বিশ্বকাপ ফুটবলের ফাইনাল খেলা শুরু হচ্ছে। কেউ চিৎকার করে বলে, ‘মেসি!’ কেউ লামিন ইয়ামালের নাম ধরে লাফাতে থাকে।
এই পাড়াতেই থাকে ছয় বছরের ছোট্ট ছেলে নিপু। ছোট হলেও ফুটবল নিয়ে তার উত্তেজনার কোনো শেষ নেই। তার ঘরের দেয়ালে বড় করে লাগানো আছে লিওনেল মেসির ছবি। স্কুলব্যাগে মেসির স্টিকার, পানির বোতলেও মেসির ছবি।
খেলা শুরু হলেই নিপুর চোখ টিভিতে আটকে যায়। মেসি বল পেলেই সে দাঁড়িয়ে পড়ে। চিৎকার করে বলতে থাকে- ‘যাও মেসি... সামনে যাও... এবার শট মারো... গোলে মারো!’
মেসি যখন ডিফেন্ডারদের কাটিয়ে এগিয়ে যান, নিপুর বুক ধড়ফড় করতে থাকে। আর গোলপোস্টের দিকে শট নিলেই সে চোখ বন্ধ করে বলে ওঠে- ‘গো.ও..ও...ও....ল!’
গোল হোক আর না-হোক, নিপু এমনভাবে লাফায় যে মনে হয় গোলটা সে-ই দিয়েছে। একদিন রাতে খেলা দেখে খুব দেরিতে ঘুমাতে গেল নিপু। পরদিন সকালে স্কুলে যাওয়ার সময় অদ্ভুত এক ঘটনা ঘটল। রাস্তার মোড়ে একটি গাছের নিচে একজন মানুষ দাঁড়িয়ে হাসছেন। তার পরণে আকাশি-সাদা জার্সি। তাতে লেখা একটি সংখ্যা ১০। মানুষটির হাসি নিপুর খুব চেনা চেনা লাগে। সে চোখ বড় বড় করে বলে- ‘আ...আপনি... আপনি কি... মেসি?’
লোকটি মুচকি হেসে বললেন- ‘হ্যাঁ, আমি মেসি।’
নিপুর তো আনন্দে মাথাই ঘুরে গেল। বিস্ময়ে চিৎকার করে বলল- ‘সত্যি? আপনি আমার সাথে কথা বলবেন?’
‘অবশ্যই। কারণ, মনে কখনো হিংসা রাখতে নেই। আমি তো তোমার বন্ধু। তোমার সাথে গল্প করতে এসেছি। তুমি আমার সাথে সেলফি তুলবে?’
নিপু দৌড়ে গিয়ে মেসির হাত ধরে। ঘুরিয়ে ফিরিয়ে সেই হাত দেখে। তার পা দেখে। এই পা দিয়ে তিনি কি জাদুমাখা গোল দেন!
‘মেসি ভাই, আমাকে তোমার মতো ফুটবল খেলতে শিখিয়ে দেবে?’
মেসি হেসে বললেন- ‘শিখিয়ে দেবো। কিন্তু তার আগে একটা কথা।’
‘কী কথা?’
‘ভালো খেলোয়াড় হতে হলে শুধু মাঠে দৌড়ালেই হয় না। নিয়মিত পড়াশোনা করতে হবে। শরীর সুস্থ রাখতে হবে। বন্ধুদের সাথে ভালো ব্যবহার করতে হবে। তারপর প্রতিদিন একটু একটু করে অনুশীলন করতে হবে।’
নিপু মাথা নাড়ল- ‘আমি সব করব!’
‘আর হারলে কখনো মন খারাপ করবে না। যারা হারে, তারাই একদিন জিততে শেখে।’
নিপু বলল- ‘তাহলে আমি একদিন তোমার মতো হব?’
মেসি তার মাথায় হাত রেখে বললেন- ‘আমার মতো নয়, তুমি হবে তোমার নিজের মতো সেরা।’
দু’জন গল্প করতে করতে স্কুলের দিকে হাঁটতে লাগল। পথে সবাই অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে। কেউ বিশ্বাসই করতে পারছে না বিষয়টি। বিশ্বের সবচেয়ে বিখ্যাত ফুটবল তারকা ছোট্ট নিপুর সাথে গল্প করছেন!
স্কুলের সামনে পৌঁছে মেসি বললেন- ‘এবার যাও। মন দিয়ে পড়াশোনা করো। বিকেলে খেলবে।’
নিপু জিজ্ঞেস করল- ‘আবার দেখা হবে তো?’
মেসি চোখ টিপে বললেন- ‘যখনই তুমি মন দিয়ে চেষ্টা করবে, মনে করবে আমি তোমার পাশেই আছি।’
ঠিক তখনই- ‘নিপু! নিপু! ওঠো বাবা! স্কুলে যেতে হবে!’
কেউ যেন জোরে জোরে ডাকছে। নিপু চোখ খুলে দেখল- সে নিজের বিছানায় শুয়ে আছে। জানালার পাশে সকালের রোদ। মা তার স্কুলড্রেস হাতে দাঁড়িয়ে। নিপু চারদিকে তাকাল। না, কোথাও মেসি নেই। নিজের হাতের দিকে তাকাল সে। একটু আগেও তো সে মেসির হাত ধরেছিল! মা হেসে বললেন- ‘কি রে? ঘুমের মধ্যে বারবার বলছিলি-‘মেসি ভাই, আমাকে খেলতে শেখাও!’
নিপু লজ্জা পেয়ে হেসে ফেলল। সে বুঝতে পারল- সবটাই ছিল একটি সুন্দর স্বপ্ন। কিন্তু স্বপ্নের কথা তার মনে গেঁথে রইল।
সেদিন থেকে নিপু প্রতিদিন মন দিয়ে পড়াশোনা করে। বিকেলে মাঠে গিয়ে নিয়ম করে ফুটবল অনুশীলন করে। হারলেও আর কাঁদে না। রাতে ঘুমানোর আগে সে মেসির ছবির দিকে তাকিয়ে আস্তে করে বলে- ‘আমি চেষ্টা করছি, মেসি ভাই। একদিন ভালো খেলোয়াড় হব।’
জানালার বাইরে তখন আর্জেন্টিনার ছোট্ট পতাকাটি হাওয়ায় দুলতে থাকে। নিপুর মনে হয়, যেন দূর আকাশ থেকে কেউ একজন মুচকি হেসে বলছে- ‘খেলতে থাকো, স্বপ্ন দেখতে থাকো।’



