ইয়েমেনে হাউছিদের চতুর্মুখী আক্রমণে দিশেহারা সৌদি

Printed Edition
দক্ষিণ ইয়েমেনের একটি অজ্ঞাত স্থানে সৌদি সমর্থিত বাহিনীর বিরুদ্ধে হাউছি যোদ্ধাদের অগ্রযাত্রার সময় একটি গাড়িতে আগুন জ্বলতে দেখা যাচ্ছে। ইয়েমেনের হাউছি বিদ্রোহীদের প্রচারমাধ্যম আনসারুল্লাহ মিডিয়া অফিস কর্তৃক প্রকাশিত একটি ভিডিও থেকে ছবিটি নেয়া হয়েছে : ইন্টারনেট
দক্ষিণ ইয়েমেনের একটি অজ্ঞাত স্থানে সৌদি সমর্থিত বাহিনীর বিরুদ্ধে হাউছি যোদ্ধাদের অগ্রযাত্রার সময় একটি গাড়িতে আগুন জ্বলতে দেখা যাচ্ছে। ইয়েমেনের হাউছি বিদ্রোহীদের প্রচারমাধ্যম আনসারুল্লাহ মিডিয়া অফিস কর্তৃক প্রকাশিত একটি ভিডিও থেকে ছবিটি নেয়া হয়েছে : ইন্টারনেট

আলজাজিরা ও রয়টার্স

ইয়েমেনের লোহিত সাগর তীরবর্তী কৌশলগত মোখা বন্দর দখলের পর সশস্ত্র সংগঠন হাউছি ও সরকারি বাহিনীর মধ্যে ফঙ্ঘাত ব্যাপক রূপ ধারণ করেছে। দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের তাইজ এলাকার কাধায় দুই পক্ষ রক্তক্ষয়ী মুখোমুখি যুদ্ধে লিপ্ত হয়েছে। পাশাপাশি তেল-গ্যাস ও সামরিক রসদ সরবরাহের প্রধান কেন্দ্র মারিব শহর অভিমুখে হাউছি বাহিনী অগ্রসর হলে সরকারি বাহিনী সেখানে জোরালো প্রতিরোধ গড়ে তোলে। কৌশলগত কারণে মারিবের পতন ঘটলে উত্তরাঞ্চলে সরকারি বাহিনীর উপস্থিতি সম্পূর্ণ ধসে পড়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) প্রতিবেদন অনুযায়ী, সঙ্ঘাত বৃদ্ধির ফলে গত ৬ থেকে ১২ সেপ্টেম্বরের মধ্যে দেশটির বিভিন্ন প্রশাসনিক এলাকায় মোট দুই হাজার ৮৮৩ জন হতাহত হয়েছেন। এর মধ্যে ৫০৪ জনের লাশ উদ্ধার করা হয়েছে এবং দুই হাজার ৩৭৯ জন আহত হয়েছেন। সহিংসতার মুখে তাইজ, মারিব, আল-জাওফ, লাহজ, হুদাইদাহ, আবিয়ান ও শাবওয়া জুড়ে প্রায় ৭৭ হাজার ৭৮৯ জন বাস্তুচ্যুত হয়েছেন। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, কেবল মারিব এলাকাতেই মোট হতাহতের ৪৯ শতাংশ এবং তাইজ ও পশ্চিম উপকূলীয় অঞ্চলে ৪৩ শতাংশ ঘটনা ঘটেছে। গৃহহীনদের মধ্যে দুই হাজারের বেশি মানুষ লোহিত সাগর পাড়ি দিয়ে জিবুতিতে আশ্রয় নিয়েছেন। অন্যান্য ফ্রন্টে অগ্রযাত্রার অংশ হিসেবে হাউছি যোদ্ধারা বাব আল-মানদেব সমুদ্রপথের কৌশলগত গুরুত্বপূর্ণ বৃহত্তর ও ক্ষুদ্রতর হানিশ দ্বীপপুঞ্জ দখল করে নিয়েছে। এর ফলে লোহিত সাগরের দক্ষিণাঞ্চলে তাদের আধিপত্য আরো মজবুত হয়েছে।

এদিকে প্রতিবেশী সৌদি আরবের ভেতরেও আক্রমণ তীব্র করেছে হাউছিরা। গতকাল তারা দেশটির দক্ষিণাঞ্চলীয় সামরিক ঘাটিতে ড্রোন ও রকেট হামলা চালানোর দাবি করে। আনসারুল্লাহ হাউছি সশস্ত্র বাহিনীর সামরিক মুখপাত্র ইয়াহিয়া সারি জানান, তারা খামিস মুশাইতের কিং খালিদ বিমান ঘাঁটির বিমান হ্যাঙ্গার, রাডার সিস্টেম, রানওয়ে ও গোলাবারুদের গুদামে ডজনখানেক ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন দিয়ে সফল অভিযান পরিচালনা করেছেন। গত পাঁচ দিনে সৌদি এফ-১৫ ও টাইফুন যুদ্ধবিমানের ৩০০টির বেশি বিমান হামলার জবাবে এই পাল্টা হামলা চালানো হয় বলে তিনি জানান। হাউছিরা স্পষ্ট জানিয়েছে, অবরুদ্ধ এলাকা থেকে অবরোধ প্রত্যাহার ও আক্রমণ বন্ধ না হওয়া পর্যন্ত সৌদি ভূখণ্ডের গভীরে সামরিক স্থাপনায় হামলা অব্যাহত থাকবে। হাউছিদের নিয়ন্ত্রিত এলাকায় গত শনিবার পর্যন্ত দুই দিনে অন্তত ১২৯টি বিমান হামলা চালায় সৌদি জোট। তবে ২০০৪ সালে উত্থানের পর থেকে ২০০,০০০-এর বেশি বিমান হামলা সত্ত্বেও হাউছিদের বিস্তার রদ করা সম্ভব হয়নি।

সৌদি আরবের শারুরাহ ঘাঁটিতে হামলা ছাড়াও হাউছিদের ড্রোন আক্রমণে দেশটির বিখ্যাত ইস্ট-ওয়েস্ট তেল পাইপলাইন বন্ধ হয়ে গেছে। ফলে লোহিত সাগর উপকূলে ইয়ানবু বন্দরে মাত্র পাঁচ থেকে সাত দিনের তেল মজুদ অবশিষ্ট রয়েছে। এই সঙ্কট দ্রুত নিরসন না হলে বিশ্ববাজারে প্রতিদিন ৪০ লাখ ব্যারেল তেল সরবরাহ কমতে পারে, যা আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের মূল্য চরম বৃদ্ধির শঙ্কা তৈরি করেছে। অনাকাক্সিক্ষত পরিস্থিতিতে কৌশলগত সমুদ্রপথের নিরাপত্তা ও আন্তর্জাতিক মধ্যস্থতা নিয়ে তৎপরতা শুরু হয়েছে। সম্প্রতি জেদ্দায় সেন্টকম প্রধান অ্যাডমিরাল ব্র্যাড কুপারের সাথে বৈঠক করেছেন সৌদির ক্রাউন প্রিন্স মোহাম্মদ বিন সালমান। অন্যদিকে, গতকাল হরমুজ প্রণালীর কাসেম দ্বীপের কাছে মার্কিন হামলায় ইরানের এক বাণিজ্যিক নৌযানের একজন নিহত ও চারজন আহত হওয়ার পর ওমানে উপসাগরীয় নেতাদের বৈঠক ডেকেছে ইরান। তবে বাহরাইন এই বৈঠকে অংশ নিচ্ছে না এবং আয়ারল্যান্ড সফরে থাকা মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এই বৈঠককে তাদের নিজস্ব বিষয় বলে মন্তব্য করেছেন। প্রেসিডেনশিয়াল লিডারশিপ কাউন্সিলের সদস্য সুলতান আল-আরাদা জানান, সরকারি বাহিনীর অভ্যন্তরীণ কোন্দল ও বিভাজনের সুযোগ নিয়েই হাউছিরা দ্রুত তাদের এলাকা বিস্তার করতে সক্ষম হচ্ছে। গত ৯ আগস্ট থেকে ১০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত পশ্চিম উপকূলে সরকারি সমর্থিত ন্যাশনাল রেজিস্ট্যান্স ফোর্সের ৫০০ সেনার লাশ উদ্ধার করা হয়েছে এবং দেড় হাজার সেনা আহত হয়েছেন। হাউছিদের দ্রুত অগ্রযাত্রা রুখতে সরকারি বাহিনী বর্তমানে মারিব অঞ্চলে শক্ত অবস্থান নেয়ার চেষ্টা চালাচ্ছে।

হাউছি দমনে মার্কিন মাধ্যমে ইসরাইলের সহায়তা দাবি সৌদি যুবরাজের

আল মায়েদিনের সূত্রে জানা যায়, ইয়েমেনের হাউছি যোদ্ধাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে কাক্সিক্ষত সাফল্য না পাওয়ায় সৌদি আরবের যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান আঞ্চলিক মিত্রদের পাশাপাশি মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ডের (সেন্টকম) মধ্যস্থতায় পরোক্ষভাবে ইসরাইলের সাহায্য চেয়েছেন। ইসরাইল হাইওম পত্রিকার এক প্রতিবেদনে মধ্যপ্রাচ্যের কূটনৈতিক মহলের সূত্র টেনে এই তথ্য নিশ্চিত করা হয়েছে।