জাকাত ও ইসলামিক ক্ষুদ্র বিনিয়োগে বদলাচ্ছে গ্রামীণ অর্থনীতি

চ্যালেঞ্জ টেকসই কর্মসংস্থান

জামানতের অভাব, উচ্চ সুদ, আর্থিক অন্তর্ভুক্তির সীমাবদ্ধতা এবং প্রাতিষ্ঠানিক ব্যাংকিং ব্যবস্থায় প্রবেশের জটিলতার কারণে লাখো ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা এখনো প্রয়োজনীয় অর্থায়ন থেকে বঞ্চিত। খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, এমন বাস্তবতায় জাকাতভিত্তিক তহবিল, ইসলামিক মাইক্রোফাইন্যান্স এবং কর্জে হাসানা (সুদবিহীন ঋণ) মডেল গ্রামীণ অর্থনীতিতে একটি বিকল্প আর্থিক কাঠামো হিসেবে গুরুত্ব পাচ্ছে। তারা বলছেন, বিভিন্ন ইসলামী ব্যাংক, দাতব্য প্রতিষ্ঠান, এনজিও ও ওয়াকফভিত্তিক সংগঠন দরিদ্র জনগোষ্ঠীকে শুধু আর্থিক সহায়তাই দিচ্ছে না, বরং প্রশিক্ষণ, বাজারসংযোগ ও উদ্যোক্তা উন্নয়ন কার্যক্রমের মাধ্যমে আত্মনির্ভরশীল হওয়ার সুযোগও তৈরি করছে।

শাহ আলম নূর
Printed Edition

বাংলাদেশের গ্রামীণ অর্থনীতিতে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প (এসএমই) খাত দীর্ঘদিন ধরেই কর্মসংস্থান, আয় বৃদ্ধি এবং দারিদ্র্য বিমোচনের অন্যতম চালিকাশক্তি। তবে জামানতের অভাব, উচ্চ সুদ, আর্থিক অন্তর্ভুক্তির সীমাবদ্ধতা এবং প্রাতিষ্ঠানিক ব্যাংকিং ব্যবস্থায় প্রবেশের জটিলতার কারণে লাখো ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা এখনো প্রয়োজনীয় অর্থায়ন থেকে বঞ্চিত। খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, এমন বাস্তবতায় জাকাতভিত্তিক তহবিল, ইসলামিক মাইক্রোফাইন্যান্স এবং কর্জে হাসানা (সুদবিহীন ঋণ) মডেল গ্রামীণ অর্থনীতিতে একটি বিকল্প আর্থিক কাঠামো হিসেবে গুরুত্ব পাচ্ছে। তারা বলছেন, বিভিন্ন ইসলামী ব্যাংক, দাতব্য প্রতিষ্ঠান, এনজিও ও ওয়াকফভিত্তিক সংগঠন দরিদ্র জনগোষ্ঠীকে শুধু আর্থিক সহায়তাই দিচ্ছে না, বরং প্রশিক্ষণ, বাজারসংযোগ ও উদ্যোক্তা উন্নয়ন কার্যক্রমের মাধ্যমে আত্মনির্ভরশীল হওয়ার সুযোগও তৈরি করছে।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সর্বশেষ গৃহস্থালি আয় ও ব্যয় জরিপে দেখা যায়, দেশে দারিদ্র্যের হার প্রায় ১৮ দশমিক ৭ শতাংশ এবং চরম দারিদ্র্যের হার ৫ দশমিক ৬ শতাংশ। যদিও গত দুই দশকে দারিদ্র্য উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে, তবুও গ্রামীণ অঞ্চলে কর্মসংস্থান, উৎপাদনশীল বিনিয়োগ এবং ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের অর্থায়ন এখনো বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে রয়ে গেছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যে দেখা যায়, দেশের ব্যাংক খাতের মোট ঋণের প্রায় ১৮ শতাংশ গেছে কটেজ, ক্ষুদ্র, ছোট ও মাঝারি শিল্প (সিএমএসএমই) খাতে। ২০২৯ সালের মধ্যে ব্যাংকগুলোর মোট ঋণের ২৭ শতাংশ এই খাতে বিতরণের লক্ষ্য রয়েছে। শিল্প মন্ত্রণালয় ও এসএমই ফাউন্ডেশন সূত্রে জানা গেছে, দেশে বর্তমানে এক কোটি ১৭ লাখ কুটির, অতিক্ষুদ্র, ক্ষুদ্র ও মাঝারি (সিএমএসএমই) প্রতিষ্ঠান রয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ৬০ শতাংশ উদ্যোক্তাই প্রথাগত ব্যাংকঋণের আওতার বাইরে রয়েছেন।

দেশে তফসিলি ব্যাংকগুলোর এসএমই ঋণ বিতরণের পরিমাণ প্রতি বছরই বাড়ছে। তবে এই ঋণের বড় অংশ শহরকেন্দ্রিক ব্যবসায়ীদের কাছে যাচ্ছে। গ্রামীণ ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের একটি বড় অংশ এখনো আনুষ্ঠানিক আর্থিক ব্যবস্থার বাইরে অবস্থান করছে। বিশ্বব্যাংক এবং ইসলামিক ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের বিভিন্ন গবেষণায় বলা হয়েছে, ইসলামী মাইক্রোফাইন্যান্স শুধু ঋণ বিতরণ নয়; বরং দারিদ্র্যবিমোচন, সম্পদ সৃষ্টি, নারী উদ্যোক্তা গড়ে তোলা এবং সামাজিক নিরাপত্তা জোরদারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। বিশেষ করে জাকাত, সদকা, ওয়াকফ এবং সুদবিহীন অর্থায়নকে উৎপাদনমুখী বিনিয়োগের সাথে যুক্ত করা গেলে এর প্রভাব আরো বিস্তৃত হতে পারে।

সিরাজগঞ্জ সদর উপজেলার খোকশাবাড়ি গ্রামের বাসিন্দা রাশেদা বেগম নয়া দিগন্তকে বলেন, কয়েক বছর আগে একটি ইসলামিক দাতব্য প্রতিষ্ঠানের জাকাতভিত্তিক পুনর্বাসন প্রকল্পের মাধ্যমে কয়েকটি ছাগল এবং নগদ মূলধন পান। পরে স্থানীয় ইসলামিক মাইক্রোফাইন্যান্স কর্মসূচির আওতায় সুদমুক্ত ক্ষুদ্র অর্থায়ন নিয়ে তিনি হাঁস-মুরগি ও দুগ্ধখামার গড়ে তোলেন। বর্তমানে তার মাসিক আয় ১৮ থেকে ২২ হাজার টাকার মধ্যে এবং পরিবারের সন্তানদের নিয়মিত স্কুলে পাঠাতে পারছেন।

এ দিকে বগুড়া জেলার শেরপুর উপজেলার কাফুরা গ্রামের কৃষক আব্দুল হালিম নয়া দিগন্তকে বলেন, ইসলামিক ক্ষুদ্র অর্থায়নের মাধ্যমে একটি পাওয়ার টিলার ভাড়া ব্যবসা শুরু করেন। বর্তমানে নিজের জমির পাশাপাশি আশপাশের কৃষকদেরও সেবা দিয়ে তিনি বছরে কয়েক লাখ টাকার লেনদেন করছেন। তিনি বলেন, সুদভিত্তিক ঋণের কিস্তির চাপ না থাকায় ব্যবসা সম্প্রসারণ সহজ হয়েছে।

বাংলাদেশে ইসলামিক মাইক্রোফাইন্যান্স কার্যক্রম পরিচালনা করছে কয়েকটি ইসলামী ব্যাংকের ফাউন্ডেশন, বিভিন্ন বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা এবং দাতব্য প্রতিষ্ঠান। অনেক প্রতিষ্ঠান জাকাতভিত্তিক সহায়তার সাথে প্রশিক্ষণ, স্বাস্থ্যসেবা, কৃষিসহায়তা এবং উদ্যোক্তা উন্নয়ন কর্মসূচিও যুক্ত করছে। এতে এককালীন অনুদানের পরিবর্তে দরিদ্র পরিবারগুলো স্থায়ী আয়ের উৎস তৈরির সুযোগ পাচ্ছে।

খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, বাংলাদেশে প্রতি বছর বিপুল পরিমাণ জাকাত দেয়ার সক্ষমতা থাকলেও এর বড় অংশ এখনো ব্যক্তিপর্যায়ে বণ্টিত হয় এবং উৎপাদনমুখী খাতে খুব কমই ব্যবহৃত হয়। দেশের সম্ভাব্য বার্ষিক জাকাতের পরিমাণ কয়েক হাজার কোটি টাকা হতে পারে। এই অর্থের একটি অংশ যদি দক্ষ ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা তৈরিতে ব্যবহার করা যায়, তাহলে দারিদ্র্যবিমোচনে এর উল্লেখযোগ্য প্রভাব পড়তে পারে।

ইসলামিক ইকোনমিকস রিসার্চ ব্যুরোর (আইইআরবি) জেনারেল সেক্রেটারি অর্থনীতিবিদ ড. মিজানুর রহমান নয়া দিগন্তকে বলেন, জাকাতের মূল উদ্দেশ্য কেবল তাৎক্ষণিক ভোগ ব্যয় মেটানো নয়, বরং একজন দরিদ্র মানুষকে এমন অবস্থায় নিয়ে যাওয়া যাতে তিনি ভবিষ্যতে আর সাহায্যগ্রহীতা না থেকে উৎপাদনশীল ব্যক্তি হয়ে উঠতে পারেন। যদি জাকাতকে দক্ষতা উন্নয়ন, ক্ষুদ্র ব্যবসা ও কর্মসংস্থানের সাথে যুক্ত করা যায়, তাহলে এর অর্থনৈতিক প্রভাব বহুগুণ বাড়বে।

অর্থনীতিবিদ আশেক আহমেদ জাবেদ নয়া দিগন্তকে বলেন, গ্রামীণ নারীদের অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নে ইসলামিক মাইক্রোফাইন্যান্স একটি কার্যকর উপায় হতে পারে। তবে শুধু অর্থ দিলেই হবে না, বাজারসংযোগ, প্রশিক্ষণ, হিসাবরক্ষণ শিক্ষা এবং প্রযুক্তিগত সহায়তাও নিশ্চিত করতে হবে। তিনি বলেন, জাকাতভিত্তিক অর্থায়নকে জাতীয় সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির বিকল্প হিসেবে দেখা ঠিক হবে না। তবে এটি একটি পরিপূরক ব্যবস্থা হিসেবে কার্যকর হতে পারে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা এবং উপযুক্ত উপকারভোগী নির্বাচন।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সাম্প্রতিক এসএমই অর্থায়ন নীতিমালায় নারী উদ্যোক্তা, কৃষিভিত্তিক শিল্প, গ্রামীণ উদ্যোগ এবং আর্থিক অন্তর্ভুক্তির ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। একই সাথে ইসলামিক ব্যাংকগুলোও শরিয়াহসম্মত এসএমই অর্থায়নের পরিধি বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে।

তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, ইসলামিক মাইক্রোফাইন্যান্সের সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো এটি অনেক ক্ষেত্রে জামানতনির্ভর নয় এবং স্থানীয় সামাজিক আস্থার ভিত্তিতে পরিচালিত হয়। ফলে দরিদ্র ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠী তুলনামূলক সহজে অর্থায়নের সুযোগ পায়। পাশাপাশি ধর্মীয় অনুপ্রেরণার কারণে ঋণ পরিশোধের হারও অনেক ক্ষেত্রে সন্তোষজনক থাকে।

ইসলামিক ইকোনমিকস রিসার্চ ব্যুরোর (আইইআরবি) গবেষণায় বলা হয়েছে, এই খাতে বেশ কিছু সীমাবদ্ধতাও রয়েছে। বাংলাদেশে এখনো জাকাত ব্যবস্থাপনার জন্য সমন্বিত জাতীয় ডাটাবেজ নেই। অধিকাংশ জাকাত ব্যক্তিপর্যায়ে বিতরণ হওয়ায় এর প্রকৃত অর্থনৈতিক প্রভাব পরিমাপ করা কঠিন। একই সাথে ইসলামিক মাইক্রোফাইন্যান্স পরিচালনাকারী অনেক ছোট প্রতিষ্ঠানের সক্ষমতা, তদারকি এবং আর্থিক ব্যবস্থাপনায় বৈচিত্র্য রয়েছে।

প্রতিষ্ঠানটির গবেষণায় উঠে এসেছে, জাকাত, ওয়াকফ এবং ইসলামিক সামাজিক অর্থায়নকে যদি এসএমই উন্নয়ন নীতির সাথে সমন্বয় করা যায়, তাহলে গ্রামীণ অর্থনীতিতে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি, নারী উদ্যোক্তা বৃদ্ধি এবং স্থানীয় উৎপাদন বাড়ানো সম্ভব হবে। বিশেষ করে কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, দুগ্ধশিল্প, মৎস্য, হস্তশিল্প, গ্রামীণ পর্যটন এবং ক্ষুদ্র উৎপাদন খাতে এ ধরনের অর্থায়নের ব্যাপক সম্ভাবনা রয়েছে।

একটি জাতীয় জাকাত ব্যবস্থাপনা কাঠামো, ডিজিটাল উপকারভোগী ডাটাবেজ, প্রশিক্ষণনির্ভর অর্থায়ন, নিয়মিত প্রভাব মূল্যায়ন এবং সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বের মাধ্যমে ইসলামিক সামাজিক অর্থনীতিকে আরো কার্যকর করা সম্ভব। একই সাথে ইসলামিক মাইক্রোফাইন্যান্সকে বাংলাদেশ ব্যাংকের আর্থিক অন্তর্ভুক্তি কর্মসূচির সাথে সমন্বয় করলে গ্রামীণ ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা আরো সহজে মূলধন পেতে পারেন।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, গ্রামের দরিদ্র পরিবারকে এককালীন সহায়তা দেয়ার পরিবর্তে উৎপাদনশীল সম্পদ, দক্ষতা উন্নয়ন এবং ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা তৈরির মাধ্যমে আত্মনির্ভরশীল করে তোলাই জাকাতভিত্তিক অর্থনীতির মূল শক্তি। তারা বলছেন, সুশাসন, স্বচ্ছতা এবং পরিকল্পিত বিনিয়োগ নিশ্চিত করা গেলে জাকাত ফান্ড ও ইসলামিক মাইক্রোফাইন্যান্স বাংলাদেশের গ্রামীণ অর্থনীতিতে দারিদ্র্যবিমোচনের আরো শক্তিশালী হাতিয়ার হয়ে উঠতে পারে।