প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ পদ খালি সত্ত্বেও শিক্ষার্থী ধরতে বিজ্ঞাপনের ফাঁদ

বেসরকারি বিশ^বিদ্যালয়ে সঙ্কটের ছায়া

Printed Edition

শাহেদ মতিউর রহমান

দেশের বেসরকারি বিশ^বিদ্যালয়গুলোতে এখনো শৃঙ্খলা ফেরেনি। নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ বিশ^বিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন তথা ইউজিসি থেকে বরাবরই নানারকম নিয়ম কানুনের ভয়ভীতি দেখালেও থোড়াই কেয়ার করে চলছে তারা। গুটি কয়েক প্রতিষ্ঠান নিজেদের সুনাম আর কৃতিত্ব ধরে রাখতে পারলেও অধিকাংশ বিশ^বিদ্যালয়ই মানদণ্ডের একেবারে নি¤œস্তরে অবস্থান করছে। সম্প্রতি এক জরিপে দেখা গেছে ইউজিসির তালিকাভুক্ত দেশের ১১৬টি বেসরকারি বিশ^বিদ্যালয়ের বেশির ভাগেরই ভিসি, প্রোভিসি এবং ট্রেজারার পদের তিনটি শীর্ষ পদই খালি। আবার কোনো কোনো প্রতিষ্ঠানে ভিসি আছে তো প্রোভিসি ও ট্রেজারার নেই। ফলে প্রশাসনিক এবং আর্থিক নানা ধরনের অনিয়ম আর দুর্নীতির অভিযোগও হরহামেশাই আসছে।

সর্বশেষ ৫ এপ্রিল ২০২৬ ইউজিসি থেকে যে তালিকা প্রকাশ করা হয়েছে সেখানে ১১৬টি বেসরকারি বিশ^বিদ্যালয়ের মধ্যে শীর্ষ পর্যায়ের ১৭৬ পদই ফাঁকা। এর মধ্যে ৩৪টি বেসরকারি বিশ^বিদ্যালয়ে ভিসি নেই। ৯৫টি বিশ^বিদ্যালয়ে প্রোভিসি নেই এবং ৪৬টি প্রতিষ্ঠানে নেই ট্রেজারার। ফলে বেসরকারি বিশ^বিদ্যালয়ে চলমান সঙ্কটের ছায়া আরো ঘনীভূত হচ্ছে। অন্যদিকে বিগত আওয়ামী লীগের সরকারের আমলে এসব প্রতিষ্ঠান কোনো ধরনের আইনকানুনকেও তোয়াক্কা করেনি। বরং কিছু কিছু প্রতিষ্ঠান নিজেদের কর্তৃত্ব ধরে রাখতে তারা ভালো মানের প্রতিষ্ঠানগুলোতে নানাভাবে দখল বা নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করেছে। ইউজিসির দৃষ্টিতে যেসব প্রতিষ্ঠান মানের সর্বনি¤œস্তরে রয়েছে তারাও নানা রকম চটকদার বিজ্ঞাপন দিয়ে শিক্ষার্থীদের ফাঁদে ফেলে ভর্তির জন্য টানছে।

দীর্ঘ দিন থেকেই দেশের বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় খাতে একের পর এক অনিয়ম, প্রশাসনিক সঙ্কট এবং আইন লঙ্ঘনের অভিযোগ সামনে আসছে। প্রকাশিত বিভিন্ন তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, অনেক বিশ্ববিদ্যালয় অনুমোদনবিহীন ক্যাম্পাস পরিচালনা, স্থায়ী ক্যাম্পাসে না যাওয়া, ভিসিবিহীন শিক্ষাকার্যক্রম পরিচালনা এবং ট্রাস্টি বোর্ডের দ্বন্দ্বে জর্জরিত। এতে শিক্ষার মান ও সনদের গ্রহণযোগ্যতা নিয়েই উদ্বেগ বাড়ছে।

এদিকে ইউজিসিতে আসা অভিযোগের প্রেক্ষিতে শিক্ষার্থী এবং অভিভাবকদের সতর্ক করতে গণবিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে সংস্থাটি। ইউজিসির প্রকাশিত সম্প্রতি এক গণবিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, দেশের অন্তত ৩০ থেকে ৪০টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে নানা ধরনের প্রশাসনিক ও একাডেমিক সমস্যা রয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানের মধ্যে কয়েকটিতে ট্রাস্টি বোর্ডের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব, কয়েকটি আদালতের স্থগিতাদেশের মধ্যে পরিচালিত হচ্ছে এবং কিছু বিশ্ববিদ্যালয় অনুমোদন ছাড়া অতিরিক্ত শিক্ষাকার্যক্রম চালাচ্ছে। এমনকি কোনো কোনো প্রতিষ্ঠানের ক্যাম্পাসও অনুমোদিত নয়। শুধু তাই নয়, ইউজিসি বিভিন্ন সময়ে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের সতর্ক করে জানিয়েছে যে, কিছু বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হলে শিক্ষার্থীরা ভবিষ্যতে সনদসংক্রান্ত জটিলতায় পড়তে পারেন। ২০২৪ সালে এ রকম ৩৫টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় সম্পর্কে সতর্কতা জারি করা হয়। এর মধ্যে ৩০টির ভিসি রাষ্ট্রপতির মাধ্যমে নিয়োগপ্রাপ্ত ছিলেন না। ফলে এসব প্রতিষ্ঠানের সনদে বৈধ স্বাক্ষরকারী কর্তৃপক্ষ নিয়ে প্রশ্ন দেখা দেয়।

ইউজিসির দেয়া তথ্যমতে, বর্তমানে ভিসি নেই এমন বিশ^বিদ্যালয়ের তালিকায় রয়েছে ইউনিভার্সিটি অব এশিয়া প্যাসিফিক, দি পিপল’স ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ, এশিয়ান ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ, বিজিসি ট্রাস্ট ইউনিভার্সিটি, বাংলাদেশ (চট্টগ্রাম), সাউদার্ন ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ, ওয়ার্ল্ড ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ, ভিক্টোরিয়া ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ, রয়েল ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ, অতীশ দীপঙ্কর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ^বিদ্যালয় (২২ জানুয়ারি ২৬ থেকে শূন্য), নর্থ ওয়েস্টার্ন ইউনিভার্সিটি (ভিসি পদত্যাগ করেছেন), ফারইস্ট ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি, রাজশাহী সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি ইউনিভার্সিটি, ব্রহ্মপুত্র ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি, আর পি সাহা বিশ^বিদ্যালয় (নারায়ণগঞ্জ), সিসিএন বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিত বিশ^বিদ্যালয়, কমিল্লা, নর্দার্ন ইউনিভার্সিটি অব বিজনেস অ্যান্ড টেকনোলজি খুলনা (ছয় বছর ধরে ভিসি নেই), রবীন্দ্র মৈত্রী বিশ^বিদ্যালয় কুষ্টিয়া, সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি, রূপায়ণ এ কে এম শামসুজ্জোহা বিশ^বিদ্যালয় নারায়ণগঞ্জ, খুলনা খান বাহাদুর আহছান উল্লাহ বিশ^বিদ্যালয় (ভিসি পদত্যাগ করেছেন), ইউনিভার্সিটি অব স্কিল এনরিচমেন্ট অ্যান্ড টেকনোলজি, মাইক্রোল্যান্ড ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি, ডা: মমতাজ বেগম ইউনিভার্সিটি অব বিজনেস অ্যান্ড টেকনোলজি কিশোরগঞ্জ, লালন বিজ্ঞান ও কলা বিশ^বিদ্যালয় কুষ্টিয়া।

অন্যদিকে দেশের ২১টি বিশ^বিদ্যালয়ে ভিসি প্রোভিসি এবং ট্রেজারারের সব পদই খালি রয়েছে। ইউজিসির তালিকায় এমন বিশ^বিদ্যালয়ের সংখ্যা ২১টি। শীর্ষ তিনটি পদ শূন্য এমন প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে রয়েছে দি পিপল’স ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ, এশিয়ান ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ, সাউদার্ন ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ, ওয়ার্ল্ড ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ, ভিক্টোরিয়া ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ, রয়েল ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ, অতীশ দীপঙ্কর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ^বিদ্যালয়, রূপায়ণ এ কে এম শামসুজ্জোহা বিশ^বিদ্যালয় নারায়ণগঞ্জ, রবীন্দ্র মৈত্রী বিশ^বিদ্যালয় কুষ্টিয়া, খুলনা খান বাহাদুর আহছান উল্লাহ বিশ^বিদ্যালয়, ইউনিভার্সিটি অব স্কিল এনরিচমেন্ট অ্যান্ড টেকনোলজি, মাইক্রোল্যান্ড ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি, ডা: মমতাজ বেগম ইউনিভার্সিটি অব বিজনেস অ্যান্ড টেকনোলজি কিশোরগঞ্জ, লালন বিজ্ঞান ও কলা বিশ^বিদ্যালয় কুষ্টিয়াসহ আরো বেশ কিছু প্রতিষ্ঠানও রয়েছে এই তালিকায়। বিশেষজ্ঞদের মতে, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা দ্রুত বাড়লেও সব প্রতিষ্ঠানে মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি। অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ে পর্যাপ্ত সংখ্যক যোগ্য শিক্ষক নেই, গবেষণাকার্যক্রম সীমিত এবং অবকাঠামোগত ঘাটতি প্রকট। ফলে শিক্ষার্থীরা উচ্চ ফি দিয়েও কাক্সিক্ষত শিক্ষা পাচ্ছেন না। এ অবস্থায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার মূল উদ্দেশ্য, উচ্চশিক্ষার সম্প্রসারণ ও আন্তর্জাতিক মান নিশ্চিত করা ব্যাহত হচ্ছে।

আবার ইউজিসি অনিয়মের বিরুদ্ধে নজরদারি জোরদার করেছে। বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তথ্য সংগ্রহ, পরিদর্শন দল গঠন এবং আইন লঙ্ঘনের অভিযোগ তদন্তের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। অনিয়ম প্রমাণিত হলে ভর্তি স্থগিত, সতর্কতা জারি কিংবা অন্যান্য প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে। শিক্ষাবিদদের মতে, কেবল শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নয়, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর জবাবদিহি নিশ্চিত করতে দীর্ঘমেয়াদি সংস্কার প্রয়োজন। ট্রাস্টি বোর্ডের স্বচ্ছতা, শিক্ষক নিয়োগে মানদণ্ড, গবেষণায় বিনিয়োগ এবং নিয়মিত একাডেমিক মূল্যায়ন নিশ্চিত না হলে উচ্চশিক্ষার মান আরো ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। উচ্চশিক্ষা বিশ্লেষকদের মতে, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় খাতে সবচেয়ে বড় সঙ্কট হলো সুশাসনের ঘাটতি। অনেক প্রতিষ্ঠানে ট্রাস্টি বোর্ড ও প্রশাসনের মধ্যে দ্বন্দ্ব, শিক্ষক নিয়োগে স্বচ্ছতার অভাব এবং মানসম্মত গবেষণাকার্যক্রমের দুর্বলতা রয়েছে। ফলে শিক্ষার গুণগত মান প্রশ্নের মুখে পড়ছে। একই সাথে আন্তর্জাতিক মানের উচ্চশিক্ষা নিশ্চিত করার লক্ষ্যও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।