বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সর্বশেষ তথ্য বলছে, দেশে মূল্যস্ফীতির হার ধীরে ধীরে কমছে। সরকারি হিসেবে গত কয়েক মাসে সার্বিক মূল্যস্ফীতির পাশাপাশি খাদ্য মূল্যস্ফীতিও নিম্নমুুখী হয়েছে। তবে সেই ইতিবাচক প্রবণতার প্রতিফলন এখনো দেখা যাচ্ছে না বাজারে। রাজধানী থেকে জেলা-উপজেলা প্রায় সব খুচরা বাজারেই চাল, ডাল, ভোজ্যতেল, সবজি, মাছ, মাংস ও ডিমের দাম এখনো উচ্চ পর্যায়েই রয়েছে।
অর্থনীতিবিদ ও বাজারসংশ্লিষ্টদের মতে, মূল্যস্ফীতি কমার অর্থ পণ্যের দাম কমে যাওয়া নয়; বরং দাম বৃদ্ধির গতি কিছুটা শ্লথ হওয়া। পাশাপাশি কৃষক থেকে ভোক্তার কাছে পণ্য পৌঁছাতে দীর্ঘ সরবরাহ শৃঙ্খল, একাধিক মধ্যস্বত্বভোগীর মুনাফা, পরিবহন ব্যয়, চাঁদাবাজি, বাজারে সীমিত প্রতিযোগিতা এবং দুর্বল তদারকির কারণে সরকারি নানা উদ্যোগ ও শুল্ক ছাড়ের সুফলও ভোক্তার কাছে পৌঁছাচ্ছে না।
বিবিএসের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জুনে সার্বিক মূল্যস্ফীতি কমে দাঁড়িয়েছে ৯ দশমিক ১৬ শতাংশ, যা মে মাসে ছিল ৯ দশমিক ৪২ শতাংশ। একই সময়ে খাদ্য মূল্যস্ফীতি ৯ দশমিক ৬ শতাংশ থেকে কমে ৮ দশমিক ৬ শতাংশে নেমে এসেছে। যদিও পরিসংখ্যান ইতিবাচক ইঙ্গিত দিচ্ছে, বাস্তব বাজারচিত্রে তার প্রতিফলন সীমিত। রাজধানীর কাওরান বাজার, মোহাম্মদপুর কৃষি মার্কেট, মালিবাগ, রামপুরা, মিরপুর ও যাত্রাবাড়ীসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের খুচরা বাজারে দেখা যায়, অধিকাংশ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম এখনো সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার তুলনায় বেশি। বিশেষ করে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারগুলোর জন্য নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যপণ্য কেনা ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে।
কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সভাপতি এ এইচ এম সফিকুজ্জামান বলেন, দেশের অন্যতম বড় সমস্যা হলো সরবরাহ ব্যবস্থার অদক্ষতা। কৃষক যে দামে পণ্য বিক্রি করেন এবং ভোক্তা যে দামে তা কিনেন এই দুইয়ের মধ্যে ব্যবধান অস্বাভাবিকভাবে বেশি। তিনি বলেন, ডিজিটাল কৃষি বিপণন ব্যবস্থা, আধুনিক কোল্ড চেইন এবং প্রতিযোগিতামূলক বাজার গড়ে তুলতে পারলে এই ব্যবধান উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব।
তার মতে, বাজার তদারকি ও মোবাইল কোর্টের অভিযান তাৎক্ষণিক প্রভাব ফেললেও দীর্ঘমেয়াদে কার্যকর ফল দিচ্ছে না। কেবল খুচরা ব্যবসায়ীদের জরিমানা করলেই বাজার নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়; উৎপাদন থেকে পাইকারি এবং খুচরা পর্যন্ত পুরো সরবরাহ ব্যবস্থাকে কার্যকর নজরদারির আওতায় আনতে হবে।
জাতীয় ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধিদফতর নিয়মিত বাজার তদারকি, মোবাইল কোর্ট পরিচালনা এবং অতিরিক্ত দামে পণ্য বিক্রির অভিযোগে জরিমানা করছে। চলতি বছরও দেশের বিভিন্ন স্থানে শত শত অভিযান পরিচালিত হয়েছে। তবে বাজার বিশ্লেষকদের মতে, এসব অভিযান মূলত খুচরা পর্যায়ে সীমাবদ্ধ থাকায় পাইকারি মোকাম, আমদানিকারক ও বড় গুদাম পর্যায়ের অনিয়ম অনেকটাই অরক্ষিত থেকে যাচ্ছে।
বিবিএসের তথ্য অনুযায়ী, জুন মাসে গ্রামীণ এলাকায় মূল্যস্ফীতি ছিল ৯ দশমিক ২৩ শতাংশ এবং শহরাঞ্চলে ৯ দশমিক ১ শতাংশ। অর্থাৎ দেশের কোথাও মূল্যস্ফীতি এখনো স্বস্তিদায়ক পর্যায়ে নামেনি। ফলে সরকারি পরিসংখ্যানের উন্নতি সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাত্রায় খুব বেশি প্রভাব ফেলছে না।
বিশেষজ্ঞদের মতে, কৃষিপণ্যের দীর্ঘ সরবরাহ শৃঙ্খল মূল্যবৃদ্ধির অন্যতম কারণ। কৃষকের কাছ থেকে পণ্য সংগ্রহের পর তা স্থানীয় ফড়িয়া, আড়ত, জেলা মোকাম, বড় পাইকারি বাজার, উপ-পাইকার হয়ে খুচরা বিক্রেতার মাধ্যমে ভোক্তার কাছে পৌঁছায়। প্রতিটি ধাপে যুক্ত হয় কমিশন, পরিবহন ব্যয়, শ্রমিক খরচ, বাজার ফি, পণ্য নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি এবং ব্যবসায়ীর লাভ। অনেক ক্ষেত্রে এর সঙ্গে যোগ হয় অনানুষ্ঠানিক চাঁদাবাজির ব্যয়ও। শেষ পর্যন্ত এসব অতিরিক্ত ব্যয়ের পুরো চাপ বহন করতে হয় ভোক্তাকেই।
কৃষি বিপণন অধিদফতরের কর্মকর্তারা বলছেন, কৃষক ও ভোক্তার মধ্যে যত বেশি মধ্যস্বত্বভোগী থাকবে, মূল্য ব্যবধানও তত বাড়বে। কৃষিপণ্যের ডিজিটাল বিপণন এবং কৃষক থেকে সরাসরি খুচরা বিক্রেতার কাছে পণ্য সরবরাহের ব্যবস্থা সম্প্রসারণ করা গেলে বাজারে ইতিবাচক পরিবর্তন আসতে পারে।
চলতি অর্থবছরের বাজেটে সরকার ভোজ্যতেল, ডাল, পেঁয়াজসহ কয়েকটি নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের ওপর শুল্ক ও কর কমিয়েছে। সরকারের আশা ছিল, আমদানি ব্যয় কমলে বাজারেও দাম কমবে। কিন্তু ব্যবসায়ীদের দাবি, আগে বেশি দামে আমদানি করা মজুত, ডলারের উচ্চ বিনিময় হার, ব্যাংক ঋণের সুদ এবং পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধির কারণে শুল্ক ছাড়ের পুরো সুবিধা ভোক্তার কাছে পৌঁছায়নি।
অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন বলেন, মূল্যস্ফীতির হার কমা অবশ্যই ইতিবাচক, তবে জনগণ তখনই এর সুফল অনুভব করবে, যখন বাজারে পণ্যের প্রকৃত দাম কমবে। তার মতে, অপ্রয়োজনীয় মধ্যস্বত্বভোগী কমিয়ে বাজারে প্রতিযোগিতা বাড়াতে হবে এবং সরবরাহ ব্যবস্থাকে আরো দক্ষ ও স্বচ্ছ করতে হবে।
কৃষি অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক গোলাম হাফিজ কেনেডি বলেন, শুধু বাজারে অভিযান চালিয়ে মূল্য নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়। প্রয়োজন কৃষিপণ্যের সরবরাহ ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা, প্রতিটি ধাপে ডিজিটাল নজরদারি, পাইকারি বাজারে অনিয়ম বন্ধ এবং চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা। একই সাথে কৃষক থেকে ভোক্তা পর্যন্ত প্রতিটি স্তরের ক্রয়-বিক্রয় মূল্য প্রকাশ বাধ্যতামূলক করা গেলে অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি অনেকাংশে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।
বিশ্লেষকদের মতে, কাগজে-কলমে মূল্যস্ফীতি কমলেও যদি সাধারণ মানুষ বাজারে তার সুফল অনুভব না করেন, তবে সেই পরিসংখ্যান বাস্তব অর্থে স্বস্তি এনে দিতে পারে না। তাই শুধু মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ নয়, কৃষক থেকে ভোক্তা পর্যন্ত পুরো সরবরাহ ব্যবস্থায় জবাবদিহি, স্বচ্ছতা, কার্যকর প্রতিযোগিতা এবং কঠোর বাজার তদারকি নিশ্চিত করাই এখন সময়ের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।



