বিশেষ সংবাদদাতা
এবারের বাজেটে দেশের আয়কর কাঠামোয় একযোগে তিনটি গুরুত্বপূর্ণ নীতি-পরিবর্তন এনেছে সরকার, যেখানে নবায়নযোগ্য জ্বালানি, ভোজ্যতেল শিল্প এবং দাতব্য অনুদানকে কেন্দ্র করে নতুন কর অব্যাহতি ও ছাড় ঘোষণা করা হয়েছে। এ সংশ্লিষ্ট প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ উৎসাহ, খাদ্য নিরাপত্তা শক্তিশালীকরণ এবং সামাজিক কল্যাণমূলক কার্যক্রমে সহায়তা বৃদ্ধির লক্ষ্য নেয়া হয়েছে।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগ থেকে জারি করা এসআরও নং ২১১, ২১২ ও ২১৩-আইন/আয়কর/২০২৬ অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ৮ জুন জারি করা এই প্রজ্ঞাপনগুলো আগামী ১ জুলাই ২০২৬ থেকে কার্যকর হবে।
দাতব্য অনুদানে কর ছাড় : নতুন প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, ১১টি জনকল্যাণমূলক প্রতিষ্ঠানকে ‘স্বীকৃত দাতব্য প্রতিষ্ঠান’ হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। ফলে এসব প্রতিষ্ঠানে দেয়া ব্যক্তিগত অনুদান দাতার করযোগ্য আয় থেকে কর রেয়াতযোগ্য হবে।
প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে রয়েছে আসিক ফাউন্ডেশন ফর চিলড্রেনস ক্যানসার, ব্র্যাক, বাংলাদেশ ক্যান্সার এইড ট্রাস্ট, থ্যালাসেমিয়া সোসাইটি অব বাংলাদেশ,অটিজম ওয়েলফেয়ার ফাউন্ডেশন, রামকৃষ্ণ মঠ ও মিশন, ঢাকা, চট্টগ্রাম মা ও শিশু হাসপাতাল, সিজেডএম এবং অন্যান্য স্বাস্থ্য ও সামাজিক উন্নয়নমূলক সংস্থা।
কর কর্মকর্তাদের মতে, এই পদক্ষেপ দাতব্য খাতে ব্যক্তিগত অনুদান বাড়াতে উৎসাহ সৃষ্টি করবে এবং সামাজিক সুরক্ষা কাঠামোকে আরো শক্তিশালী করবে।
ভোজ্যতেল শিল্পে কর অব্যাহতি
ভোজ্যতেল উৎপাদনকারী শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য দীর্ঘমেয়াদি কর ছাড় ঘোষণা করা হয়েছে। নতুন কাঠামো অনুযায়ী- প্রথম ৫ বছর : ১০০% কর অব্যাহতি, পরবর্তী ৩ বছর : ৫০% কর ছাড়, পরবর্তী ২ বছর : ২৫% কর ছাড়। তবে এই সুবিধা পেতে হলে প্রতিষ্ঠানকে কোম্পানি আইন, ১৯৯৪ অনুযায়ী নিবন্ধিত হতে হবে, স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত তেলবীজ কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহার করতে হবে, পৃথক হিসাব সংরক্ষণ ও নিরীক্ষিত হিসাব দাখিল করতে হবে এবং উৎস কর যথাযথভাবে পরিশোধ করতে হবে
অর্থনীতিবিদদের মতে, স্থানীয় কৃষিজ কাঁচামাল ব্যবহার বাধ্যতামূলক করার মাধ্যমে কৃষি ও শিল্প খাতের মধ্যে সংযোগ আরো শক্তিশালী হবে।
নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে দীর্ঘমেয়াদি কর ছাড়
সবচেয়ে দীর্ঘমেয়াদি কর সুবিধা ঘোষণা করা হয়েছে সৌরবিদ্যুৎ খাতে। নতুন প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, ২০৩৫ সাল পর্যন্ত সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন ও সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানগুলো আয়কর অব্যাহতি পাবে।
শর্ত অনুযায়ী নিজস্ব অর্থায়নে সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপন করতে হবে, জাতীয় নেট-মিটারিং নীতিমালা অনুসরণ করতে হবে, বিদ্যুৎ সরবরাহের জন্য বিদ্যুৎ ক্রয় চুক্তি (পিপিএ) বাধ্যতামূলক এবং অতিরিক্ত বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করতে হবে।
এ ছাড়া বিদ্যুৎ ব্যবহারকারী প্রতিষ্ঠান তাদের বিদ্যুৎ বিলের ৫% সমপরিমাণ কর রেয়াত সুবিধা পাবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি বাংলাদেশের নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে সবচেয়ে দীর্ঘমেয়াদি কর প্রণোদনা, যা বিদেশী ও দেশীয় বিনিয়োগকে উৎসাহিত করবে।
নীতিগত বিশ্লেষণ
রাজস্ব বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলছেন, দীর্ঘমেয়াদি কর ছাড়ের কারণে স্বল্পমেয়াদে সরকারি রাজস্ব প্রবাহে চাপ তৈরি হতে পারে, যা দক্ষ ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে ভারসাম্য রাখতে হবে। নতুন আয়কর প্রজ্ঞাপনগুলো শুধু কর পরিবর্তনের ঘোষণা নয়, বরং এটি একটি বৃহত্তর অর্থনৈতিক কৌশল যেখানে সামাজিক উন্নয়ন, খাদ্য নিরাপত্তা এবং সবুজ জ্বালানিকে একসাথে এগিয়ে নেয়ার চেষ্টা দেখা যাচ্ছে।
১ জুলাই ২০২৬ থেকে কার্যকর হতে যাওয়া এই নীতিগুলো দেশের বিনিয়োগ পরিবেশ, সামাজিক খাত এবং জ্বালানি কাঠামোয় দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলবে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
আয়করের বিদ্যমান ও নতুন কাঠামো
গত অর্থবছরের (২০২৫-২৬) কর কাঠামোর সাথে নতুন প্রস্তাবিত (২০২৬-২৭) বাজেটের আয়কর খাতের মূল পরিবর্তনগুলোর একটি তুলনামূলক ছক নিচে দেয়া হলো। এর মাধ্যমে করের ভিত্তি সম্প্রসারণ ও বৃদ্ধির পদক্ষেপগুলো একনজরে স্পষ্ট হবে :
আয়কর ও কর ভিত্তি সম্প্রসারণ : পূর্ববর্তী বনাম নতুন বাজেট
পর্যালোচনার বিষয় - বিগত অর্থবছর (২০২৫-২৬) - নতুন অর্থবছর (২০২৬-২৭) - পরিবর্তনের প্রভাব ও উদ্দেশ্য
করমুক্ত আয়ের সীমা - সাধারণ করদাতার জন্য ৩.৫ লাখ টাকা। - সাধারণ করদাতার জন্য ৩.৫ লাখ টাকাই বহাল রাখা হয়েছে। - মূল্যস্ফীতি বাড়লেও সীমা না বাড়ানোয় পরোক্ষভাবে মধ্যবিত্তের ওপর করের আওতা অপরিবর্তিত বা বিস্তৃত হয়েছে।
উচ্চবিত্তের সর্বোচ্চ করের হার - সর্বোচ্চ করের হার ছিল ২৫% থেকে ৩০% এর মধ্যে। - অতি-উচ্চ আয়ের স্ল্যাবে করের হার পুনর্বিন্যাস করে সর্বোচ্চ সীমা বৃদ্ধি। - ধনী ও উচ্চ আয়ের মানুষের কাছ থেকে বেশি প্রত্যক্ষ কর আদায় করা।
বিত্তশালীদের সারচার্জ (সম্পদ কর) - নিট সম্পদের ওপর ৩ কোটি টাকা থেকে শুরু করে বিভিন্ন ধাপে সারচার্জ কার্যকর ছিল। - সারচার্জের স্ল্যাব পুনর্গঠন করে সম্পদশালীদের করের হার বৃদ্ধি করা হয়েছে। - বিত্তশালীদের অতিরিক্ত সম্পদ ও বিলাসী জীবনযাত্রার ওপর করের বোঝা বাড়ানো।
কর্পোরেট কর ও ব্যাংকিং লেনদেন - শর্তসাপেক্ষে কিছুটা ছাড় ছিল, নগদ লেনদেনের ক্ষেত্রে কড়াকড়ি কম ছিল। - সমস্ত বড় লেনদেন ব্যাংকিং বা ক্যাশলেস মাধ্যমে করা বাধ্যতামূলক; অন্যথায় উচ্চ শাস্তিমূলক কর। - অর্থনীতিকে আনুষ্ঠানিক (ঋড়ৎসধষরুবফ) করা এবং কোম্পানির আয়-ব্যয়ের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা।
রিটার্ন জমার বাধ্যবাধকতা (চঝজ) - নির্দিষ্ট কিছু সরকারি ও আর্থিক সেবার ক্ষেত্রে পিএসআর (চঝজ) লাগত। - ফ্ল্যাট-গাড়ি কেনাবেচা, বড় ঋণ ও বিলাসী সেবা খাতের মতো আরও নতুন খাত যুক্ত করা হয়েছে। - করের ভিত্তি বা নেট (ঞধী ঘবঃ) সম্প্রসারণ করা, যাতে কেউ কর ফাঁকি দিতে না পারে।
অনলাইন রিটার্ন (ব-জবঃঁৎহ) - সরকারি কর্মকর্তা ও নির্দিষ্ট কিছু ক্ষেত্রে উৎসাহিত করা হতো, তবে বাধ্যতামূলক ছিল না। - নির্দিষ্ট বড় শহর এবং বড় কর্পোরেট ও সরকারি চাকুরেদের জন্য শতভাগ ই-রিটার্ন বাধ্যতামূলক করা হচ্ছে। - কর কর্মকর্তাদের হয়রানি ও দুর্নীতি কমানো এবং স্বয়ংক্রিয়ভাবে কর আদায় বৃদ্ধি।
কর রেয়াত ও ট্যাক্স হলিডে - আইটি ও বেশ কিছু উৎপাদনশীল খাত ঢালাও কর অব্যাহতি বা ট্যাক্স হলিডে পাচ্ছিল। - বেশ কিছু খাতের অব্যাহতির মেয়াদ শেষ হওয়ায় তা আর বাড়ানো হয়নি; আইটি খাতেও ২০২৯ পর্যন্ত আংশিক শর্তযুক্ত। - সরকারের কর-জিডিপি অনুপাত (ঞধী-ঃড়-এউচ ৎধঃরড়) বাড়ানো এবং করের আওতা বাড়ানো।
এই তুলনা থেকে স্পষ্ট যে, সরকার সাধারণ মধ্যবিত্তের করমুক্ত আয়ের সীমা পরিবর্তন না করে করের জাল বা পরিধি (ঞধী ঘবঃ) বড় করার দিকে মনোযোগ দিয়েছে। একই সাথে, ধনীদের ওপর সারচার্জ ও উচ্চ হারে কর আরোপ করে এবং কোম্পানিগুলোর নগদ লেনদেনে কড়াকড়ি এনে ভ্যাট অব্যাহতির বিশাল ঘাটতি পূরণের চেষ্টা করা হচ্ছে।



