রূপগঞ্জে হাইভোল্টেজ অবৈধ বিদ্যুৎ লাইনের নিচে হাজারো মানুষের জীবন

Printed Edition
বৈদ্যুতিক খুঁটির তার থেকে আগুন ছিটকে আহত হন আরিফ : নয়া দিগন্ত
বৈদ্যুতিক খুঁটির তার থেকে আগুন ছিটকে আহত হন আরিফ : নয়া দিগন্ত

রূপগঞ্জ (নারায়ণগঞ্জ) সংবাদদাতা

নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ উপজেলার গোলাকান্দাইল ইউনিয়নের কেশরাব গ্রামের ওপর দিয়ে একটি বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রের ৩৩ কেভি উচ্চ ভোল্টেজের বিদ্যুৎ লাইন নির্মাণের পর থেকে আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন কয়েক হাজার বাসিন্দা।

এলাকাবাসীর অভিযোগ, অপর্যাপ্ত নিরাপত্তাব্যবস্থার কারণে প্রায়ই লাইনে স্পার্কিং ও ফ্ল্যাশিংয়ের ঘটনা ঘটছে। এতে বেশ কয়েকজন মানুষ আহত হওয়ার পাশাপাশি ঘরবাড়ি, বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতি, গবাদিপশু ও মাছের খামারের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হচ্ছে। সবশেষ গত ২৭ মে ঈদের আগের দিন বিদ্যুতের ফ্ল্যাশিংয়ে দগ্ধ হন স্থানীয় দোকানদার আরিফ। গুরুতর আহত অবস্থায় তিনি বর্তমানে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।

স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, পূর্বাচলে অবস্থিত কাঞ্চন পূর্বাচল পাওয়ার জেনারেশন লিমিটেডের ৫৫ মেগাওয়াট বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহের জন্য নির্মিত লাইনটি নির্ধারিত রুট অনুসরণ না করে কেশরাব গ্রামের ওপর দিয়ে নেয়া হয়েছে। তাদের দাবি, স্থানীয়দের আপত্তি উপেক্ষা করে একটি প্রভাবশালী মহলের সহায়তায় লাইনটি নির্মাণ করা হয়েছে।

সরেজমিন দেখা যায়, উচ্চ ভোল্টেজের সংযোগ লাইনের নিচেই রয়েছে পল্লী বিদ্যুতের সরবরাহ লাইন ও ট্রান্সফরমার। একই সাথে ওই লাইনের নিচ দিয়ে একটি ব্যস্ত সড়ক চলে গেছে, যা ব্যবহার করে প্রতিদিন কয়েকটি গ্রামের হাজারো মানুষ যাতায়াত করে।

এলাকাবাসীর ভাষ্য, লাইনটি চালুর পর থেকে শতাধিক দুর্ঘটনা ঘটেছে। কখনো বসতবাড়িতে আগুন লেগেছে, কখনো বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতি পুড়ে গেছে। আবার শটসার্কিটের কারণে গরু ও মাছ মারা যাওয়ার ঘটনাও ঘটেছে।

দগ্ধ দোকানদার আরিফ বলেন, ‘এখানে প্রায়ই স্পার্কিং হয়। ঈদের আগের দিন সকালে খুঁটির তার থেকে আগুন ছিটকে আমার শরীরে পড়ে। শরীরের অনেক অংশ পুড়ে গেছে। বারবার অভিযোগ করলেও স্থায়ীভাবে কোনো সমাধান করা হচ্ছে না।’ স্থানীয় বাসিন্দা নূর হোসেন সিদ্দিকী বলেন, তার বাড়ির আইপিএস, সাবমার্সিবল পাম্প, ফ্রিজ ও বৈদ্যুতিক মিটারসহ বিভিন্ন যন্ত্রপাতি একাধিকবার নষ্ট হয়েছে। মেরামত করার কিছুদিন পর আবারো একই সমস্যা দেখা দেয়। নুরে আলম সিদ্দিকী নামের আরেক বাসিন্দা বলেন, বিদ্যুতের ফ্ল্যাশিংয়ের কারণে তার কেনা একটি গরু মারা যায়। ক্ষতিপূরণ হিসেবে আংশিক অর্থ পেলেও বাকি অর্থ আর পাননি তিনি।

কেশরাব ও দক্ষিণপাড়া জামে মসজিদের ইমাম বলেন, ‘সামান্য বাতাস হলেই তারে তারে ঘষা লেগে আগুনের ফুলকি দেখা যায়। মসজিদের ডিজিটাল ঘড়ি, আইপিএস, ফ্যান ও মাইক নষ্ট হয়েছে কয়েকবার। স্কুল ও মক্তবে যাওয়া শিশুদের মধ্যেও আতঙ্ক কাজ করছে।’

রিকশাচালক ও মৎস্যচাষি আলামিনের দাবি, একাধিকবার বিদ্যুতের ফ্ল্যাশিংয়ের ঘটনায় তার চাষ করা মাছ মারা গেছে। এতে তিনি আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত এবং ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়েছেন।

এলাকাবাসীর অভিযোগ, বিদ্যুৎ লাইন নির্মাণে প্রয়োজনীয় নিরাপত্তাব্যবস্থা মানা হয়নি। কোথাও পর্যাপ্ত গ্রাউন্ডিং ব্যবস্থা নেই, নেই নিউট্রাল তার বা স্কাইওয়্যার। ফলে শটসার্কিট হলে উচ্চ ভোল্টেজের আগুন ও বিদ্যুৎ প্রবাহ সরাসরি আশপাশে ছড়িয়ে পড়ছে।

বাসিন্দাদের দাবি, বিষয়টি নিয়ে তারা একাধিকবার প্রশাসন ও কোম্পানি কর্তৃপক্ষকে অবহিত করেছেন। সেনাবাহিনী ও প্রশাসনের প্রতিনিধিরা পরিদর্শনের পর ঝুঁকি কমানোর আশ্বাস দেয়া হলেও কার্যকর কোনো ব্যবস্থাই নেয়া হয়নি।

গ্রামবাসীরা জানান, নিরাপদ জীবনযাপন নিশ্চিত করতে তারা বিভিন্ন সরকারি দফতরে স্মারকলিপি দিয়েছেন এবং দ্রুত লাইনটি নিরাপদ স্থানে স্থানান্তর অথবা প্রয়োজনীয় কারিগরি সংস্কারের দাবি জানিয়েছেন।

এ বিষয়ে রূপগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো: সাইফুল ইসলামের বক্তব্য জানার জন্য একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি।