আধুনিক পর্যটনের গতিশীল দৌড়ে পিছিয়ে পড়ছে দেশ

আবুল কালাম
Printed Edition

বিশ্বজুড়ে আধুনিক পর্যটনব্যবস্থার প্রতিযোগিতায় ক্রমেই পিছিয়ে পড়ছে দেশের সম্ভাবনাময় পর্যটন শিল্প। তাল মেলাতে পারছে না আন্তর্জাতিক মানদণ্ড, আধুনিক বিপণন কৌশল এবং পর্যটকদের চাহিদার দ্রুত পরিবর্তনের সাথে। ফলে বৈশ্বিক পর্যটনের গতিশীল দৌড়ে বারবার ছিটকে পড়ছে বাংলাদেশ।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, অনেক সম্ভাবনার পরও স্মার্ট ও ডিজিটাল সেবার অভাব, ভিসা সহজীকরণে ব্যর্থতা, ইকো-ট্যুরিজমের নামে পরিবেশ ধ্বংস, দক্ষ জনবলের ঘাটতি, বিনোদন ও বৈচিত্র্যের অভাব, রাজনৈতিক অনগ্রসরতা, নিরাপত্তাহীনতা, নারী পর্যটকদের ঝুঁকি, আন্তর্জাতিক প্রচারণার অভাব, ভঙ্গুর নীতি ও অবকাঠামোসহ বিভিন্ন কারণে এখনো সনাতনী ব্যবস্থার বৃত্তে বন্দী পর্যটন খাত। এতে যুগোপযোগী পরিকল্পনা এবং প্রযুক্তির অভাব ও সময়ের সাথে সঙ্গতি রেখে পর্যটন অবকাঠামো গড়ে না তোলায় বিশ্বে তাল মেলাতে ব্যর্থ হচ্ছে। এ জন্য বিদেশী পর্যটক কমে যাওয়ার সাথে কাক্সিক্ষত রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হচ্ছে দেশ।

দেশে বিদেশী পর্যটক আনাগোনা ও কমা-বাড়ার সঠিক কোনো পরিসংখ্যান বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশন ও বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর কাছে নেই। তবে গত এক যুগের বিভিন্ন উপাত্ত বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধি ও আঞ্চলিক প্রতিযোগিতার হারের থেকে বাংলাদেশের পর্যটনের প্রবৃদ্ধির হার অনেক পিছিয়ে রয়েছে। দেশের বিভিন্ন পর্যটন স্পটে প্রতি বছর ভ্রমণ করেন প্রায় তিন কোটি পর্যটক। এর মধ্যে বিদেশী পর্যটক চার থেকে পাঁচ শতাংশ।

বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশনের তথ্য বলছে, দেশের জিডিপিতে পর্যটনের অবদান মাত্র ৩ শতাংশের কিছু বেশি। এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) তথ্যানুযায়ী, বছরে বিদেশী পর্যটকদের থেকে আয় কমেছে এক কোটি ৩০ লাখ ডলার বা ১৫৯ কোটি টাকা। এর আগে ২০২৩ সালে বিদেশী পর্যটকদের কাছ থেকে বাংলাদেশ আয় করেছিল ৪৫ কোটি ৩০ লাখ ডলার, যা ২০২৪ সালে কমে দাঁড়ায় ৪৪ কোটি ডলারে।

বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ড বলছে, প্রতি বছর বিদেশী পর্যটকের সংখ্যা আশানুরূপ হারে বাড়ছে না। তাদের হিসাব অনুযায়ী, ২০২৪ সালে বাংলাদেশে বিদেশী পর্যটক এসেছেন ছয় লাখ ৬০ হাজার। আগের বছর এ সংখ্যা ছিল ছয় লাখ ৫৫ হাজার। ২০২২ সালে ছিল পাঁচ লাখ ২৯ হাজার। ২০২১ সালে এক লাখ ৩৫ হাজার ১৮৬, ২০২০ সালে এক লাখ ৮১ হাজার ৫১৮ জন।

বৈশ্বিক মানদণ্ডে এ সংখ্যাটি অত্যন্ত কম, যা প্রতিবেশী দেশ ভারত, শ্রীলঙ্কা বা মালদ্বীপের থেকে বেশ পেছনে। মূলত প্রচারণার অভাব, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা, ভিসা প্রক্রিয়া ও পর্যাপ্ত বিনোদনের অভাবের কারণে বাংলাদেশ এই খাতে পিছিয়ে আছে। ফলে বৈশ্বিক পর্যটনের গতিশীল দৌড়ে ছিটকে পড়ছে বাংলাদেশ। এ বিষয়ে ট্যুর অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (টোয়াব) সাবেক সভাপতি শিবলুল আজম কোরেশী নয়া দিগন্তকে বলছেন, বিনোদন ও বৈচিত্র্যের অভাব, রাজনৈতিক অনগ্রসরতা, নিরাপত্তাহীনতা, নারী পর্যটকদের ঝুঁকি, আন্তর্জাতিক প্রচারণার অভাব, ভঙ্গুর নীতি, স্মার্ট ও ডিজিটাল সেবার অভাব, ভিসা সহজীকরণে ব্যর্থতা, ইকো-ট্যুরিজমের নামে পরিবেশ ধ্বংস, দক্ষ জনবলের ঘাটতি ও অবকাঠামো এসব কারণে বিদেশী পর্যটক নিয়ে সঙ্কট সৃষ্টি হয়েছে। যদিও আগের চেয়ে এখন কিছুটা উন্নতির দিকে। তবে সরকার এ বিষয়ে যথাযথ উদ্যোগ না নিলে এর আশানুরূপ উন্নতি সম্ভব নয়।

অন্য দিকে বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশনের মহাব্যবস্থাপক মো: জিয়াউল হক হাওলাদারের ভাষ্য, পর্যটনের উন্নয়নে সরকার সব সময়ই আন্তরিক। এ জন্য আন্তর্জাতিক বাজারের প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে যুগোপযোগী নীতিমালা গ্রহণ, দক্ষ জনবল তৈরি এবং সমন্বিত ডিজিটাল প্রচারণার ওপর জোর দেয়া হচ্ছে। তবে সঙ্কট ও উত্তরণে বৈশ্বিক পর্যটন বাজারের পরিবর্তনের সাথে সাথে আমাদের দেশের অবকাঠামো এবং প্রচারণার ধরনেও পরিবর্তন আনা জরুরি।