হিমাগারে সংরক্ষণের জায়গা নেই আলু নিয়ে বিপাকে কৃষকরা

Printed Edition
দিনাজপুরের ফুলবাড়ীতে হিমাগারে আলু সংরক্ষণ করতে পারছেন না কৃষকরা : নয়া দিগন্ত
দিনাজপুরের ফুলবাড়ীতে হিমাগারে আলু সংরক্ষণ করতে পারছেন না কৃষকরা : নয়া দিগন্ত

শেখ সাবীর আলী ফুলবাড়ী (দিনাজপুর)

দিনাজপুর দক্ষিণ অঞ্চলের একমাত্র হিমাগার ফুলবাড়ী কোল্ডস্টোরেজে আলু সংরক্ষণের জায়গা না পেয়ে ছয় উপজেলার কৃষকরা এখন আলু নিয়ে চরম বিপাকে পড়েছেন। অপর দিকে আলু রাখতে তোড়জোড় চালাচ্ছেন স্থানীয় প্রভাবশালী একটি মহল।

দিনাজপুরের হাকিমপুর উপজেলার খট্টামাধবপুর ডাঙ্গাপড়া এলাকার কৃষক মোমিনুল ইসলাম এ বছর তিন বিঘা জমিতে আলুর আবাদ করেছেন। একটি ট্রাক্টরে করে ১৮ বস্তা আলু নিয়ে তিনি ফুলবাড়ী কোল্ডস্টোরেজে এসেছেন। সিরিয়ালের কোনো স্লিপ পাননি। আদৌ আলু হিমাগারে রাখতে পারবেন কি না তা নিয়ে চরম সংশয়ে রয়েছেন তিনি। জায়গা না পেলে হয়তো ফিরে যেতে হবে। এতে এক দিকে সময়ের অপচয় হচ্ছে, অন্য দিকে গুনতে হচ্ছে বাড়তি গাড়ি ভাড়া।

কৃষক মোমিনুল ইসলাম মতো এমন ভোগান্তিতে পড়েছেন একই এলাকার কৃষক এরশাদ আলী, ডাঙ্গাপাড়া এলাকার জাকিরুল ইসলাম, কবির হোসেন, পার্বতীপুরের ভবানীপুর এলাকার মো: নূরুন্নবীসহ অন্তত শতাধিক আলু চাষি।

সরেজমিনে দিনাজপুরের ফুলবাড়ী ক্লোল্ডস্টোরেজ এলাকা ঘুরে দেখা যায়, স্টোরেজের ভেতরে অন্তত শতাধিক ট্রাক্টর, ভটভটি ও ব্যাটারিচালিত ভ্যানভর্তি আলু নিয়ে হিমাগারে ঢোকানোর অপেক্ষায় রয়েছেন অনেক কৃষক। হিমাগারের ভেতরের অংশের পাশাপাশি ভেতরের ঢোকার অপেক্ষায় বাইরেও অবস্থান করছে অন্তত শতাধিক আলুর বস্তা ভর্তি ট্রাক্টর।

মোমনিুল ইসলাম বলেন, ‘আলুর গাড়িতে ঘুমাতে হচ্ছে। ড্রাইভার-হেলপারও নির্ঘুম রাত কাটাচ্ছেন। এবার আলুর ফলন ভালো হলেও দাম কম। ফলে পরবর্তী সময়ে ভালো দাম পেতে সবাই এখন হিমাগারে আলু রাখতে ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন।

কৃষকদের অভিযোগ, হিমাগারে আলুভর্তি করতে কৃষকদের চেয়ে ব্যবসায়ীদের বেশি প্রাধান্য দিচ্ছেন হিমাগার কর্তৃপক্ষ। অনৈতিক সুবিধা নিয়ে দ্রুত সিরিয়াল পেতে সহায়তা করছেন হিমাগারের কমিশন এজেন্টরা। যদিও এমন অভিযোগ অস্বীকার করছেন ফুলবাড়ী কোল্ড স্টোরেজের ব্যবস্থাপক মাহামুুদুল হাসান।

দিনাজপুর জেলার দক্ষিণ-পূর্বাংশের ফুলবাড়ী, পার্বতীপুর, বিরামপুর, নবাবগঞ্জ, হাকিমপুর ও ঘোড়াঘাট এই ছয় উপজেলার মধ্যে একটি মাত্র কোল্ডস্টোরেজ রয়েছে ফুলবাড়ীতে। মৌসুমের শুরু থেকেই হিমাগারের সামনে আলু বোঝাই গাড়ির দীর্ঘ সারি। কেউ উৎপাদিত আলু নিয়ে নিজে এসেছেন, কেউবা এজেন্টের মাধ্যমে পাঠিয়েছেন।

নবাবগঞ্জ উপজেলার আফতাবগঞ্জ এলাকার নারী কৃষক বিজলী রানী আগামী বছরে আবাদের জন্য বীজ হিসেবে ৫৫ কেজি ওজনের দুই বস্তা আলু নিয়ে এসেছেন হিমাগারে। সিরিয়াল পাননি তিনি।

হাকিমপুর উপজেলার লোহাচড়া ডাঙ্গাপাড়া এলাকার কৃষক নূরুন্নবী বলেন, যে পরিমাণ জমিতে আলু আবাদ করেছেন তার বেশির ভাগ আলু হাটবাজারে বিক্রি করে উৎপাদন খরচ মিটিয়েছেন। শুনেছেন এবার হিমাগারে জায়গা নেই, তারপরও এলাকার কয়েকজন কৃষক তিন ট্রাক্টরে ১২০ বস্তা (৫৫ কেজি ওজনের) আলু নিয়ে এসেছেন ফুলবাড়ী কোল্ড স্টোরেজে। গাড়ী ভাড়া দ্বিগুণ পড়েছে, তারপরও লাভের আশায় আলু রাখতে চান। কারণ এখন বাজারে আলুর দাম নিতান্তই কম।

ফুলবাড়ী উপজেলার পাকাপান গ্রামের কৃষক শাহজাহান আলী বলেন, চার বিঘা জমিতে আলুর আবাদ করেছি। ৫৫ কেজি ওজনের ২০ বস্তা আলু বীজ হিসেবে সংরক্ষণের জন্য মনস্থির করি। এজন্য হিমাগারের অবস্থা দেখতে এসেছি। কিন্তু আলুর গাড়িতে হিমাগার ঠাসাঠাসি অবস্থা দেখে তিনি হতাশ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন। আগামীতে আলুর বীজ কিনেই আবাদ করবেন এমনটাই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তিনি।

দিনাজপুর জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর সূত্রে জানা যায়, গত বছর জেলায় আলু আবাদ হয়েছিল ৪৫ হাজার ৮২৮ হেক্টর জমিতে। এবার সেখানে ৫৬ হাজার ৬৫১ হেক্টর জমিতে আলু আবাদ হয়েছে। আর উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ১১ লাখ ৩৫ হাজার ৬৪৯ মেট্রিক টন। এর মধ্যে ফুলবাড়ী উপজেলায়ই আলু আবাদ হয়েছে ১ হাজার ৮৭০ হেক্টর জমিতে। আর উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৪৫ হাজার ৮১৫ মেট্রিক টন।

ব্যবসায়ীদের প্রাধান্য দিয়ে হিমাগারে আলু ঢোকানো হচ্ছে এমন অভিযোগ অস্বীকার করে ফুলবাড়ী কোল্ড স্টোরেজের ব্যবস্থাপক মাহমুদুল হাসান বলেন, সর্বোচ্চ পর্যায়ে কৃষকদের অগ্রাধিকার দিয়েই আলু সংরক্ষণের ব্যবস্থা করা হচ্ছে। কোল্ড স্টোরেজের ধারণক্ষমতা ৬০ কেজি ওজনের এক লাখ ৬০ হাজার বস্তা। ইতোমধ্যে আলু সংগ্রহ ধারণ ক্ষমতা পূরণ হয়েছে। এরপরও কৃষকদের অনুরোধে হিমাগারের প্রাথমিক শিতলীকরন (অতিরিক্ত) জায়গায় কিছু বস্তা রাখার চেষ্টা করছি। জায়গার অভাবে উপায় না পেয়ে কৃষকদের ফেরত দিতে হচ্ছে।

দিনাজপুর জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের অতিরিক্ত উপ-পরিচালক (শস্য) মো: আনিছুজ্জামান বলেন, আলুর দাম কমে যাওয়ায় কৃষকদের পাশাপাশি আলু সংরক্ষণের দিকে ঝুঁকেছেন ব্যবসায়ীরাও। এতে করে প্রত্যেকটি হিমাগারের ওপর চাপ বেড়েছে। আলু সংরক্ষণের সক্ষমতা বাড়ানো গেলে আলুর আমদানি নির্ভরতা কমে আসবে। এতে কৃষকরা লাভবান হবেন।