সৈয়দ সামসুজ্জামান নীপু
অর্থপাচার ও সন্ত্রাসে অর্থায়ন প্রতিরোধে বাংলাদেশ এখন পর্যন্ত কী কী পদক্ষেপ নিয়েছে, তা খতিয়ে দেখবে এশিয়া প্যাসিফিক গ্রুপ অন মানিলন্ডারিং (এপিজি)। অর্থপাচাররোধী বিশ্ব সংস্থাটি তার চতুর্থ পর্যায়ের মিউচুয়াল ইভ্যালুয়েশনের জন্য একটি টিমকে ঢাকায় পাঠিয়েছে। গতকালই তারা এসে কাজ শুরু করে দিয়েছে। টিমটি আগামী বৃহস্পতিবার পর্যন্ত এখানে অবস্থান করে সরকারের œ উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তাদের সাথে ধারাবাহিক বৈঠক করবেন বলে জানা গেছে। এ পর্যায়ে আজ বুধবার অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরীর সাথে তাদের বৈঠকের কথা রয়েছে। এ ছাড়া বৈঠক করবেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদের সাথেও। বাংলাদেশ ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের কর্মকর্তাদের সাথেও বৈঠকের কথা রয়েছে এপিজি টিমের। এসব বৈঠকে অর্থপাচার ও সন্ত্রাসে অর্থায়ন প্রতিরোধে সরকার এখন পর্যস্ত কী উদ্যোগ ও পদক্ষেপ নিয়েছে, তা তুলে ধরা হবে।
সফরকালে তারা সরকারের প্রস্তুতি, আইনগত কাঠামো, ঝুঁকি মূল্যায়ন, তদন্ত ও বিচারব্যবস্থা এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর সমন্বয় পর্যালোচনা করবে। এই সফরের মাধ্যমেই ২০২৭-২৮ সালে অনুষ্ঠেয় মানিলন্ডারিং প্রতিরোধসংক্রান্ত চতুর্থ মিউচুয়াল ইভ্যালুয়েশন কার্যক্রমের আনুষ্ঠানিক প্রস্তুতি শুরু হবে।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, দেশে অর্থপাচার ও সন্ত্রাসে অর্থায়নের ঝুঁকি মোকাবেলায় একাধিক গুরুত্বপূর্ণ কাজ এখনো চলমান। এর মধ্যে রয়েছে তৃতীয় জাতীয় ঝুঁকি মূল্যায়ন, সন্ত্রাসে অর্থায়নের ঝুঁকি বিশ্লেষণ, মূল্যায়ন, এনজিও-এনপিও এবং ভার্চুয়াল অ্যাসেট বা ভার্চুয়াল অ্যাসেট সার্ভিস প্রোভাইডার খাতের ঝুঁকি নিরূপণ। একই সাথে কোম্পানি আইনে বেনিফিশিয়ারি ওনারের সংজ্ঞা নির্ধারণ, রেজিস্ট্রার অব জয়েন্ট স্টক অ্যান্ড কোম্পানিজের সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং জাতীয় কৌশলপত্র প্রণয়নের কাজও এগিয়ে চলছে বলে জানানো হয়েছে।
তবে এপিজির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, শুধু আইন থাকলেই হবে না, বাস্তবে সেই আইন কতটা কার্যকরভাবে প্রয়োগ হচ্ছে সেটিও সমান গুরুত্ব দিতে হবে। ফলে তদন্ত, বিচার, সম্পদ জব্দ, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা এবং পাচার হওয়া অর্থ ফিরিয়ে আনার সক্ষমতাও এবার কঠোরভাবে যাচাই করা হবে।
এ দিকে জাতীয় সমন্বয় কমিটির কার্যপত্র অনুযায়ী, এপিজির মূল্যায়নকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে বাংলাদেশ ফিন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইফনিটকে (বিএফআইইউ)- লিড এজেন্সি হিসেবে দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। বিএফআইইউ প্রধানকে করা হয়েছে প্রধান সমন্বয়কারী। সব মন্ত্রণালয়, বিভাগ ও সংস্থাকে ফোকাল পারসন মনোনয়নের নির্দেশ দেয়া হয়েছে, যাতে নির্ধারিত সময়ে প্রয়োজনীয় তথ্য ও প্রমাণ উপস্থাপন করা যায়।
সরকার ইতোমধ্যে মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ আইন, ২০১২ সংশোধনের উদ্যোগ নিয়েছে। বিদেশে পাচার হওয়া অর্থ ও সম্পদ উদ্ধারের আইনি ভিত্তি আরো শক্তিশালী করতে ‘মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ (সংশোধন) অধ্যাদেশ, ২০২৫’ প্রণয়নের কাজ চলছে। পাশাপাশি আন্তঃদেশীয় তদন্ত, যৌথ অনুসন্ধান এবং অর্থপাচারের মামলাগুলোর দ্রুত নিষ্পত্তির ওপরও গুরুত্ব দেয়া হয়েছে।
জানা গেছে, এপিজি ও ফিন্যান্সিয়াল অ্যাকশন টাস্কফোর্সের (এফএটিএফ) পদ্ধতি অনুযায়ী বাংলাদেশের মূল্যায়ন হবে দুই ধাপে। প্রথম ধাপে টেকনিকাল কমপ্লায়েন্সের আওতায় ৪০টি সুপারিশ অনুযায়ী দেশের আইন, বিধিমালা ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো মূল্যায়ন করা হবে। দ্বিতীয় ধাপে ইফেকটিভনেস মূল্যায়নের মাধ্যমে দেখা হবে, এসব আইন বাস্তবে কতটা কার্যকর হয়েছে। এ ক্ষেত্রে ১১টি ইমিডিয়েট আউটকামের ভিত্তিতে বিচার করা হবে তদন্ত, বিচার, সম্পদ জব্দ, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা এবং সন্ত্রাসে অর্থায়ন প্রতিরোধের কার্যকারিতা মুল্যায়ন করা হবে।
কার্যপত্র অনুযায়ী মার্চ ২০২৭-এর মধ্যে বাংলাদেশের আইন, নীতিমালা, ঝুঁকি মূল্যায়ন রিপোর্ট এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় নথি এপিজির কাছে পাঠাতে হবে। এরপর জুন ২০২৭-এ বাস্তবায়নের প্রমাণভিত্তিক তথ্য জমা দিতে হবে। একই বছরের অক্টোবরে এপিজির মূল্যায়নকারী দল বাংলাদেশ সফর করে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, সংস্থা, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠান এবং বেসরকারি খাতের প্রতিনিধিদের সাক্ষাৎকার নেবে।
বাংলাদেশের যেসব ঘাটতি উঠে এসেছে : কার্যপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে, দুর্নীতি দমন কমিশনের নেতৃত্বে পরিচালিত তৃতীয়ের কাজ এখনো চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। একইভাবে সন্ত্রাসে অর্থায়ন ঝুঁকি মূল্যায়ন, ঝুঁকি বিশ্লেষণ এবং ভার্চুয়াল অ্যাসেট খাতের ঝুঁকি নিরূপণের কাজও শেষ হয়নি।
অন্য দিকে বাংলাদেশ পুলিশের সিআইডি জানিয়েছে, তাদের নিজস্ব প্রসিকিউশন সার্ভিস না থাকায় মানিলন্ডারিংয়ের মতো জটিল মামলার বিচার কার্যক্রম দ্রুত শেষ করা কঠিন হচ্ছে। এ কারণে সিআইডিতে একটি স্থায়ী প্রসিকিউশন সেল গঠনের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।
একটি আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের এক সূত্র জানিয়েছেন, গেল আড়াই বছরে অর্থপাচার ও সন্ত্রাসে অর্থায়ন প্রতিরোধে বাংলাদেশ ভালো অগ্রগতি সাধন করেছে। অর্থপাচার কিছুটা রোধ করা সম্ভব হয়েছে। এখন কেউ ইচ্ছে করলেই ব্যাংক টাকা লুট করে বিদেশে পাচার করতে পারবে না। তবুও এ ক্ষেত্রে কয়েকটি চ্যালেঞ্জ রয়েই গেছে। এগুলোর মধ্যে রয়েছে-
পাচার হওয়া অর্থ বিদেশ থেকে ফেরত আনা; এ অর্থের প্রকৃত মালিকানা শনাক্ত করা। শেল কোম্পানি ও বেনামি মালিকানার ব্যবহার বন্ধ করা। দুর্বল তদন্ত ও মামলার নিষ্পত্তির ধীরগতি। এবং বাণিজ্যের আড়ালে অর্থপাচার শনাক্ত করা।



