নিজস্ব প্রতিবেদক
রাজধানীর আদাবরে চাঁদাবাজির অভিযোগ ঘিরে একটি এমব্রয়ডারি কারখানায় সশস্ত্র হামলার পর উত্তাল হয়ে ওঠে পরিস্থিতি। শ্রমিকদের ওপর সামুরাই, চাপাতি ও ছুরি নিয়ে হামলার ঘটনায় দু’জন গুরুতর জখম হন। এর জেরে মধ্যরাতে থানায় অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভ করেন শ্রমিকরা। জানা গেছে, ২০২৪ সালের পর কারখানায় চাঁদাবাজির জন্য যায় সন্ত্রাসীরা। কিন্তু চাঁদা না পেয়ে বেপরোয়া হয়ে ওঠে। শনিবার রাতে ৮ থেকে ১০ জন কারখানায় শ্রমিকদের উন্মাদের মতো মারধর করে কুপিয়ে মোবাইল ফোন ছিনিয়ে নেয় সন্ত্রাসীরা। পুলিশ অভিযান চালিয়ে প্রধান আসামিসহ পাঁচজনকে গ্রেফতার করার পর তারা পুলিশের কাছে স্বীকার করে মূলত চাঁদাবাজির জন্যই তারা কারখানায় গিয়ে হামলা চালায়।
গতকাল আদাবর থানার ওসি আব্দুল মালেক নয়া দিগন্তকে বলেন, কারখানার মালিক মুস্তাফিজুর রহমান আটজনের নাম উল্লেখ করে এবং অজ্ঞাত ৮ থেকে ১০ জনকে আসামি করে মামলা করেছেন। এখন পর্যন্ত পাঁচজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। অন্যদের গ্রেফতারের জন্য অভিযান চলমান রয়েছে।
পুলিশ জানায়, মুনসুরাবাদ ১২ নম্বর সড়কে অবস্থিত কারখানাটিতে শনিবার রাত পৌনে ১০টার দিকে কাজ শেষে বের হওয়া শ্রমিকদের কাছ থেকে মোবাইল ফোন ও নগদ টাকা ছিনিয়ে নেয়ার চেষ্টা করে অভিযুক্তরা। আতঙ্কে শ্রমিকরা কারখানায় ফিরে গেলে হামলাকারীরা সামুরাই, চাপাতি ও ছুরি নিয়ে ভেতরে ঢুকে আবারো টাকা-পয়সা ও মোবাইল ছিনিয়ে নেয়ার চেষ্টা করে। এ সময় শ্রমিক তোফায়েল ও হাফিজ আহমেদ বাধা দিলে তাদের কুপিয়ে জখম করা হয়। পরে হামলাকারীরা ভয়ভীতি দেখিয়ে পালিয়ে যায়। আহত দু’জনকে তাৎক্ষণিক হাসপাতালে পাঠানো হয়।
ঘটনার বিচার দাবিতে মধ্যরাতে শ্রমিকরা আদাবর থানা ঘেরাও করে বিক্ষোভ করেন। পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে উঠলে পুলিশ অভিযান চালিয়ে প্রধান আসামি রোহান খান রাসেল (৩০), মারুফ (৩৫), হাসান (২৩), মো: রায়হান (২২) ও মো: রোমানকে (২৪) গ্রেফতার করে।
আসামিদের কারাগারে আটক রাখার আবেদনে বলা হয়, আসামি রোহান খান রাসেল আদাবর থানাধীন সুনিবিড় হাউজিং সোসাইটি ও শ্যামলী হাউজিং দ্বিতীয় প্রকল্প বালুর মাঠ এলাকায় কিশোর গ্যাং গ্রুপ পরিচালনা করেন। তিনি এলাকায় ত্রাসের রাজ্য প্রতিষ্ঠিত করে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটান। এলাকার লোকজন তাদের গ্রুপের সদস্যদের ভয়ে থাকেন।
পুলিশ ও স্থানীয় লোকজন জানান, নির্বাচনের পর হঠাৎ মোহাম্মদপুর আদাবর এলাকায় রাসেল ও তার দলের সদস্যদের উৎপাত বেড়েছে। তাদের নেতৃত্বে বিভিন্ন সড়কে ছিনতাই ও চাঁদাবাজি হচ্ছে। বিশেষ করে এই এলাকার মুনসুরাবাদ হাউজিংয়ের এমব্রয়ডারি কারখানা শ্রমিকদের কাছ থেকে মুঠোফোন ও টাকা ছিনতাই করে নিয়ে যান তারা। আবির এমব্রয়ডারি কারখানার দুই শ্রমিকের কাছ থেকে তিনটি মুঠোফোন ছিনতাই করেন তারা।
এ সময় তাদের বাধা দিতে গেলে মো: তোফায়েল (২৮) ও হাফিজ আহমেদ (৪৪) নামের দুই কর্মচারীকে কুপিয়ে গুরুতর জখম করেন তারা। পরে আহত দু’জনকে জাতীয় অর্থোপেডিক হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।
আবির এমব্রয়ডারি কারখানার মালিক ও আদাবরের এমব্রয়ডারি কারখানা মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, কালা রাসেলের ছিনতাই ও চাঁদাবাজিতে তারা অতিষ্ঠ। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর থেকে তার কারখানায় চাঁদা দাবি করে আসছেন রাসেল। চাঁদা না পেয়ে কারখানার শ্রমিকদের কাছ থেকে টাকা ও মুঠোফোন ছিনতাই করে নেন। সর্বশেষ শনিবার আবার ছিনতাই করতে এলে শ্রমিকরা একজোট হয়ে তাদের ধাওয়া দেন। এ সময় তারা দু’জনকে কুপিয়ে জখম করেন। মোহাম্মদপুর অঞ্চলের অতিরিক্ত উপকমিশনার (এডিসি) জুয়েল রানা গতকাল নয়া দিগন্তকে বলেন, ছয় মাস ধরে পুলিশের তৎপরতার কারণে ছিনতাইকারী চক্রের সদস্যরা নিশ্চুপ ছিলেন। রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ও আসন্ন ঈদকে সামনে রেখে আবার মাথাচাড়া দেয়ার চেষ্টা করছে। পুলিশের সাঁড়াশি অভিযান চলছে।
এদিকে মোহাম্মদপুর, আদাবরসহ রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় চাঁদা দাবি করে সন্ত্রাসী গ্রুপ। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে চাঁদাবাজি ও ছিনতাইয়ের ঘটনাসহ বেশ কিছু ভিডিও ভাইরাল হয়েছে। ভিডিওতে দেখা গেছে, চাঁদা না দেয়ায় একটি সিএনজি অটোরিকশার সামনের গ্লাস সম্পূর্ণ ভেঙে ফেলা হয়। আরেকটি ভিডিওতে দেখা গেছে আদাবরে একটি দোকানে গিয়ে চাঁদা চাইছে সন্ত্রাসীরা। চাঁদা না দেয়ায় দোকান মালিক ও কর্মচারীদের মারধর করে পুরো মার্কেট বন্ধ করার হুমকি দিয়ে আসে। পরে দোকান মালিক তার অসহায় হয়ে দোকান বন্ধ করে দেয়।


