জ্বালানি নিরাপত্তায় বড় বিনিয়োগ

ইস্টার্ন রিফাইনারি সম্প্রসারণে আইএসডিবির সাথে ১ বিলিয়ন ডলার ঋণচুক্তি

Printed Edition
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও ইসলামিক উন্নয়ন ব্যাংক গ্রুপের চেয়ারম্যান ড. মুহাম্মদ সোলায়মান আল জাসেরের উপস্থিতিতে সচিবালয়ে ইস্টার্ন রিফাইনারি আধুনিকায়ন ও সম্প্রসারণ প্রকল্পের চুক্তি সই হয় : পিআইডি
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও ইসলামিক উন্নয়ন ব্যাংক গ্রুপের চেয়ারম্যান ড. মুহাম্মদ সোলায়মান আল জাসেরের উপস্থিতিতে সচিবালয়ে ইস্টার্ন রিফাইনারি আধুনিকায়ন ও সম্প্রসারণ প্রকল্পের চুক্তি সই হয় : পিআইডি

বিশেষ সংবাদদাতা

দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা জোরদার এবং পরিশোধিত জ্বালানি আমদানির ওপর নির্ভরতা কমাতে ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেডের (ইআরএল) দ্বিতীয় ইউনিট নির্মাণে ইসলামী উন্নয়ন ব্যাংকের (আইএসডিবি) সাথে এক বিলিয়ন ডলারের ঋণচুক্তি করেছে বাংলাদেশ। গতকাল বৃহস্পতিবার সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও আইএসডিবি গ্রুপের প্রেসিডেন্ট ড. মুহাম্মদ আল জাসেরের উপস্থিতিতে এ চুক্তি সই হয়।

প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, আধুনিকায়ন ও সম্প্রসারণ প্রকল্পের আওতায় চট্টগ্রামে রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন ইস্টার্ন রিফাইনারির দ্বিতীয় ইউনিট নির্মাণে এ অর্থ ব্যয় হবে। সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, প্রকল্পটি শুধু জ্বালানি খাতের বিনিয়োগ নয়; এটি দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ও দীর্ঘমেয়াদি প্রবৃদ্ধির সাথেও সরাসরি সম্পর্কিত।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান চুক্তিটিকে বাংলাদেশের প্রতি আইএসডিবির আস্থার প্রতীক হিসেবে উল্লেখ করে বলেছেন, সরকার ২০৩৪ সালের মধ্যে ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি গড়ে তুলতে চায়। একই সাথে তৈরী পোশাকের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমিয়ে ইলেকট্রনিকস, ওষুধ, হালকা প্রকৌশল ও সবুজ শিল্পসহ বিভিন্ন খাত সম্প্রসারণের মাধ্যমে বাংলাদেশকে উৎপাদন ও আঞ্চলিক বাণিজ্যের কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার লক্ষ্য রয়েছে। তিনি বলেন, উন্নয়ন অর্থায়নের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ক্রমেই আইএসডিবি ও এর সহযোগী প্রতিষ্ঠানগুলোকে নির্ভরযোগ্য উৎস হিসেবে বিবেচনা করছে।

চুক্তিতে বাংলাদেশ সরকারের পক্ষে অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) অতিরিক্ত সচিব ড. মোহাম্মদ মিজানুর রহমান এবং আইএসডিবির পক্ষে সংস্থাটির কান্ট্রি প্রোগ্রামস বিভাগের মহাপরিচালক আনাস আইসামি স্বাক্ষর করেন। বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন বিপিসি প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করবে।

এ ছাড়া চুক্তি স্বাক্ষর অনুষ্ঠানে অন্যান্যের মধ্যে অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত, পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির এবং সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও আইএসডিবির ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

পরে সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রীর দফতরে তারেক রহমানের সাথে বৈঠক করেন আইএসডিবি গ্রুপের চেয়ারম্যান ড. মুহাম্মদ আল জাসের।

বাড়বে পরিশোধনক্ষমতা

ইস্টার্ন রিফাইনারি বাংলাদেশের একমাত্র রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন অপরিশোধিত তেল পরিশোধনাগার। ১৯৬৮ সালে চট্টগ্রামে বাণিজ্যিক উৎপাদন শুরু করা প্রতিষ্ঠানটির বর্তমান বার্ষিক পরিশোধনক্ষমতা ১৫ লাখ টন। দ্বিতীয় ইউনিট চালু হলে নতুন করে বছরে ৩০ লাখ টন অপরিশোধিত তেল পরিশোধনের সক্ষমতা যুক্ত হবে। ফলে ইআরএলের মোট সক্ষমতা দাঁড়াবে ৪৫ লাখ টনে। অর্থাৎ বিদ্যমান সক্ষমতার তুলনায় দেশের রাষ্ট্রীয় পরিশোধন সক্ষমতা প্রায় তিন গুণ হবে। এর ফলে ডিজেল, পেট্রল, অকটেন, কেরোসিনসহ বিভিন্ন পরিশোধিত জ্বালানি পণ্য আমদানির প্রয়োজন কিছুটা কমবে এবং অপরিশোধিত তেল আমদানি করে দেশে পরিশোধনের সুযোগ বাড়বে।

বর্তমানে দেশের জ্বালানি চাহিদা মেটাতে বিপুল পরিমাণ পরিশোধিত পেট্রোলিয়াম পণ্য বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয়। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দামের পাশাপাশি পরিশোধিত পণ্যের মূল্য, পরিবহন ব্যয়, বীমা ও ডলারের বিনিময় হার- সবকিছুর প্রভাব পড়ে দেশের জ্বালানি ব্যয়ে। এই বাস্তবতায় দেশে পরিশোধনক্ষমতা বাড়ানো হলে বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ কমানোর সুযোগ সৃষ্টি হতে পারে।

দীর্ঘ ১৬ বছরের অপেক্ষা

ইআরএলের দ্বিতীয় ইউনিট নির্মাণের পরিকল্পনা নতুন নয়। ২০১০ সালে তিন মিলিয়ন টন সক্ষমতার একটি দ্বিতীয় ইউনিট স্থাপনের উদ্যোগ নেয়া হয়েছিল। কিন্তু প্রকল্পটি বছরের পর বছর অর্থায়ন, সম্ভাব্যতা জরিপ, প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত ও বাস্তবায়নসংক্রান্ত জটিলতায় আটকে থাকে। একপর্যায়ে প্রকল্পের প্রাথমিক ব্যয় ১৩ হাজার কোটি টাকা থেকে কয়েক দফায় বেড়ে যায়।

২০২৫ সালের ২৩ ডিসেম্বর একনেক ‘ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেডের আধুনিকায়ন ও সম্প্রসারণ’ প্রকল্প অনুমোদন করে। প্রকল্পটির অনুমোদিত ব্যয় নির্ধারণ করা হয় প্রায় ৩৫ হাজার ৪৬৫ কোটি টাকা। এর মধ্যে সরকারের অর্থায়ন প্রায় ২১ হাজার ২৭৭ কোটি টাকা এবং ইআরএল/বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের অর্থায়ন প্রায় ১৪ হাজার ১৮৭ কোটি টাকা। বাস্তবায়নকাল ধরা হয়েছে ২০২৫ সালের ডিসেম্বর থেকে ২০৩০ সালের নভেম্বর পর্যন্ত।

অর্থাৎ প্রকল্পটি সময়মতো বাস্তবায়ন করা এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জগুলোর একটি। এক যুগের বেশি সময় ধরে ঝুলে থাকা প্রকল্পের ক্ষেত্রে নতুন করে সময় ও ব্যয় বৃদ্ধি হলে এর অর্থনৈতিক সুবিধার বড় অংশই ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

১ বিলিয়ন ডলারের ঋণ কতটা সাশ্রয়ী

চুক্তির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো ঋণের আর্থিক শর্ত। কারণ আইএসডিবির অর্থায়নকে প্রচলিত অর্থে অত্যন্ত স্বল্পসুদের বা ‘সফট লোন’ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এটি এক ধরনের বাণিজ্যিক ঋণ।

সরকারের অনুমোদন সংক্রান্ত নথি অনুযায়ী, প্রায় ১.০০৪ বিলিয়ন ডলারের অর্থায়ন দু’টি প্যাকেজে দেয়া হচ্ছে- ‘ফরওয়ার্ড লিজ-১’-এর আওতায় প্রায় ৫২০.৫৯ মিলিয়ন ডলার এবং ‘ফরওয়ার্ড লিজ-২’-এর আওতায় প্রায় ৪৮৩.১০ মিলিয়ন ডলার। এর সাথে ৬ লাখ ডলারের কারিগরি সহায়তাও রয়েছে।

ঋণের মেয়াদ ২০ বছর, যার মধ্যে পাঁচ বছর গ্রেস পিরিয়ড এবং পরবর্তী ১৫ বছরে অর্ধবার্ষিক কিস্তিতে পরিশোধের ব্যবস্থা রয়েছে। তবে ঋণের মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে ছয় মাসের এসওএফআরের সাথে অতিরিক্ত স্প্রেড ও ঝুকি প্রিমিয়াম যোগ করে। ২০২৬ সালের জুলাইয়ের শুরুতে ছয় মাসের এসওএফআর ৩.৮৪৬২৭ শতাংশ ধরে মোট মার্কআপ প্রায় ৫.৪৪৬২৭ শতাংশ দাঁড়িয়েছিল।

এ কারণেই অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ ঋণের দু’টি প্যাকেজকেই ‘হাইলি নন-কনসেশনাল’ হিসেবে চিহ্নিত করেছে। অর্থাৎ নামের দিক থেকে এটি উন্নয়ন সহযোগী প্রতিষ্ঠানের অর্থায়ন হলেও এর অর্থনৈতিক সুবিধা প্রচলিত সহজশর্তের ঋণের তুলনায় সীমিত।

আরেকটি ঝুঁকি হলো- এসওএফআর পরিবর্তনশীল। ফলে ভবিষ্যতে আন্তর্জাতিক সুদহার বাড়লে বাংলাদেশের ঋণ পরিশোধের ব্যয়ও বাড়তে পারে। এর অর্থ এখনকার হিসাব অনুযায়ী ঋণের যে খরচ নির্ধারণ করা হচ্ছে, পুরো ২০ বছরের মেয়াদে তা অপরিবর্তিত থাকবে না।

সাশ্রয় হবে কত

প্রকল্পটির পক্ষে সবচেয়ে বড় যুক্তি হলো- দেশীয় পরিশোধন সক্ষমতা বাড়লে পরিশোধিত জ্বালানি আমদানির ব্যয় কমানো সম্ভব হবে। বিভিন্ন সরকারি ও সংশ্লিষ্ট সূত্রের হিসাবে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন হলে প্রতি ব্যারেল অপরিশোধিত তেল দেশে পরিশোধনের মাধ্যমে আনুমানিক ২০ ডলার পর্যন্ত সাশ্রয়ের সম্ভাবনা রয়েছে। বছরে এর পরিমাণ কয়েকশ’ মিলিয়ন ডলারে পৌঁছাতে পারে।

তবে এই সম্ভাব্য সাশ্রয়কে সরাসরি ‘নিট বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয়’ হিসেবে গণনা করা ঠিক হবে না। কারণ অপরিশোধিত তেল আমদানির মূল্য, রিফাইনারি পরিচালন ব্যয়, জ্বালানি ও বিদ্যুৎ ব্যয়, রক্ষণাবেক্ষণ, ঋণের সুদ ও কিস্তি, বীমা এবং অবকাঠামো ব্যয়সহ পুরো প্রকল্পের জীবনচক্রের খরচ হিসাব করতে হবে। অন্য দিকে আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত ও পরিশোধিত জ্বালানির দামের পার্থক্য যদি অনুকূলে থাকে, তাহলে দেশীয় রিফাইনিং সক্ষমতা বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

শুধু রিফাইনারি করলেই জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে না

ইআরএল-২ নিঃসন্দেহে দেশের জ্বালানি নিরাপত্তায় গুরুত্বপূর্ণ বিনিয়োগ। কিন্তু শুধু পরিশোধনক্ষমতা বাড়ালেই জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে না। অপরিশোধিত তেল আমদানির জন্য পর্যাপ্ত টার্মিনাল, পাইপলাইন, সংরক্ষণক্ষমতা, পরিবহন অবকাঠামো এবং দক্ষ পরিচালনা ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। বিশেষ করে রিফাইনারি চালুর পর অপরিশোধিত তেলের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করা না গেলে নতুন সক্ষমতার বড় অংশ অব্যবহৃত থেকে যেতে পারে। একই সাথে আন্তর্জাতিক বাজারের দামের ওঠানামা, ডলার সঙ্কট এবং বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবস্থাপনাও প্রকল্পটির অর্থনৈতিক ফলাফলকে প্রভাবিত করবে।

তাই প্রকল্পটির সাফল্য নির্ভর করবে তিনটি বিষয়ের ওপর- নির্ধারিত সময়ে নির্মাণ শেষ করা, ব্যয় নিয়ন্ত্রণ এবং পূর্ণ সক্ষমতায় রিফাইনারি পরিচালনা।

আইএসডিবির সাথে নতুন অর্থনৈতিক সম্পর্ক

বাংলাদেশ আইএসডিবির প্রতিষ্ঠাতা সদস্য। দীর্ঘদিন ধরে প্রতিষ্ঠানটি বাংলাদেশের বিভিন্ন অবকাঠামো ও উন্নয়ন প্রকল্পে অর্থায়ন করে আসছে। ইআরএল প্রকল্পের জন্য এত বড় অর্থায়ন দুই পক্ষের সম্পর্কের একটি নতুন মাত্রা তৈরি করতে পারে। বিশেষ করে বাংলাদেশের উন্নয়ন অর্থায়নের ধরন যখন ধীরে ধীরে পরিবর্তিত হচ্ছে এবং বৈদেশিক ঋণের শর্ত, সুদহার ও বৈদেশিক মুদ্রার ঝুঁকি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে, তখন আইএসডিবির মতো বহুপক্ষীয় প্রতিষ্ঠানের অর্থায়ন সরকারের জন্য একটি বিকল্প উৎস তৈরি করতে পারে।

তবে ভবিষ্যতে এমন অর্থায়ন গ্রহণের ক্ষেত্রে শুধু ঋণের পরিমাণ নয়, ঋণের প্রকৃত ব্যয়, বৈদেশিক মুদ্রার ঝুঁকি, প্রকল্পের আর্থিক প্রত্যাবর্তন এবং দেশের সামগ্রিক সরকারি ঋণ ব্যবস্থাপনার ওপর প্রভাব বিবেচনা করা জরুরি।

সামনে সবচেয়ে বড় পরীক্ষা বাস্তবায়ন

ইআরএল-২ নিয়ে বাংলাদেশের অভিজ্ঞতা একটি সতর্কবার্তাও বটে। ২০১০ সালে উদ্যোগ নেয়ার পর প্রায় ১৬ বছর পেরিয়ে গেছে। এই সময়ে প্রকল্পের ব্যয় বেড়েছে, নকশা ও অর্থায়ন নিয়ে একাধিকবার পরিবর্তন হয়েছে এবং বাস্তবায়ন বারবার পিছিয়েছে।

এবার ২০৩০ সালের মধ্যে প্রকল্প শেষ করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। ফলে চুক্তি সই হওয়া প্রকল্পটির জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হলেও এটিই শেষ সাফল্য নয়। বরং এখন প্রশ্ন-১ বিলিয়ন ডলারের বৈদেশিক অর্থায়নসহ প্রায় ৩৫ হাজার ৪৬৫ কোটি টাকার প্রকল্পটি নির্ধারিত সময়ে, নির্ধারিত ব্যয়ে এবং পূর্ণ সক্ষমতায় বাস্তবায়ন করা যাবে কি না।

যদি তা সম্ভব হয়, তাহলে ইআরএল-২ দেশের পরিশোধিত জ্বালানি আমদানি কমানো, বৈদেশিক মুদ্রার চাপ প্রশমিত করা এবং দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি নিরাপত্তা শক্তিশালী করার ক্ষেত্রে বড় ভূমিকা রাখতে পারে। কিন্তু বাস্তবায়নে আবারো বিলম্ব, ব্যয় বৃদ্ধি কিংবা সক্ষমতা ব্যবহারে ব্যর্থতা হলে ব্যয়বহুল বৈদেশিক ঋণের বোঝা দেশের অর্থনীতির ওপর উল্টো চাপ সৃষ্টি করতে পারে।

সুতরাং ইআরএল-২ বাংলাদেশের জন্য শুধু একটি রিফাইনারি প্রকল্প নয়; এটি একই সাথে জ্বালানি নিরাপত্তা, বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয়, সরকারি ঋণ ব্যবস্থাপনা এবং বড় অবকাঠামো প্রকল্প বাস্তবায়নের সক্ষমতার একটি পরীক্ষা।

বার্ষিক ৫-৭ হাজার কোটি টাকার মূল্য সংযোজনের সম্ভাবনা

ইআরএল-২ এর অর্থনৈতিক গুরুত্ব কেবল আমদানি নির্ভরতা হ্রাসের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং পূর্ণ সক্ষমতায় পরিচালিত হলে প্রকল্পটি জাতীয় অর্থনীতিতে তাৎপর্যপূর্ণ ‘গ্রস ভ্যালু অ্যাডেড’ এবং ‘নেট ভ্যালু অ্যাডেড’ সৃষ্টিতে সক্ষম। যদিও প্রকল্পের সর্বশেষ হালনাগাদ সম্ভাব্যতা সমীক্ষায় এর নির্দিষ্ট প্রাক্কলন প্রকাশ করা হয়নি, তবে প্রাসঙ্গিক অর্থনৈতিক তথ্য বিশ্লেষণপূর্বক একটি সতর্ক মূল্যায়ন সম্ভব।

পূর্ববর্তী সম্ভাব্যতা সমীক্ষাগুলোর অর্থনৈতিক উপাত্ত এবং অতিরিক্ত ৩০ লাখ মেট্রিকটন শোধন সক্ষমতা বিবেচনায় নিয়ে প্রচলিত মূল্য সংযোজন পদ্ধতির ভিত্তিতে করা প্রাথমিক বিশ্লেষণ অনুযায়ী- পূর্ণ সক্ষমতায় ইআরএল-২ থেকে বার্ষিক আনুমানিক ৫ থেকে ৭ হাজার কোটি টাকার গ্রস ভ্যালু তৈরি হতে পারে। পরিচালন ব্যয়, মধ্যবর্তী উপকরণ এবং স্থায়ী মূলধনের অবচয় সামঞ্জস্য করার পর সম্ভাব্য নীট ভ্যালু তৈরি দাঁড়ায় প্রায় ৩ হাজার ৭০০- ৫ হাজার ৮০০ কোটি টাকা। তবে এ হিসাব চূড়ান্ত নয়; প্রকৃত মূল্য সংযোজন মূলত আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত ও পরিশোধিত তেলের মূল্য, রিফাইনারির সক্ষমতা ব্যবহার, পরিচালনা ব্যয়, বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময় হার এবং অবচয় হারের ওপর নির্ভর করবে।

এ ছাড়া সরকারি প্রাক্কলন অনুযায়ী ইআরএল-২ চালু হলে প্রতি ব্যারেল অপরিশোধিত তেল স্থানীয়ভাবে পরিশোধনের মাধ্যমে প্রায় ২০ মার্কিন ডলার সাশ্রয় করা সম্ভব। এতে বার্ষিক প্রায় ৪৭ কোটি ৩০ লাখ ডলার বা ৫ হাজার ৭৮৮ কোটি টাকা সাশ্রয় হতে পারে। উল্লেখ্য, এই সাশ্রয় সরাসরি গ্রস ভ্যালু সংযুক্তি নির্দেশ করে না; এটি মূলত জ্বালানি আমদানির ব্যয় হ্রাস এবং বৈদেশিক মুদ্রা সুরক্ষার একটি কৌশলগত হিসাব।

বর্তমানে ইস্টার্ন রিফাইনারির বার্ষিক শোধন সক্ষমতা ১৫ লাখ মেট্রিকটন। নতুন ইউনিট যুক্ত হলে মোট সক্ষমতা ৪৫ লাখ মেট্রিকটনে উন্নীত হবে, যা বর্তমানের তুলনায় তিনগুণ। এই বর্ধিত সক্ষমতার মাধ্যমে বার্ষিক প্রায় ১১ লাখ টন ইউরো-৫ ডিজেল, ৬ লাখ টন ইউরো-৫ পেট্রোল, ৫ লাখ টন জেট ফুয়েল, ৪ লাখ টন ফার্নেস অয়েল, ২ লাখ টন লুব বেস অয়েল এবং ৬০ হাজার টন এলপিজি উৎপাদন পরিকল্পিত রয়েছে। ফলে প্রকল্পটি ডিজেল ও পেট্রল আমদানির ওপর নির্ভরতা হ্রাসের পাশাপাশি জ্বালানি খাতে বহুমুখীকরণ নিশ্চিত করবে।

মূলধনী বিনিয়োগের বিপরীতে মূল্য সংযোজনের মূল্যায়ন

ইআরএল-২ প্রকল্পের সংশোধিত প্রাক্কলিত ব্যয় ৩১ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে সরকারি তহবিল থেকে সাড়ে ১৮ হাজার কোটি টাকা এবং বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) নিজ অর্থায়ন থেকে সাড়ে ১২ হাজার কোটি টাকা সংস্থান করা হবে।

উক্ত বিনিয়োগের বিপরীতে বার্ষিক ৫-৭ হাজার কোটি টাকার গ্রস ভ্যালু যুক্ত হলে তা মোট মূলধনী ব্যয়ের প্রায় ১৬-২২ শতাংশের সমপরিমাণ বার্ষিক অর্থনৈতিক মূল্য নির্দেশ করে। একইভাবে অবচয় বাদ দিয়ে ৩ হাজার ৭০০-৫ হাজার ৮০০ কোটি টাকার নিট ভ্যালু সংযুক্তি মোট ব্যয়ের প্রায় ১২-১৯ শতাংশ হতে পারে। প্রকল্পের আর্থিক ও অর্থনৈতিক সম্ভাবনার অধিকতর গ্রহণযোগ্য নির্দেশক পাওয়া যায় বিপিসির মূল্যায়নে। সংশ্লিষ্ট পর্যালোচনা সভায় বিপিসি উল্লেখ করে যে, ইআরএল-২ প্রকল্পের আর্থিক অভ্যন্তরীণ আয়ের হার ১৯.২৪ শতাংশ এবং অর্থনৈতিক অভ্যন্তরীণ আয়ের হার ২৩.২১ শতাংশ।

উপাত্তানুসারে, অর্থায়নের ব্যয়ের তুলনায় প্রকল্পটির অর্থনৈতিক যৌক্তিকতা বেশ শক্ত। তবে প্রকৃত সাফল্য নির্ভর করবে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে বাস্তবায়ন, ব্যয় নিয়ন্ত্রণ, পূর্ণ সক্ষমতার ব্যবহার এবং আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজার পরিস্থিতির ওপর।

বিলিয়ন ডলারের ঋণ ও অর্থনৈতিক দায়বদ্ধতা

ইআরএল-২ প্রকল্পের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক বিষয় হলো এর বৈদেশিক অর্থায়ন কাঠামো। ইসলামিক উন্নয়ন ব্যাংক (আইএসডিবি) থেকে গৃহীত ১.০০৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার ঋণের মেয়াদ ২০ বছর (৫ বছরের গ্রেস পিরিয়ডসহ), যা ১৫ বছরে অর্ধবার্ষিক কিস্তিতে পরিশোধযোগ্য। অর্থায়নটি সহজশর্তের (ঈড়হপবংংরড়হধষ) আওতায় পড়ে না।

অতএব, ইআরএল-২ প্রকল্পের সফলতা কেবল অবকাঠামো নির্মাণের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এর প্রকৃত সার্থকতা নির্ভর করবে- নির্ধারিত সময়সীমায় ৪৫ লাখ টন শোধন সক্ষমতা কার্যকরকরণ, কাক্সিক্ষত উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা অর্জন, প্রাক্কলিত ৫ হাজার ৭৮৮ কোটি টাকার বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় এবং ১ বিলিয়ন ডলারের বৈদেশিক ঋণের দায় দক্ষতার সাথে ব্যবস্থাপনার ওপর।

২০১৩ সালে প্রায় ১৩ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে বাস্তবায়নের লক্ষ্য নিয়ে শুরু হওয়া প্রকল্পটি দীর্ঘ ১৬ বছরে সংশোধিত হয়ে ৩১ হাজার কোটি টাকায় পৌঁছেছে। ফলে বর্তমানে এ প্রকল্পে সময় বা ব্যয়ের আর কোনো অতিরিক্ত বিচ্যুতি গ্রহণযোগ্য নয়। ইআরএল-২ কেবল একটি তেল শোধনাগার স্থাপন প্রকল্প নয়, এটি জাতীয় জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ, বৈশ্বিক মুদ্রা সাশ্রয়, মূল্য সংযোজন বৃদ্ধি এবং বৃহৎ বৈদেশিক ঋণের অর্থনৈতিক যৌক্তিকতা প্রমাণের এক গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক।