বিশেষ সংবাদদাতা
বিজনেস ইনিশিয়েটিভ লিডিং ডেভেলপমেন্ট (বিল্ড) বলছে, বর্তমানে প্রচলিত সঙ্কোচনমূলক মুদ্রানীতি জাতীয় বাজেটে ঘোষিত সম্প্রসারণমূলক রাজস্বনীতির সাথে যথাযথভাবে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। এই নীতিগত পার্থক্যের ফলে বেসরকারি খাতের বিনিয়োগ ত্বরান্বিত করা, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, শিল্প প্রবৃদ্ধি এবং বাংলাদেশের সামগ্রিক ব্যবসায় পরিবেশ উন্নত করার মতো বাজেটের মূল লক্ষ্যগুলো বাধাগ্রস্ত হতে পারে। তবে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের মুদ্রানীতির (এমপিএস) মাধ্যমে সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা পুনরুদ্ধার এবং মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে বাংলাদেশ ব্যাংকের অব্যাহত প্রচেষ্টার প্রশংসা করেছে বিল্ড।
সংস্থাটি গতকাল বুধবার গণমাধ্যমে পাঠানো এক বিবৃতিতে বলছে, নতুন ২০২৬-২৭ অর্থবছরে নতুন ২৫ লাখ কর্মসংস্থান সৃষ্টির যে লক্ষ্যমাত্রা বাজেটে নির্ধারণ করা হয়েছে, তা অর্জনে বেসরকারি খাতকে প্রধান ভূমিকা পালন করতে হবে। বর্তমানে বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান অর্থনৈতিক চালিকাশক্তি রফতানি নেতিবাচক প্রবৃদ্ধির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। এমন সময়ে অত্যন্ত কঠোর মুদ্রানীতি বজায় রাখা ব্যবসায় সম্প্রসারণকে নিরুৎসাহিত করতে পারে এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থাকে দুর্বল করতে পারে। এমপিএসে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা মাত্র ৬.৫ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছে। যেখানে সরকারি খাতে এই লক্ষ্যমাত্রা ২১.৮ শতাংশ। এই বড় ধরনের বৈষম্য ‘ক্রাউডিং-আউট’ প্রভাবকে আরো তীব্র করতে পারে; যা বেসরকারি উদ্যোগগুলোর জন্য ঋণের প্রাপ্যতা কমিয়ে দেবে। বড় কিছু ব্যাংকের ভঙ্গুর অবস্থা এবং তাদের গুরুতর আর্থিক চাপ পরিস্থিতিকে আরো জটিল করে তুলেছে।
বিল্ড বলছে, ব্যাংকিং খাতের বাইরে সরকারি বাজেট ঘাটতি মেটানোর মতো বাংলাদেশের সীমিত উৎস রয়েছে। ফলে সরকারকে ব্যাংক ঋণের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভর করতে হচ্ছে; যা বেসরকারি খাতের জন্য ঋণের প্রাপ্যতা কমিয়ে দিচ্ছে। একই সাথে বিকল্প অর্থায়ন ব্যবস্থাগুলো এখনো পুরোপুরি গড়ে ওঠেনি। এ ছাড়া পলিসি রেট বা নীতি হারের চেয়ে প্রায় ১ শতাংশ বেশি মুনাফাযুক্ত সরকারি সিকিউরিটিজ ব্যাংকগুলোকে বেসরকারি খাতে ঋণ দেয়ার পরিবর্তে ঝুঁকিহীন সরকারি সিকিউরিটিজে বিনিয়োগে উৎসাহিত করছে। আগামী ২০৩০-৩১ অর্থবছরের মধ্যে মোট বিনিয়োগকে জিডিপির ৪০ শতাংশে উন্নীত করার বাজেটের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে বাংলাদেশে বেসরকারি খাতের বিনিয়োগ উল্লেখযোগ্য হারে বাড়ানো প্রয়োজন। এ প্রেক্ষাপটে এ সময়ের মধ্যে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি ধীরে ধীরে অন্তত ১৫ শতাংশে উন্নীত করা উচিত।
বিবৃতিতে আরো বলা হয়েছে, বিল্ড বিশেষ উদ্বেগের সাথে লক্ষ করছে যে, বর্তমান ১০ শতাংশ নীতি হারের (পলিসি রেট) পাশাপাশি স্ট্যান্ডিং ল্যান্ডিং ফ্যাসিলিটি (এসএলএফ) ১১.৫ শতাংশ এবং স্ট্যান্ডিং ডিপোজিট ফ্যাসিলিটি (এসডিএফ) ৭.৫ শতাংশ হওয়ায় বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর ঋণের হার ১৪ থেকে ১৭ শতাংশে পৌঁছেছে। ঋণের সুদের হারের উচ্চ ব্যবধান (স্প্রেড) ঋণের ব্যয় বাড়িয়ে দিচ্ছে; ডিপোজিট ও নতুন বিনিয়োগ নিরুৎসাহিত করছে এবং শিল্পের প্রতিযোগিতা সক্ষমতাকে দুর্বল করছে। বর্তমান মুদ্রাস্ফীতির প্রেক্ষাপটও আরো ভারসাম্যপূর্ণ নীতিগত পদক্ষেপ দাবি করে। যদিও সামগ্রিক মুদ্রাস্ফীতি কিছুটা কমেছে। তবে খাদ্য মূল্যস্ফীতি এখনো ৮ শতাংশের ওপরে। এটি ইঙ্গিত দেয় যে, মূল্যস্ফীতির চাপ মূলত অভ্যন্তরীণ অতিরিক্ত চাহিদার কারণে নয়, বরং সরবরাহের সীমাবদ্ধতা, কৃষি সরবরাহ শৃঙ্খল বিঘিœত হওয়া, বাজারের অদক্ষতা, বিনিময় হারের অস্থিরতা এবং কাঠামোগত দুর্বলতার কারণে ঘটছে। এ অবস্থায় কেবল মুদ্রানীতি কঠোর করে মুদ্রাস্ফীতি কমানো সম্ভব নয়, বরং তা উৎপাদনশীল খাতের জন্য ঋণের ব্যয় বাড়িয়ে দিচ্ছে। জাতীয় বাজেটেও বলা হয়েছে যে, সরবরাহ শৃঙ্খলের অদক্ষতা, বাজারের অসামঞ্জস্যতা এবং কাঠামোগত চ্যালেঞ্জগুলো মুদ্রাস্ফীতির জন্য দায়ী।
বিল্ড আরো লক্ষ্য করেছে যে, ব্রড মানি (এম২) প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা ১৩ শতাংশ এখনো বেশ উচ্চ, যা মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে বাধা হিসেবে কাজ করবে। একই সাথে বেসরকারি খাতের থেকে সরকারি খাতে উচ্চ ঋণ প্রবৃদ্ধি বেসরকারি খাতের উৎপাদনশীল বিনিয়োগকে বাধাগ্রস্ত করায় উদ্বেগ বহুগুণে বাড়ছে। এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় বিল্ড সুপারিশ করছে যে, মুদ্রাস্ফীতির সঙ্কোচনীতি গ্রহণের সাথে সাথে বাংলাদেশ ব্যাংক যেন তার মুদ্রানীতিকে ধীরে ধীরে পুনর্বিন্যাস করে। এই নীতির লক্ষ্য হওয়া উচিত, স্প্রেড হারের বর্তমান ৫.৭২ শতাংশ ব্যবধান কমিয়ে ২.৫ শতাংশে নিয়ে আসা, কুটির, মাইক্রো, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প (সিএমএসএমই), রফতানিকারক ও উৎপাদনমুখী শিল্পের জন্য ঋণের প্রাপ্যতা বাড়ানো এবং আর্থিক সম্পদ যেন উৎপাদনশীল খাতে বিনিয়োগ হয় তা নিশ্চিত করা। বর্তমানে সিএমএসএমই খাতের প্রায় ১৫ শতাংশের পরিবর্তে মোট ব্যাংক ঋণের অন্তত ২০ শতাংশ এই খাতে বরাদ্দ রাখা উচিত।
বিল্ড সরকারের ঘোষিত ৬০ হাজার কোটি টাকার পুনঃঅর্থায়ন কর্মসূচিকে স্বাগত জানায়, যার মধ্যে পাঁচ হাজার কোটি টাকা সিএমএসএমই খাতের জন্য ৯ শতাংশ সর্বোচ্চ সুদে বরাদ্দ রাখা হয়েছে। এই তহবিলের কার্যকারিতা সর্বোচ্চ পর্যায়ে নিতে স্বচ্ছতার সাথে বাস্তবায়ন এবং কুটির ও মাইক্রো উদ্যোক্তাদের অগ্রাধিকার দেয়া প্রয়োজন, যারা সবচেয়ে বেশি আর্থিক সঙ্কটে রয়েছেন। এ ছাড়া বর্তমান অর্থনৈতিক মন্দায় উদ্যোক্তাদের কিছুটা স্বস্তি দিতে ঋণের সুদের হার সাময়িকভাবে আরো কমানোর বিষয়টি বিবেচনা করা যেতে পারে। এ ছাড়া ২০ হাজার কোটি টাকার বরাদ্দ থেকে সহায়তা পাওয়ার যোগ্য ‘রুগ্ণ শিল্প’ (সিক ইন্ডাস্ট্রিজ) শনাক্তকরণের মানদণ্ড স্পষ্টভাবে সংজ্ঞায়িত ও প্রকাশ করা উচিত। একইভাবে সৃজনশীল অর্থনীতির জন্য বরাদ্দকৃত ৫০০ কোটি টাকার সুফল পাওয়ার জন্য যোগ্য খাত, সুবিধাভোগী ও বাস্তবায়ন কৌশলসহ একটি পূর্ণাঙ্গ নীতিমালা থাকা প্রয়োজন।



