার নিয়ন্ত্রণ করতে পারছে? গত এক বছর ধরে বিইআরসি যে দর নির্ধারণ করে দেয় ভোক্তাদের এর চেয়ে দুই থেকে তিন শ’ টাকা বেশিতে এলপিজি সিলিন্ডার কিনতে হচ্ছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, অনুমতি দিলেও বেসরকারি প্রতিষ্ঠান মানসম্মত জ্বালানি তেল আমদানি করবে না, কিংবা করতে পারবে না। বিভিন্ন সময় বেসরকারিতে তেলের জাহাজ বহির্নোঙরে আসবে, নানান প্রভাব ও চাপ তৈরি করে বিপিসির সার্ভেয়ারকে কাছেও ভিড়তে দেবে না এবং মানহীন তেলকে বিপিসির স্পেকের তেল হিসেবে কাগজে উল্লেখ করিয়ে এসব তেল বাজারে ছেড়ে দেবে। তা ছাড়া ক্রাইসিসের সময় যখন আমদানি ব্যয় বাড়বে তখন তারা হাত গুটিয়ে বসে থাকবে। আমরা যদি ভুল করি সেটার খেসারত দিতে হবে পুরো জাতিকে।
সঙ্কটের শুরু যেভাবে
গত ২৪ মে জ্বালানি, বিদ্যুৎ ও খনিজসম্পদ মন্ত্রীকে বসুন্ধরা গ্রুপের প্রতিষ্ঠান বিওজিসিএল একটি চিঠি দেয়। প্রতিষ্ঠানটি পরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানি করে বিক্রি ও বিপণনের অনুমতি চায় ওই চিঠিতে। এর মধ্যে বছরে ১৫ থেকে ২০ লাখ মেট্রিক টন ডিজেল, দুই লাখ টন অকটেন, দেড় লাখ টন পেট্রল এবং ৮ থেকে ১০ লাখ টন ফার্নেস অয়েল নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় আমদানি, বিক্রি ও বিপণনের অনুমতি চাওয়া হয়। ওই আবেদনটি গত ২ জুলাই জ্বালানি ও খনিজসম্পদ বিভাগ বিপিসিতে পাঠায় এবং আবেদনটি পর্যালোচনার জন্য গত ১৪ জুলাই বিপিসি ১১ সদস্যের একটি কমিটি গঠন করে। কমিটিকে মাত্র দুই কার্যদিবসের মধ্যে মতামত দিতে বলা হয়। বিপিসির কমিটি ওই প্রস্তাবের বিপক্ষে মত দেয়। এরই মধ্যে গত ২৬ জুলাই রাতে হঠাৎ করে বিপিসির চেয়ারম্যান রেজানুর রহমানকে সরিয়ে দেয়া হয়। এরপরই গুঞ্জন উঠে আবেদনটির বিপক্ষে অবস্থান নেয়ায় বিপিসি চেয়ারম্যানকে সরিয়ে দেয়া হয়।
এর মধ্যে গত ২ আগস্ট জ্বালানি ও খনিজসম্পদ বিভাগের অতিরিক্ত সচিব মো: জিয়াউল হককে বিপিসির চেয়ারম্যানের অতিরিক্ত দায়িত্ব দেয়া হয়, পরে ৬ আগস্ট তাকে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সচিব করা হয়। ৬ আগস্ট জ্বালানি ও খনিজসম্পদ বিভাগ বেসরকারি পর্যায়ে পরিশোধিত জ্বালানি আমদানি, সংরক্ষণ, পরিবহন, বিতরণ ও বিপণনের জন্য চার দিনের মধ্যে খসড়া নীতিমালা তৈরির নির্দেশ দিয়ে বিপিসিকে নতুন করে চিঠি দেয়। ১২ আগস্ট জ্বালানি ও খনিজসম্পদ বিভাগের অতিরিক্ত সচিব মো: মনজুর আলম প্রধানকে নিজ দায়িত্বের অতিরিক্ত হিসেবে বিপিসি চেয়ারম্যানের দায়িত্ব দেয়া হয়।
গত ৬ আগস্ট পাঠানো চিঠিতে বলা হয়েছিল, ‘নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করার লক্ষ্যে বেসরকারি পর্যায়ে পরিশোধিত জ্বালানি আমদানিপূর্বক সংরক্ষণ, পরিবহন, বিতরণ ও বিপণনের জন্য একটি সুস্পষ্ট নীতিমালা প্রণয়ন করা প্রয়োজন।’ চিঠিতে ১০ আগস্টের মধ্যে খসড়া নীতিমালা বিভাগে পাঠাতে নির্দেশ দেয়া হয়েছে। অর্থাৎ, নীতিমালার খসড়া তৈরির জন্য বিপিসিকে সময় দেয়া হয় মাত্র চার দিন। অবশ্য বিপিসি সূত্র জানিয়েছে, তারা বিষয়টি নিয়ে কাজ করছেন, কিন্তু এখনো প্রতিবেদন জমা দেননি। অভিযোগ রয়েছে- বসুন্ধরা গ্রুপসহ আরো কয়েকটি বড় শিল্পগোষ্ঠীকে এই খাতে সম্পৃক্ত করতেই মূলত এই নীতিমালার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।
বিপিসির সাবেক সিনিয়র জেনারেল ম্যানেজার (কমার্শিয়াল) ও এলপি গ্যাস লিমিটেডের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক আবু হানিফ নয়া দিগন্তকে বলেন, জন্মলগ্ন থেকে বিপিসি নিরবচ্ছিন্নভাবে জ্বালানি তেল সরবরাহ দিয়ে আসছে, তাতে কখনো দাম নিয়ে তুঘলকি হয়নি। অতীতে অনেক সময় কৃত্রিম সঙ্কট হয়েছে, কিন্তু পেট্রলপাম্পগুলোতে ওই সময়ে বেশি দামে তেল বিক্রি করেছে এমন ঘটনা কখনো ঘটেনি। তিনি বলেন, সরকার যদি এই খাতে প্রাইভেট সেক্টরকে সম্পৃক্ত করার মতো বিধ্বংসী উদ্যোগে সায় দেয়, তাহলে দেশটাকে শেষ করার জন্য এটা করতে পারে।
ইস্টার্ন রিফাইনারি এমপ্লয়িজ ইউনিয়নের (সিবিএ) সাধারণ সম্পাদক মো: আবদুর রহমান বলেন, বিপিসি ও এর আওতাধীন সব প্রতিষ্ঠান লাভজনক হওয়া সত্ত্বেও বেসরকারিভাবে অপরিশোধিত ও পরিশোধিত জ্বালানি আমদানি, পরিশোধন, বিতরণ ও বিপণনের সিদ্ধান্ত মেনে নেয়া হবে না। তিনি আরো বলেন, একনেক অনুমোদিত এক্সপানশন অ্যান্ড মডার্নাইজেশন অব ইস্টার্ন রিফাইনারি প্রকল্পটি অতি দ্রুততম সময়ের মধ্যে বাস্তবায়নের উদ্যোগ গ্রহণ করা হলে দেশের বর্তমান জ্বালানি চাহিদা শতভাগ সরকারিভাবেই বিপিসি'র মাধ্যমে পূরণের সক্ষমতা বহুগুণে বৃদ্ধি পাবে এবং ভবিষ্যৎ জ্বালানি নিরাপত্তাও নিশ্চিত হবে। তিনি দেশের অতি গুরুত্বপূর্ণ এই সেক্টরে নতুন করে কোনো জটিলতা সৃষ্টি না করে দেশের জ্বালানি নিরাপত্তার স্বার্থে বিষয়গুলোর শান্তিপূর্ণ সমাধানের জন্য সরকার ও জ্বালানি বিভাগকে আহ্বান জানান। তিনি বলেন, পরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানিতে সরকারকে যে পরিমাণ ভর্তুকি দিতে হয়, রিফাইনারিতে ক্রুড এনে পরিশোধন করলে ভর্তুকি ছাপিয়ে ব্যারেলপ্রতি আরো ১০ ডলার লাভ থাকে। কাজেই দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা ও বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয়ের স্বার্থে এই সেক্টরে বেসরকারি খাতকে সম্পৃক্ত করার সুযোগ নেই। জনগণকে বিপদে ফেলার চেষ্টা করা হলে কঠিন আন্দোলন ও প্রতিরোধ গড়ে তোলা হবে বলেও তিনি মন্তব্য করেন।



