নিজস্ব প্রতিবেদক
দীর্ঘদিনের পুরনো বেশ কয়েকজন কর্মকর্তা-কর্মচারীকে ছাঁটাইয়ের ঘটনাকে কেন্দ্র করে উত্তেজনা বিরাজ করছে দেশের প্রধান শেয়ারবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে (ডিএসই)। প্রতিষ্ঠানটির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে নিজস্ব প্রশাসনিক ও সাংগঠনিক কাঠামোকে গতিশীল ও ভবিষ্যতের জন্য উপযুক্ত হিসেবে গড়ে তুলতে জনবলের পুনর্বিন্যাসের অংশ হিসাবে এ উদ্যোগ নিয়েছে। কিন্তু ছাঁটাইকৃত কর্মকর্তা-কর্মচারীরা বলছে, দীর্ঘদিন ধরে এই প্রতিষ্ঠানে চাকরি করলেও কোনো ধরনের পূর্ব ঘোষণা ছাড়াই তাদের চাকরি থেকে অব্যাহতি দেয়া হয়েছে।
চাকরিচ্যুত কর্মকর্তা-কর্মচারীরা তাদের চাকরি পুনর্বহালের দাবি জানিয়েছেন। একই সাথে ছাঁটাইয়ের পুরো প্রক্রিয়া নিয়ে নিরপেক্ষ তদন্তেরও আহ্বান জানিয়েছেন তারা। রোববার এ দাবিতে মতিঝিলে ডিএসইর পুরনো ভবনের সামনে মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করেন চাকরিচ্যুত বিভিন্ন স্তরের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। কর্মসূচিতে অংশ নিয়ে তারা অবিলম্বে চাকরিতে পুনর্বহাল এবং ছাঁটাইয়ের সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনার দাবি জানান।
মানববন্ধনে বক্তব্য দিয়ে ডিএসইর চাকরিচ্যুত উপমহাব্যবস্থাপক হোসনে আরা পারভীন বলেন, তিনি দীর্ঘদিন ধরে ডিএসইর বিভিন্ন বিভাগে দায়িত্ব পালন করেছেন। অথচ কর্মরত অবস্থায় হঠাৎ করেই তাকে চাকরিচ্যুতির চিঠি দেয়া হয়েছে। তিনি আরো বলেন, বিষয়টি নিয়ে পরিচালনা পর্ষদের সাথে যোগাযোগ করলে তারা এটিকে ব্যবস্থাপনার সিদ্ধান্ত বলে উল্লেখ করেন। অন্য দিকে ব্যবস্থাপনার পক্ষ থেকে বলা হয়, এটি পরিচালনা পর্ষদের সিদ্ধান্ত। আর নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) বিষয়টিকে ডিএসইর অভ্যন্তরীণ বিষয় হিসেবে দেখছে। এ অবস্থায় তারা কোথায় যাবেন এ প্রশ্নও তোলেন তিনি।
ডিএসইর আরেক উপমহাব্যবস্থাপক আব্দুর রাজ্জাক বলেন, চাকরিতে বহাল থাকা অবস্থায় কোনো ধরনের পূর্বঘোষণা ছাড়াই তাদের চাকরিচ্যুত করা হয়েছে। শুধু তাই নয়, তাদের দাফতরিক নেটওয়ার্ক থেকেও বিচ্ছিন্ন করে দেয়া হয়েছে। তবে কি কারণে এমন সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে, সে বিষয়ে কোনো ব্যাখ্যা দেয়া হয়নি।
এ দিকে ডিএসইর পক্ষ থেকে এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক বক্তব্য দেয়া হয়েছে। উপমহাব্যবস্থাপক শফিকুর রহমান স্বাক্ষরিত এ বক্তব্যে বলা হয়েছে কোনো প্রতিষ্ঠান পরিচালনার জন্য প্রয়োজনে জনবল নিয়োগ যেমন স্বাভাবিক ও আইনসম্মত বিষয় তেমনি প্রতিষ্ঠানের প্রয়োজনে জনবল ছাঁটাই বা চাকরির অবসায়নও একটি স্বীকৃত স্বাভাবিক ব্যবস্থাপনা প্রক্রিয়ার অংশ। সব বেসরকারি প্রতিষ্ঠানেই ব্যবসায়িক বাস্তবতা, সাংগঠনিক পুনর্গঠন, দক্ষতা বৃদ্ধি, প্রযুক্তিগত পরিবর্তন কিংবা কৌশলগত প্রয়োজনে এ ধরনের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়ে থাকে। এখানেও তার ব্যতিক্রম নয়।
ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ পিএলসি দেশের পুঁজিবাজারের একটি গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় প্রতিষ্ঠান। প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রমকে আরো গতিশীল ও ভবিষ্যৎ-উপযোগী করে গড়ে তুলতে আমরা একটি দীর্ঘমেয়াাদি সাংগঠনিক রূপান্তর কার্যক্রম বাস্তবায়ন করছি। এটি কোনো হঠাত গৃহীত সিদ্ধান্ত নয়। ২০২২ সাল থেকেই প্রতিষ্ঠান এই রূপান্তর প্রক্রিয়া নিয়ে কাজ করছে। সেই দীর্ঘমেয়াাদি প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবেই কিছু পদে পরিবর্তন আনা হয়েছে এবং সীমিত সংখ্যক কর্মচারীর চাকরির অবসান ঘটানো হয়েছে। স্পষ্টতার স্বার্থে উল্লেখ করা প্রয়োজজন, প্রতিষ্ঠানের মোট ৩৫০ জন কর্মীর মধ্যে মাত্র ১৭ জনের চাকরির অবসান ঘটানো হয়েছে যা মোট জনবলের ৫ শতাংশেরও কম।
তা ছাড়া সম্পূর্ণ প্রক্রিয়াটি বাংলাদেশ শ্রম আইন, ২০০৬-এর ধারা ২৬ এবং ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের বিদ্যমান সার্ভিস রুল অনুযায়ী আইনসম্মতভাবে সম্পন্ন হয়েছে। এই ধারা নিয়োগকর্তাকে নোটিশ প্রদান অথবা নোটিশের পরিবর্তে আইন-নির্ধারিত ক্ষতিপূরণ প্রদান করে, কোনো কারণ প্রদর্শন ছাঁড়াই চাকরির অবসান ঘটানোর ক্ষমতা দিয়েছে। এটি শ্রম আইনের একটি সুপ্রতিষ্ঠিত বিধান, যা বহু বছর ধরে দেশের বিভিন্ন বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে অনুসৃত হয়ে আসছে। একজন কর্মচারী যেমন নির্ধারিত নোটিশ প্রদান করে বা নোটিশের পরিবর্তে ক্ষতিপূরণ দিয়ে কোনো কারণ ব্যাখ্যা ছাড়াই পদত্যাগ করতে পারেন, তেমনি আইন নিয়োগকর্তাকেও নির্দিষ্ট শর্ত পূরণ সাপেক্ষে চাকরির অবসান ঘটানোর অধিকার দিয়েছে।
আইন অনুযায়ী চার মাসের বেতনের সমপরিমাণ ক্ষতিপূরণ প্রদান করলেই নিয়োগকর্তার আইনগত দায়িত্ব পূরণ হয়। কিন্তু ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ শুধু আইনের ন্যূনতম বাধ্যবাধকতা পূরণ করেই থেমে থাকেনি; মানবিক বিবেচনায় এবং যাতে তারা নতুন কর্মসংস্থানের জন্য পর্যাপ্ত সময় পান, সেই উদ্দেশ্যে প্রতিষ্ঠান আইনগত প্রাপ্যের অতিরিক্ত আরো দুই মাসের বেতন প্রদান করেছে অর্থাৎ প্রত্যেককে মোট ছয় মাসের বেতনের সমপরিমাণ অর্থ দেয়া হয়েছে।
এ ছাড়া প্রত্যেক কর্মচারীকে তার চাকরির মেয়াদ অনুযায়ী ফাইনাল সেটেলমেন্টের আওতায় প্রাপ্য সব অর্থ যথাযথভাবে প্রদান করা হবে, যার মধ্যে রয়েছে প্রভিডেন্ট ফান্ড, গ্র্যাচুইটি, অব্যবহৃত ছুটির নগদায়নে ও অন্যান্য প্রাপ্য সুবিধা। অনেকের ক্ষেত্রে এই চূড়ান্ত প্রাপ্ত অর্থ বহু মাসের বেতনের সমপরিমাণ। ইতোমধ্যে কোম্পানির পক্ষ থেকে তাদের সাথে একাধিকবার যোগাযোগ করা হয়েছে, যেন তারা তাদের প্রাপ্য অর্থ দ্রুত বুঝে নিয়ে যান। পাশাপাশি তাদের সাথে সর্বোচ্চ পেশাদারিত্ব, সংবেদনশীলতা ও মানবিক আচরণ করা হয়েছে; কোনো ধরনের অপমানজনক বা অসম্মানজনক পরিস্থিতি সৃষ্টি করা হয়নি। তাদের জানানো হয়েছে যে, সবাইকে যথাযথ অভিজ্ঞতা সনদ প্রদান করা হবে এবং তাদের আইনগত প্রাপ্য ও প্রশাসনিক সহায়তার বিষয়েও প্রতিষ্ঠান পাশে থাকবে।
দুঃখজনকভাবে, চাকরির অবসানের পর কিছু ব্যক্তি বিভিন্ন মাধ্যমে এমন কিছু বক্তব্য দিচ্ছেন, যা অনেক ক্ষেত্রে অসম্পূর্ণ তথ্য বা প্রেক্ষাপট বিবেচনা না করেই উপস্থাপিত হচ্ছে। আমরা প্রত্যেক নাগরিকের মতপ্রকাশের স্বাধীনতাকে সম্মান করি। তবে আমরা বিশ্বাস করি, কোনো প্রতিষ্ঠানের ভাবমূর্তি বা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের স্বার্থ ক্ষুণœ কোনো বক্তব্য দেয়ার আগে তথ্য যাচাই করা প্রত্যেকের নৈতিক দায়িত্ব।



