ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি
১১ জুলাই, কোটা সংস্কারের দাবিতে আন্দোলনের দেড় সপ্তাহ পেরিয়েছে। আগের দিনের ‘বাংলা ব্লকেড’ দেশজুড়ে আলোড়ন তুলে। এরই ধারাবহিকতায় রাজধানী থেকে শুরু করে চট্টগ্রাম, রাজশাহী, খুলনা, বরিশাল, সিলেট, রংপুর, ময়মনসিংহসহ দেশের প্রায় সব বড় শহরে শিক্ষার্থীরা ১১ জুলাই ফের রাজপথে নামেন। এদিন আন্দোলন কেবল বিশ্ববিদ্যালয়কেন্দ্রিক সীমাবদ্ধ না থেকে দেশব্যাপী সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছড়িয়ে পড়ে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ রাজধানীর স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীরা নিজ নিজ ক্যাম্পাসে জড়ো হতে শুরু করেন। তারা ছোট ছোট মিছিল নিয়ে শাহবাগ, বাংলামোটর, সায়েন্স ল্যাবরেটরি, মহাখালী, উত্তরা, মিরপুর ও যাত্রাবাড়ীর মতো গুরুত্বপূর্ণ সড়কে অবস্থান নেন। পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজের শিক্ষার্থীরাও নিজ নিজ এলাকায় সড়ক অবরোধ করেন। এতে সারা দেশের যোগাযোগ ব্যবস্থা থমকে যায়। সড়কে কর্মজীবী মানুষ থেকে শুরু করে দূরপাল্লার পরিবহন দীর্ঘ সময় আটকে থাকে। অনেককে দীর্ঘ পথ হেঁটে গন্তব্যে পৌঁছান।
এদিন আন্দোলনের কেন্দ্রস্থল ছিল শাহবাগ। দুপুর নাগাদ সেখানে কয়েক হাজার শিক্ষার্থী অবস্থান নেন। আন্দোলনকারীরা জানান, সুপ্রিম কোর্টে মামলার শুনানি থাকলেও তারা আন্দোলন স্থগিত করবেন না। তাদের ভাষ্য, সরকারের পক্ষ থেকে কোটা ব্যবস্থার বিষয়ে স্পষ্ট রাজনৈতিক অবস্থান না আসা পর্যন্ত আন্দোলন চলবে। শিক্ষার্থীদের দৃঢ় অবস্থান আন্দোলনের নতুন কৌশলের ইঙ্গিত দেয়।
দিন শেষে পুলিশের সাথে কিছু জায়গায় শিক্ষার্থীদের উত্তেজনা সৃষ্টি হয়। শাহবাগ ও আশপাশের এলাকায় আন্দোলনকারীদের সরিয়ে দিতে পুলিশ ধাক্কাধাক্কি, লাঠিচার্জ এবং টিয়ার শেল নিক্ষেপ করে। ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার ঘটনা ঘটে। এ সময় সমন্বয়করা শিক্ষার্থীদের শান্ত থাকার আহ্বান জানানোর পাশাপাশি উসকানিতে পা না দিতে অনুরোধ জানান।
ঢাকার বাইরেও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়, খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা বিক্ষোভ ও সড়ক অবরোধ কর্মসূচি পালন করেন। কোথাও মহাসড়ক, কোথাও রেললাইন, আবার কোথাও গুরুত্বপূর্ণ সড়ক অবরোধের কারণে জনজীবন ব্যাহত হয়। এদিন আন্দোলন কেবল রাজধানীকেন্দ্রিক নয়; বরং দেশের প্রায় প্রতিটি অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে।
এ দিকে ‘আন্দোলনকারীরা সর্বোচ্চ আদালতের বিরুদ্ধে শক্তি প্রদর্শন করছেন’- আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরের এ মন্তব্য রাজনৈতিক বিতর্কের জন্ম দেয়। আন্দোলনকারীরা পাল্টা জানান, তাদের কর্মসূচি আদালতের বিরুদ্ধে নয়; বরং বৈষম্যমূলক কোটা ব্যবস্থার সংস্কারের দাবিতে। দুই পক্ষের বিপরীত অবস্থানে আন্দোলনের রাজনৈতিক গুরুত্ব বেড়ে যায়।
আন্দোলন ধীরে ধীরে সংগঠিত রূপ নেয়। দৈনিক কর্মসূচি, বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে সমন্বয় এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দ্রুত তথ্য আদান-প্রদানের মাধ্যমে আন্দোলন আরো বিস্তৃত হতে থাকে। ঢাকার কর্মসূচির সাথে মিলিয়ে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে কর্মসূচি পালিত হচ্ছিল। একই দাবি এবং কর্মসূচি পালনের মধ্য দিয়ে শিক্ষার্থীরা একটি জাতীয় প্ল্যাটফর্ম গড়ে তুলতে সক্ষম হন।
দিনভর উত্তেজনার শেষে সংবাদ সম্মেলনে শিক্ষার্থীরা বিভিন্ন স্থানে হামলা ও পুলিশের বাধা দেয়ার অভিযোগ আনেন। এর প্রতিবাদে ১২ জুলাই সারা দেশে সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বিক্ষোভ সমাবেশ ও মিছিলের নতুন কর্মসূচি দেয়া হয়। ১১ জুলাইয়ের ঘটনাপ্রবাহ পরবর্তী আন্দোলনের ভিত্তি তৈরিতে সহায়ক ভূমিকা পালন করে।
সাধারণ মানুষের মধ্যেও এ দিনের আন্দোলন নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া ছিল। দুর্ভোগের কারণে ক্ষোভের পাশাপাশি অনেকেই শিক্ষার্থীদের দাবির প্রতি সহানুভূতি প্রকাশ করেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এই আন্দোলন নিয়ে পক্ষে-বিপক্ষে ব্যাপক আলোচনা হয়। ফলে এ আন্দোলন কেবল রাজপথে সীমাবদ্ধ থাকেনি; বরং জনপরিসরেও আলোচনার বিষয় হয়ে উঠে।
১১ জুলাই ছিল আন্দোলনের একটি গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণ। আগের কয়েক দিনের কর্মসূচির ধারাবাহিকতায় এ দিন শিক্ষার্থীরা দীর্ঘ আন্দোলনের ইঙ্গিত দেন। পাশাপাশি সরকার, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং রাজনৈতিক দলগুলোর অবস্থানও স্পষ্ট হতে শুরু করে। পরবর্তী কয়েক দিনে উত্তেজনা আরো বাড়ার পূর্বাভাসও ছিল এই দিনের ঘটনাপ্রবাহে।



