ডাকসু সংগ্রহশালায় জিন্নাহর ছবি ঘিরে আলোচনা-সমালোচনা, ভাঙচুর

জিন্নাহর ছবি গৌরবের নয়, বাংলা ভাষাবিরোধী অবস্থান তুলে ধরতেই রাখা হয়েছে : ডাকসু

Printed Edition

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি

সংস্কারের পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) ভবনের সংগ্রহশালায় বাংলাদেশের ভাষা আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ, স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন, বিভিন্ন গণ-আন্দোলন এবং জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের ইতিহাসের নানা স্মারক স্থান পেয়েছে। এর পাশাপাশি পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠাতা মুহাম্মদ আলী জিন্নাহর তিনটি ছবি প্রদর্শনকে কেন্দ্র করে নতুন করে আলোচনা তৈরি হয়েছে। ডাকসুর পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, জিন্নাহর ছবি কোনোভাবেই তাকে গৌরবান্বিত করার জন্য নয়; বরং বাংলা ভাষার বিরুদ্ধে তার অবস্থান ও ভাষা আন্দোলনের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট তুলে ধরতেই ছবিগুলো রাখা হয়েছে।

গত রোববার দুপুরে ডাকসু ভবনের নিচতলায় সংস্কার করা সংগ্রহশালার উদ্বোধন করেন ডাকসুর মুক্তিযুদ্ধ ও গণতান্ত্রিক আন্দোলনবিষয়ক সম্পাদক ফাতিমা তাসনিম জুমা। এ সময় ডাকসুর ভিপি সাদিক কায়েম, জিএস এস এম ফরহাদসহ অন্য নেতারা উপস্থিত ছিলেন।

সংগ্রহশালায় প্রবেশ করতেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মুক্তিযুদ্ধে শহীদ ১৯৫ জন শিক্ষক, কর্মকর্তা-কর্মচারী ও শিক্ষার্থীর তালিকা রয়েছে। পাশাপাশি বিভিন্ন সময়ের ডাকসু নেতাদের তথ্য, গুরুত্বপূর্ণ নথি, পত্রিকার কাটিং এবং নানা ঐতিহাসিক আলোকচিত্র রাখা হয়েছে। মুক্তিযুদ্ধ ও গণ-আন্দোলনের পাশাপাশি সাম্প্রতিক সময়ের বিভিন্ন ছাত্র আন্দোলনের ঘটনাও এতে তুলে ধরা হয়েছে।

সংগ্রহশালার বড় একটি অংশজুড়ে রয়েছে গত কয়েক দশকের গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ও সামাজিক ঘটনাপ্রবাহ। সেখানে পিলখানা হত্যাকাণ্ড, বিশ্বজিৎ হত্যাকাণ্ড, আবরার ফাহাদ হত্যাকাণ্ড, গণরুম ও গেস্টরুম সংস্কৃতি, মোদি-বিরোধী আন্দোলন, ২৮ অক্টোবরের ঘটনা, শাপলা চত্বর এবং জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের বিভিন্ন ছবি ও নথি স্থান পেয়েছে। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে রাষ্ট্রস্বীকৃত শহীদদের তালিকাও সেখানে সংরক্ষণ করা হয়েছে।

জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের ভূমিকা এবং পরবর্তী সময়ে ডাকসুর বিভিন্ন কার্যক্রমেরও আলাদা উপস্থাপন রয়েছে। আন্দোলনে আহত শিক্ষার্থী ও বিভিন্ন পর্যায়ের গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তের ছবি, জুলাই-পরবর্তী ডাকসুর প্রকাশনা, সাম্প্রতিক পত্রিকা ও বই সেখানে রাখা হয়েছে। ইতিহাসকে শুধু লিখিত বা দৃশ্যমান উপকরণে সীমাবদ্ধ না রেখে বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন মানুষের কাছে সহজলভ্য করার উদ্যোগও নেয়া হয়েছে। এর অংশ হিসেবে গণরুম ও গেস্টরুম সংস্কৃতি নিয়ে প্রকাশিত একটি বইয়ের ব্রেইল সংস্করণ রাখা হয়েছে।

মুক্তিযুদ্ধের জন্য রয়েছে আলাদা অংশ। সেখানে সাত বীরশ্রেষ্ঠ, মুক্তিযুদ্ধের ১১ সেক্টরের কমান্ডার, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাথে সম্পৃক্ত বীরশ্রেষ্ঠ মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীর ও বীরউত্তমদের ছবি রয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ও মুক্তিযোদ্ধা মেজর হাফিজ উদ্দিন আহমেদের ছবিও রাখা হয়েছে।

এ ছাড়া মুক্তিযুদ্ধের সময়ের বিভিন্ন দুর্লভ ছবি রয়েছে সংগ্রহশালায়। মুক্তিযোদ্ধাদের নামাজ পড়ার দৃশ্য, রাজাকারদের আটক করার ছবি, নারী মুক্তিযোদ্ধা রুবি ও সিতারা বেগমের ছবি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী রুমি ও ক্রিকেটার জুয়েলের ছবি রয়েছে। ১৪ ডিসেম্বর শহীদ বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ড এবং ১৬ ডিসেম্বর বিজয়ের ঐতিহাসিক মুহূর্তের ছবিও স্থান পেয়েছে।

ভাষা আন্দোলনের ইতিহাসও গুরুত্বের সাথে উপস্থাপন করা হয়েছে। রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে আন্দোলনের বিভিন্ন স্মারক, তমদ্দুন মজলিসের স্মৃতি, ভাষাশহীদদের প্রতিকৃতি এবং প্রথম শহীদ মিনারের ছবি রাখা হয়েছে। ঐতিহাসিক আমতলার বিখ্যাত আমগাছের একটি অংশও সংরক্ষণ করা হয়েছে। মাহবুব উল আলম চৌধুরীর ‘কাঁদতে আসিনি, ফাঁসির দাবি নিয়ে এসেছি’ কবিতা এবং ভাষা আন্দোলনের অন্যতম সংগঠক পিয়ারু সরদারের ছবিও রয়েছে।

এ অবস্থায় সংগ্রহশালায় মুহাম্মদ আলী জিন্নাহর তিনটি ছবি প্রদর্শন নিয়ে বিতর্ক দেখা দেয়। এর একটি ১৯৪৮ সালের ২১ মার্চ তৎকালীন রেসকোর্স ময়দানের অনুষ্ঠানের ছবি, যেখানে জিন্নাহ পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা উর্দু করার ঘোষণা দিয়েছিলেন। আরেকটি ১৯৪০ সালের লাহোরে নিখিল ভারত মুসলিম লীগের সম্মেলনের গ্রুপ ছবি, যেখানে এ কে ফজলুল হকের লাহোর প্রস্তাবের সময় জিন্নাহকেও দেখা যায়। তৃতীয়টি ১৯৭০ সালের নির্বাচনসংক্রান্ত ডন পত্রিকার একটি পেপার কাটিং।

ডাকসুর জিএস এস এম ফরহাদ বলেন, জিন্নাহর ছবি প্রদর্শনের উদ্দেশ্য তাকে গৌরবান্বিত করা নয়, বরং ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় তুলে ধরা। তার ভাষ্য, জিন্নাহ সরাসরি বাংলা ভাষার বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছিলেন এবং সেই অবস্থানই পরবর্তী ভাষা আন্দোলনের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটের অন্যতম অংশ। ফলে ছবির সাথে তার বক্তব্যের ক্যাপশনও দেয়া হয়েছে, যাতে দর্শক ঐতিহাসিক বিষয়টি বুঝতে পারেন।

ফরহাদ আরো বলেন, ছবিটি সরিয়ে ফেললে জিন্নাহর বাংলা ভাষাবিরোধী অবস্থানের বিষয়টিই বরং আড়াল হয়ে যেতে পারে। তার মতে, ইতিহাসে বিতর্কিত ব্যক্তি বা ঘটনার উল্লেখ করা আর সেই ব্যক্তি বা ঘটনাকে সমর্থন করা এক বিষয় নয়। সংগ্রহশালায় জিন্নাহর ছবি রাখার ক্ষেত্রে ডাকসু পক্ষপাত নয়, বরং ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট তুলে ধরার চেষ্টা করেছে।

তবে গতকাল সোমবার দুপুরে ডাকসু সংগ্রহশালায় গিয়ে জিন্নাহর একটি ছবির ফ্রেম ভেঙে ছবি ছিঁড়ে ফেলেন আবু তৈয়ব হাবিলদার নামে এক সাবেক শিক্ষার্থী। তিনি ডাকসু নির্বাচনে সহসভাপতি প্রার্থী ছিলেন এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০০১-০২ শিক্ষাবর্ষের উর্দু বিভাগের শিক্ষার্থী ছিলেন।

ছবি ছিঁড়ে ফেলার আগে তৈয়ব বলেন, জিন্নাহ কার্জন হলে রাষ্ট্রভাষা উর্দু করার কথা বলেছিলেন এবং এর প্রতিবাদে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা আন্দোলন করেছিলেন। তার দাবি, এমন ব্যক্তির ছবি ডাকসু সংগ্রহশালায় রাখা উচিত নয়।

এরপর ফাতিমা তাসনিম জুমা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেয়া এক পোস্টে তিনটি ছবির বিষয়ে ব্যাখ্যা দেন। তিনি বলেন, প্রথম ছবিটি জিন্নাহর একক প্রতিকৃতি নয়; এটি ১৯৭০ সালের পাকিস্তানের প্রথম জাতীয় নির্বাচনসংক্রান্ত একটি পেপার কাটিং। দ্বিতীয় ছবিটি ১৯৪০ সালের লাহোর প্রস্তাবের সময়কার গ্রুপ ছবি, যেখানে এ কে ফজলুল হকের সাথে জিন্নাহকেও দেখা যায়। তৃতীয় ছবির ক্যাপশনেই জিন্নাহর বাংলা ভাষার বিরুদ্ধে অবস্থানের বিষয়টি উল্লেখ রয়েছে বলে জানান তিনি।

জুমার ভাষ্য, ছবিগুলোকে গৌরবের প্রতীক হিসেবে দেখানোর অভিযোগ বাস্তবতার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়, বরং কোনো ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে জিন্নাহর অবস্থান ভাষা আন্দোলনের পথ তৈরি করেছিল, সেটি বোঝানোর জন্যই সংশ্লিষ্ট ছবি ও ক্যাপশন রাখা হয়েছে।

এ দিকে জিন্নাহর ছবি সরানোর দাবি জানিয়েছিল ছাত্রদল। এর আগে সংগঠনটি ২৪ ঘণ্টার আলটিমেটাম দেয়। এ বিষয়ে ফরহাদ বলেন, জিন্নাহর ছবি সরিয়ে নেয়ার দাবি ইতিহাসের একটি অংশকে আড়াল করার ঝুঁকি তৈরি করবে। তিনি ছাত্রদলের অবস্থানকে জিন্নাহর পক্ষ নেয়ার সাথে তুলনা করেন।

সংগ্রহশালায় শুধু জিন্নাহ নয়, আবদুল হামিদ খান ভাসানী, এ কে ফজলুল হক, হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কাজী নজরুল ইসলাম, এম এ জি ওসমানী, নবাব সলিমুল্লাহ, জিয়াউর রহমান ও খালেদা জিয়াসহ বিভিন্ন সময়ের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্বের ছবি রয়েছে। ১৯৭১ থেকে ১৯৭৫ সালের সময়ের কিছু ছবি ও পেপার কাটিংয়ে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের উপস্থিতিও রয়েছে। পাশাপাশি মুক্তিযুদ্ধের একটি খোদাইচিত্রে তার উপস্থিতি দেখা যায়।

১৯৭১-৮১ সময়ের অংশে শেখ মুজিবুর রহমানের দুই ছেলের বিয়ের ছবি এবং তাকে নিয়ে প্রকাশিত তিনটি পেপার কাটিং রয়েছে। ১৯৭৪ সালের দুর্ভিক্ষের ছবিও রাখা হয়েছে। একই অংশে জিয়াউর রহমানের সময়ের খাল খননের দৃশ্য, জিয়াউর রহমান ও খালেদা জিয়ার ছবি, মুক্তিযুদ্ধকালীন জিয়াউর রহমানের দু’টি ছবি এবং ১৯৭৮ সালের রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ব্যালট পেপারের ছবি রয়েছে।

এরশাদ সরকারের সময়ের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের ১৪টি স্থিরচিত্রও রয়েছে। এর মধ্যে শহীদ নূর হোসেনের শরীরে ‘স্বৈরাচার নিপাত যাক, গণতন্ত্র মুক্তিপাক’ লেখা ঐতিহাসিক ছবিটি অন্যতম। ১৯৮২ থেকে ১৯৯০ সাল পর্যন্ত স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে শহীদদের তালিকা এবং শহীদ আসাদকে গুলিবিদ্ধ অবস্থায় হাসপাতালে নেয়ার ছবিও রাখা হয়েছে।

২০০৯ থেকে ২০২৪ সালের সময়কেও আলাদা অংশে তুলে ধরা হয়েছে। আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ের বিভিন্ন আন্দোলন, ২০১৩ সালের শাহবাগ আন্দোলন, হেফাজতে ইসলামের আন্দোলন, আবরার ফাহাদ ও সানি হত্যাকাণ্ড, ২০২০ সালের মোদি-বিরোধী আন্দোলন এবং জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের নানা ছবি ও নথি এতে স্থান পেয়েছে।

এ দিকে ডাকসুর এসব কর্মকাণ্ড নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন আপত্তি জানিয়েছে। গতকাল জনসংযোগ দফতরের উপপরিচালক ফররুখ মাহমুদ স্বাক্ষরিত এক বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, ডাকসুর কয়েকটি কর্মকাণ্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন, বিধি ও প্রশাসনিক কাঠামোর সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। অনুমোদন ছাড়া ‘নির্ভীক জুলাই’ নামে স্মৃতিস্তম্ভ স্থাপন এবং শিক্ষক মূল্যায়নের জন্য পৃথক ওয়েবসাইট চালুর বিষয়েও আপত্তি জানানো হয়।

জিন্নাহ ও তৎকালীন ছাত্রসঙ্ঘের নেতা আব্দুল মালেকের ছবি প্রদর্শনের বিষয়েও প্রশাসন আপত্তি জানিয়ে বলেছে, ভাষা আন্দোলন ও বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাসের সাথে সাংঘর্ষিক ব্যক্তিদের ছবি সংগ্রহশালায় প্রদর্শন গ্রহণযোগ্য নয়। সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেয়ার কথাও জানিয়েছে প্রশাসন।

তবে ডাকসুর পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, সংগ্রহশালার উদ্দেশ্য কোনো ব্যক্তি বা রাজনৈতিক পক্ষকে গৌরবান্বিত করা নয়; বরং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের নানা পর্যায়কে দলিল, ছবি, পত্রিকার কাটিং ও স্মারকের মাধ্যমে তুলে ধরা। তাদের মতে, ইতিহাসের বিতর্কিত অধ্যায়গুলো বাদ দিলে ইতিহাস পূর্ণাঙ্গভাবে উপস্থাপন করা সম্ভব নয়। তাই জিন্নাহর মতো বিতর্কিত ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্বের ছবি তার বক্তব্য ও প্রেক্ষাপটসহ প্রদর্শন করাকে ইতিহাস সংরক্ষণের অংশ হিসেবেই দেখছে ডাকসু।

ডাকসুর বিভিন্ন কর্মকাণ্ড নিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের বক্তব্য

বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) সংক্রান্ত বেশ কয়েকটি সংবাদ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের দৃষ্টিগোচর হয়েছে। এসব সংবাদ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রচলিত আইন, বিধি, নীতিমালা ও প্রশাসনিক কাঠামোর সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের অবস্থান সুস্পষ্ট ও দ্ব্যর্থহীন।

ঢাকা বিশ^বিদ্যালয় প্রশাসন জুলাই গণ-অভ্যুত্থানকে ধারণ ও লালন করে। এরই ধারাবাহিকতায় গত ৫ আগস্ট জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের স্মৃতি সংরক্ষণের লক্ষ্যে বিশ^বিদ্যালয়ের মলচত্বরে জুলাই স্মৃতিস্তম্ভের ভিত্তিপ্রস্তর উদ্বোধন করা হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য, বিশ্ববিদ্যালয় পরিবার ও শহীদ পরিবারের সদস্যদের নিয়ে এটি উদ্বোধন করেন।

উযধশধ টহরাবৎংরঃু ঙৎফবৎ, ১৯৭৩ এর অনুচ্ছেদ ২৪(এ) অনুযায়ী বিশ^বিদ্যালয়ের সম্পত্তি তদারকি, রক্ষণাবেক্ষণ ও নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব সিন্ডিকেটের ওপর ন্যস্ত। অন্য দিকে উযধশধ টহরাবৎংরঃু ঙৎফরহধহপবং ধহফ জবমঁষধঃরড়হং এর ঈযধঢ়ঃবৎ ঢওঠ এর ধারা ৪-এর নোট অনুযায়ী বিশ^বিদ্যালয়ের ছাত্র সংসদ যেকোনো সিদ্ধান্ত বিশ^বিদ্যালয়ের উপাচার্যের নির্দেশনাসাপেক্ষে নেবেন।

কিন্তু ঢাকা বিশ^বিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) ‘নির্ভীক জুলাই’ নামে কলাভবনসংলগ্ন ডাকসু ভবনের পশ্চিম পাশে ও কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের সামনে যে স্মৃতিস্তম্ভ স্থাপন করেছে, তা সিন্ডিকেট কিংবা বিশ^বিদ্যালয়ের উপাচার্যের কোনোরূপ অনুমতি বা আলোচনা করে স্থাপন করেনি; যা বিশ^বিদ্যালয়ের নিজস্ব আইনানুযায়ী এখতিয়ারবহির্ভূত।

ডাকসু সংগ্রহশালায় পাকিস্তানের তৎকালীন গভর্নর জেনারেল মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ এবং তৎকালীন ছাত্রসঙ্ঘের নেতা আব্দুল মালেকের ছবি প্রদর্শনের বিষয়টিও বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের দৃষ্টিগোচর হয়েছে। ভাষা আন্দোলন ও বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাসের সাথে সাংঘর্ষিক এমন ব্যক্তিদের ছবি বিশ্ববিদ্যালয়ের সংগ্রহশালায় প্রদর্শন কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রচলিত বিধিবিধান অনুযায়ী সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে কঠোর প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

এ ছাড়া ডাকসুর পক্ষ থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের মূল্যায়নের জন্য অনুমোদন ছাড়া ওয়েবসাইট চালু করা হয়েছে, যা বিশ্ববিদ্যালয়ের নীতিমালা ও প্রাতিষ্ঠানিক প্রক্রিয়ার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। শিক্ষক মূল্যায়ন বিশ্ববিদ্যালয়ের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একাডেমিক ও প্রাতিষ্ঠানিক বিষয়। এ ক্ষেত্রে কোনো ব্যক্তি, সংগঠন বা ছাত্র সংসদ নিজেদের উদ্যোগে পৃথক মূল্যায়ন ব্যবস্থা চালু করতে পারে না। একই সাথে এই ওয়েবসাইট চালু করে শিক্ষকদের ব্যক্তিগত তথ্যও বাইরে আনা হয়েছে; যা আইন অনুযায়ী শাস্তিমূলক অপরাধ।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ঞবধপযরহম ঊাধষঁধঃরড়হ-এর জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব নীতিমালা রয়েছে এবং তা বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ পর্যায়ে অনুমোদিত হয়েছে; যা বাস্তবায়নের পথে। ফলে অনুমোদিত নীতিমালার বাইরে গিয়ে পৃথক কোনো শিক্ষক মূল্যায়ন ব্যবস্থা চালু করার উদ্যোগ গ্রহণযোগ্য নয়। এটি বিশ^বিদ্যালয়ের সুনাম ক্ষুণœ করার শামিল। এ অবস্থায় ডাকসুর এ ধরনের কর্মকাণ্ড অনাকাক্সিক্ষত, অপ্রত্যাশিত ও অগ্রহণযোগ্য।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ স্পষ্টভাবে জানাচ্ছে, বিশ্ববিদ্যালয়ে কোনো ধরনের দ্বৈত প্রশাসন প্রতিষ্ঠার সুযোগ নেই। ডাকসু একটি গুরুত্বপূর্ণ ছাত্রপ্রতিনিধিত্বশীল প্রতিষ্ঠান হলেও তার সব কার্যক্রম বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন, বিধি, নীতিমালা ও প্রশাসনিক কাঠামোর মধ্যে থেকেই পরিচালিত হতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক কর্তৃত্বকে পাশ কাটিয়ে কোনো সমান্তরাল কাঠামো বা প্রক্রিয়া প্রতিষ্ঠার চেষ্টা হলে তা কঠোরভাবে প্রতিহত করা হবে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাতিষ্ঠানিক শৃঙ্খলা, বাংলাদেশের ভাষা আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের মর্যাদা রক্ষায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ কোনো ধরনের আপস করবে না। বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুমোদন ছাড়া কোনো স্থাপনা নির্মাণ, পৃথক প্রশাসনিক ব্যবস্থা চালুর উদ্যোগ গ্রহণ করা হলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে প্রচলিত বিধি অনুযায়ী কঠোর প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।