রফতানিতে স্থবিরতা বিদেশী সহায়তায় ভাটা

Printed Edition

অর্থনৈতিক প্রতিবেদক

বাংলাদেশের বৈদেশিক খাত এখন দ্বিমুখী চাপে। এক দিকে রফতানি আয় কাক্সিক্ষত গতি হারিয়েছে, অন্য দিকে বৈদেশিক ঋণের কিস্তি ও সুদ পরিশোধ দ্রুত বাড়ছে। এর সাথে বিদেশী সহায়তা ছাড় কমে যাওয়ায় দেশের বৈদেশিক মুদ্রার প্রবাহে নতুন চাপ তৈরি হয়েছে। অর্থনীতিবিদদের আশঙ্কা, রফতানির প্রবৃদ্ধি দ্রুত ঘুরে না দাঁড়ালে এবং উন্নয়ন প্রকল্পে বিদেশী ঋণের ব্যবহার না বাড়লে সামনের মাসগুলোতে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ, বিনিময় হার ও চলতি হিসাবের ভারসাম্যের ওপর চাপ আরো বাড়তে পারে।

রফতানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম মাস জুলাইয়ে বাংলাদেশের পণ্য রফতানি হয়েছে ৪৭২ কোটি ডলার। আগের বছরের একই মাসের তুলনায় এটি ১ শতাংশ কম। তবে জুন মাসের তুলনায় রফতানি বেড়েছে ১২ দশমিক ৪৯ শতাংশ, যা মৌসুমি চাহিদা বৃদ্ধির ইতিবাচক ইঙ্গিত দিচ্ছে।

রফতানি আয়ের প্রায় ৮২ শতাংশ আসে তৈরী পোশাক (আরএমজি) খাত থেকে। জুলাইয়ে এই খাতের রফতানি হয়েছে ৩৮৮ কোটি ডলার। জুনের তুলনায় ১৪ দশমিক ৭৩ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হলেও গত বছরের জুলাইয়ের তুলনায় রফতানি কমেছে ১ দশমিক ৯২ শতাংশ। আন্তর্জাতিক বাজারে পোশাকের চাহিদা পুরোপুরি স্বাভাবিক না হওয়া এবং বড় ক্রেতাদের মজুদ পুনর্বিন্যাসকে এর অন্যতম কারণ হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।

রফতানি বাজারে যুক্তরাষ্ট্র এখনো বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় ক্রেতা। জুলাইয়ে দেশটিতে রফতানি হয়েছে ৯১৮ দশমিক ৭৪ মিলিয়ন ডলার, যা আগের বছরের তুলনায় সামান্য ০ দশমিক ২৫ শতাংশ বেশি। দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে জার্মানি (৪৯৫ দশমিক ৩০ মিলিয়ন ডলার) এবং তৃতীয় অবস্থানে যুক্তরাজ্য (৪৭৮ দশমিক ৪২ মিলিয়ন ডলার)। উল্লেখযোগ্যভাবে ভারত ও সৌদি আরবে বাংলাদেশের রফতানি যথাক্রমে ১৫ দশমিক ৩০ এবং ১০ দশমিক ৬৪ শতাংশ বেড়েছে।

তবে রফতানির এই আংশিক ইতিবাচক চিত্রের বিপরীতে বৈদেশিক অর্থপ্রবাহে বড় ধাক্কার তথ্য দিয়েছে অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ (ইআরডি)। সংস্থার প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশে বিদেশী সহায়তা ছাড় হয়েছে ৮ দশমিক ০৭ বিলিয়ন ডলার, যা আগের অর্থবছরের তুলনায় ৫ দশমিক ৮ শতাংশ কম।

একই সময়ে বৈদেশিক ঋণের কিস্তি ও সুদ পরিশোধ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪ দশমিক ৪৯ বিলিয়ন ডলারে। এক বছরে এ ব্যয় বেড়েছে ১০ শতাংশ। ফলে নিট বৈদেশিক অর্থপ্রবাহ কমে দাঁড়িয়েছে মাত্র ৩ দশমিক ৫৮ বিলিয়ন ডলারে, যা আগের বছরের তুলনায় প্রায় ২০ শতাংশ কম।

ইআরডির তথ্য বলছে, জুন মাসে প্রায় ৩ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলার ছাড় হলেও এর বড় অংশই ছিল বাজেট সহায়তা। নিয়মিত উন্নয়ন প্রকল্পে ঋণ ছাড়ের গতি ছিল অনেক কম। ফলে প্রতিশ্রুত বৈদেশিক ঋণের বড় অংশ এখনো ব্যবহার করা যায়নি।

এ দিকে নতুন বিদেশী ঋণের প্রতিশ্রুতিও কমে এসেছে। অর্থবছরে বিদেশী সহায়তার নতুন প্রতিশ্রুতি নেমে এসেছে ৫ দশমিক ২৪ বিলিয়ন ডলারে, যা আগের বছরের ৮ দশমিক ৩২ বিলিয়ন ডলারের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে কম। এর ফলে ভবিষ্যতের উন্নয়ন অর্থায়ন নিয়েও প্রশ্ন তৈরি হচ্ছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের ধীরগতি বিদেশী ঋণ ছাড় কমে যাওয়ার অন্যতম কারণ। তার ভাষায়, গত কয়েক বছরে নেয়া বড় অবকাঠামো প্রকল্পগুলোর গ্রেস পিরিয়ড শেষ হওয়ায় এখন মূল অর্থের পাশাপাশি সুদও পরিশোধ করতে হচ্ছে। তাই আগামী বছরগুলোতেও বৈদেশিক ঋণ পরিশোধের চাপ বাড়বে।

তারা বলছেন, বিদেশী ঋণের প্রতিশ্রুতি থাকলেও প্রকল্প বাস্তবায়নের ধীরগতির কারণে অর্থ ছাড় হচ্ছে না। এতে এক দিকে উন্নয়ন ব্যাহত হচ্ছে, অন্য দিকে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার প্রবাহও কমে যাচ্ছে।

অর্থনীতিবিদদের মতে, বর্তমানে বাংলাদেশের বৈদেশিক খাত তিনটি সমান্তরাল চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। প্রথমত. রফতানি প্রবৃদ্ধি এখনো দুর্বল। দ্বিতীয়ত. বিদেশী সহায়তা ও উন্নয়ন ঋণের ছাড় কমছে। তৃতীয়ত. বৈদেশিক ঋণ পরিশোধের ব্যয় দ্রুত বাড়ছে। এই তিনটি প্রবণতা একই সাথে অব্যাহত থাকলে বৈদেশিক খাতের ভারসাম্য রক্ষা আরো কঠিন হয়ে উঠতে পারে।

তবে আশার দিকও রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রসহ প্রধান বাজারে বাংলাদেশের অবস্থান এখনো শক্তিশালী রয়েছে। ভারত, সৌদি আরবসহ কয়েকটি অপ্রচলিত বাজারে রফতানি বাড়ছে। আগামী শরৎ ও উৎসব মৌসুমে নতুন রফতানি আদেশ বাড়লে জুলাইয়ের সাময়িক স্থবিরতা কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হতে পারে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এখন সবচেয়ে জরুরি হচ্ছে উন্নয়ন প্রকল্পের বাস্তবায়ন গতি বাড়ানো, প্রতিশ্রুত বিদেশী ঋণ দ্রুত ব্যবহার নিশ্চিত করা, রফতানি পণ্যের বহুমুখীকরণ এবং নতুন বাজার সম্প্রসারণ। অন্যথায় বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ, ডলারের বিনিময় হার এবং সামষ্টিক অর্থনীতির ওপর চাপ আরো বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

তথ্যবক্স : এক নজরে বৈদেশিক খাত

জুলাই ২০২৬

মোট পণ্য রফতানি : ৪৭২ কোটি ডলার

বছরওয়ারি পরিবর্তন : -১%

জুনের তুলনায় : +১২.৪৯%

তৈরী পোশাক রফতানি : ৩৮৮ কোটি ডলার

যুক্তরাষ্ট্রে রফতানি : ৯১৮.৭৪ মিলিয়ন ডলার

২০২৫-২৬ অর্থবছর

বিদেশী সহায়তা ছাড় : ৮.০৭ বিলিয়ন ডলার

কমেছে : ৫.৮%

ঋণ পরিশোধ : ৪.৪৯ বিলিয়ন ডলার

বেড়েছে : ১০%

নিট বৈদেশিক অর্থপ্রবাহ : ৩.৫৮ বিলিয়ন ডলার

কমেছে : ২০%

নতুন বিদেশী সহায়তার প্রতিশ্রুতি : ৫.২৪ বিলিয়ন ডলার

জুলাইয়ের রফতানি তথ্যকে বিচ্ছিন্নভাবে ইতিবাচক বা নেতিবাচক কোনোভাবেই দেখা যাবে না। মাসভিত্তিক প্রবৃদ্ধি বলছে আন্তর্জাতিক বাজারে চাহিদা কিছুটা ফিরছে। কিন্তু একই সময়ে বার্ষিক প্রবৃদ্ধি ঋণাত্মক থাকায় বোঝা যায়, রফতানির গতি এখনো ভঙ্গুর।

এর চেয়েও বড় উদ্বেগের বিষয় হলো বৈদেশিক সহায়তার নি¤œমুখী প্রবণতা। বিদেশী ঋণ ও অনুদান শুধু উন্নয়ন ব্যয় নয়, বৈদেশিক মুদ্রার সরবরাহেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। যখন রফতানি ও সহায়তা- দুই উৎস থেকেই প্রত্যাশিত প্রবাহ আসছে না, আর বিপরীতে ঋণ পরিশোধ বাড়ছে, তখন রিজার্ভের ওপর চাপ সৃষ্টি হওয়া স্বাভাবিক।

অর্থনীতিবিদদের মতে, এই পরিস্থিতি মোকাবেলায় কেবল রফতানি বাড়ানোই যথেষ্ট নয়; উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে গতি আনা, প্রতিশ্রুত বিদেশী ঋণ দ্রুত ছাড় করানো এবং উচ্চ মূল্যসংযোজিত রফতানি পণ্যের অংশ বাড়ানো এখন অর্থনীতির জন্য অন্যতম বড় নীতিগত অগ্রাধিকার।