নিজস্ব প্রতিবেদক
আইজিপি বাহারুল আলম বলেছেন, সর্বকালের সবচেয়ে নিরাপদ ঐতিহাসিক নির্বাচন আয়োজনে বদ্ধপরিকর বাংলাদেশ পুলিশ। নির্বাচন ঘিরে তিন স্তরের নিরাপত্তা বলয় তৈরি করা হয়েছে। এই নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সব মিলিয়ে এক লাখ ৮৭ হাজার ৬০৩ জন পুলিশ সদস্য কাজ করছেন। এর মধ্যে ভোটকেন্দ্রে স্ট্যাটিক ফোর্স থাকবে ৯৩ হাজার ৩৯১ জন। বাকিরা মোবাইল টিম এবং স্ট্রাইকিং ফোর্স হিসেবে নিয়োজিত থাকবে।
গতকাল মঙ্গলবার পুলিশ হেডকোয়ার্টার্সের মিডিয়া সেন্টারে ‘জাতীয় সংসদ নির্বাচন উপলক্ষে সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি’ বিষয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এ তথ্য জানান তিনি।
আইজিপি বলেন, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন নিশ্চিত করতে মাঠে থাকবেন সেনাবাহিনীর এক লাখ সদস্য। তারা থাকবেন ইনটেনসিভ মোবাইল পেট্রোলিংয়ে, নির্বাচন নিয়ে সেনাবাহিনীর যে প্রতিজ্ঞা তাতে আমি নিশ্চিত যতই হোক আমরা সফল নির্বাচন করব। সাথে থাকছে ছয় লাখ আনসার সদস্য ও বিপুল সংখ্যক বিজিবি।
আইজিপি বলেন, এ বছর সারা দেশে ৪২ হাজার ৭৭৯ ভোটকেন্দ্রের মধ্যে আট হাজার কেন্দ্রকে ঝুঁকিপূর্ণ, ১৬ হাজার কেন্দ্রকে মাঝারি ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। ঝুঁকিপূর্ণ নির্ধারণ করা হয় যোগাযোগের ইস্যু, প্রার্থীর প্রভাব, প্রতিদ্বন্দ্বিতা বেশিসহ নানা বিষয়ে মাথায় রেখে। এসব কেন্দ্রে বাড়তি পুলিশ ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য মোতায়েন থাকবে। ইতোমধ্যে নির্বাচন কমিশনের উদ্যোগে ৯০ ভাগ কেন্দ্রে সিসিক্যামেরা বসানো হয়েছে। ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রগুলোতে পুলিশ সদস্যরা বডি ক্যামেরা ব্যবহার করবেন, সংশ্লিষ্ট পুলিশ সুপাররা প্রয়োজন অনুযায়ী ড্রোন ব্যবহার করবেন।
নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর থেকে প্রতি বছরই উত্তেজনা, সংঘর্ষ সহিংসতা ঘটে থাকে। এ বছর তফসিল ঘোষণার পর ১১ ডিসেম্বর থেকে ৯ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ৩১৭টি সহিংস ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে আহত হয়েছেন ৬০৩ জন, নিহত হয়েছেন পাঁচজন। তিনি বলেন, প্রতিটি মৃত্যুই দুর্ভাগ্যজনক। আমরা চাই একটি মৃত্যুর ঘটনাও যেন না ঘাটে। তারপরও যুগে যুগে সহিংসতা আহত নিহতের ঘটনা ঘটেছে। সাংবাদিকদের সাথে পুলিশের আচরণ নিয়ে এক প্রশ্নের জবাবে আইজিপি বলেন, পুলিশে ১৫ বছরের ফ্যাসিস্ট শাসনের সংস্কৃতি, অভ্যাস আমরা এক বছরে দূর করতে পারিনি। এটি আমাদের সেই পুরনো ফোর্স, শুধুমাত্র যারা মানবতাবিরোধী অপরাধ করেছে তাদের বিচারের জন্য পাঠানো হয়েছে। বিগত নির্বাচনে যারা দুর্নীতি করেছে তাদের স্ক্রিন আউট করে রাখা হয়েছে। কিন্তু মাঠপর্যায়ে যে বড় অংশ রয়েছে সেগুলো আগের সেই পুরনো ফোর্সই রয়ে গেছে। এ জন্য বিভিন্ন স্থানে ইনসিডেন্টগুলো হয়। তবে আমাদের চেষ্টা থাকবে শুদ্ধতা আনার। এ জন্য তাদের ট্রেনিং ও কর্মশালার ব্যবস্থা করা হচ্ছে। তিনি আরো জানান, ইউনেস্কো ও ইউএনওডিসির সহায়তায় সাংবাদিকদের সাথে পেশাদার আচরণ বিষয়ে পুলিশ সদস্যদের প্রশিক্ষণ দেয়া হচ্ছে। এক হাজারের বেশি ব্যক্তিগত অস্ত্র লুট হয়েছিল। তবে এর প্রকৃত সংখ্যা এখনো জানা যায়নি। এই অস্ত্রের মধ্যেও বেশ কিছু উদ্ধার করা হয়েছে। এর বাইরেও বিভিন্ন মাধ্যমে দেশে অস্ত্র প্রবেশ করে থাকে। যেকোনো অবৈধ অস্ত্রই থ্রেট, তবে সেগুলো মোকাবেলা করার সব ধরনের প্রস্তুতি রয়েছে। সর্বোচ্চ শক্তি দিয়ে নিরাপত্তাব্যবস্থা নেয়া হয়েছে।
পুলিশ দলীয় বলয় থেকে বেরিয়ে দায়িত্ব পালন করতে পারবে? অনেকের অভিযোগ যে পুলিশের কিছু কর্মকর্তা ইতোমধ্যে কোনো একটি রাজনৈতিক দলের দিকে ঝুঁকে পড়েছে? জানতে চাইলে পুলিশ মহাপরিদর্শক বাহারুল আলম বলেন, জাস্ট ওয়েট অ্যান্ড সি। ১৩ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত অপেক্ষা করে দেখেন। আমরা নিরপেক্ষ কি না? এরপরও দু-একজন দুষ্টু প্রকৃতির কেউ ত্রুটি ঘটানোর চেষ্টা করলে তার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হবে। আপনাদের ধারণা পাল্টে যাবে। ইনকিলাব মঞ্চ ও সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের আন্দোলনে পুলিশের হামলার বিষয়ে তিনি বলেন, কয়েকজন মানুষ রাস্তা বন্ধ করে দিচ্ছে, পুলিশকে চড় মারা হচ্ছে, আমাদের ধৈর্যের সর্বোচ্চ পরীক্ষা দিয়েছি। তবুও পাল্টা আঘাত করা হয়নি। আমাদের দুর্বলতা আছে এরপরও আমরা চেষ্টা করছি।
সম্প্রতি গণমাধ্যমে প্রকাশিত তিন হাজার অপরাধী ও ৩৫২ জন শুটারের তালিকা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এই তালিকাটি কার সে বিষয়ে তিনি নিশ্চিত নন। তবে ১৮ কোটি মানুষের দেশে এই সংখ্যক অপরাধী নির্বাচন বানচাল করতে পারবে এমন আশঙ্কা নেই। ৫ আগস্টে জেল থেকে পালানো আসামি ও জঙ্গি হুমকি প্রসঙ্গে আইজিপি বলেন, প্রচারকালীন সময়ে কিছু আশঙ্কা থাকলেও বড় কোনো ঘটনা ঘটেনি। বর্তমানে নির্বাচনকে ব্যাহত করার মতো কোনো শক্তিশালী জঙ্গি হুমকি নেই। কোনো থ্রেট না থাকলেও ইতিহাসে এই প্রথম কোনো নির্বাচনে এক লাখ সেনাবাহিনীর সদস্য ও ছয় লাখ আনসার সাথে দুই লাখ পুলিশ সদস্য দায়িত্ব পালন করবে কেন জানতে চাইলে আইজিপি বলেন, সবাই চায় একটা ভালো নির্বাচন করা। কেউ যেন প্রশ্ন তুলতে না পারে যে নির্বাচন আংশিক হলেও ত্রুটিপূর্ণ হয়েছে। এর কোনো সুযোগ রাখা হবে না।
সারা দেশের কারাগার থেকে ৫ আগস্ট ভয়ঙ্কর কিছু অপরাধী বের হয়ে গেছে যাদের এখনো গ্রেফতার করা সম্ভব হয়নি এবং এর মধ্যে কেউ কেউ উগ্রবাদীও রয়েছে। আবার কিছু শুটারও রয়েছে। তারা নির্বাচনের দিন কোনো প্রভাব ফেলবে কি না জানতে চাইলে আইজিপি বলেন, কেরানীগঞ্জের একটি বিস্ফোরণের ঘটনায় সারা দেশে বেশ কয়েকজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। ওই ঘটনা ওখানেই থামিয়ে দেয়া হয়েছে। সাজাপ্রাপ্ত কিছু অপরাধী পালিয়ে গেলেও পুলিশ সজাগ রয়েছে। তারাই উল্টো দৌড়ের ওপর আছে। কাজেই নির্বাচনে তাদের প্রভাব পড়বে না। আইজিপি বলেন, যতজন অপরাধী বাইরে থাকুক না কেন নির্বাচন ঠেকানোর মতো কারো সাধ্য নেই। নিজের প্রত্যাশা জানিয়ে আইজিপি বলেন, আমরা ইতিহাসে একটি উদাহরণ তৈরি করতে চাই যাতে এই নির্বাচন হয় শান্তিপূর্ণ, উৎসবমুখর ও গ্রহণযোগ্য। কতটা সফল হলাম, তার মূল্যায়ন করবে দেশবাসী। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের মেয়াদ শেষ। নির্বাচনের পর নতুন সরকার আসবে। পুলিশ সংস্কারের জন্য নতুন সরকারের কাছে আপনাদের কী প্রত্যাশা বা সুপারিশ করবেন জানতে চাইলে পুলিশের এই সর্বোচ্চ কর্মকর্তা বলেন, পুলিশ কমিশনের সুপারিশগুলো যাতে বাস্তবায়ন করা হয় সেগুলো নতুন সরকারের কাছে অ্যাড্রেস করা হবে। তবে সংস্কার নিয়ে কমিশনের মানসিকতার ঘাটতি ছিল। কিভাবে এটি হয়েছে তা জানা নেই। নতুন সরকার চাইলে সংস্কারকার্যক্রম এগিয়ে নিতে পারবে।
সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন অতিরিক্ত আইজপি এ কে এম আওলাদ হোসেন, অতিরিক্ত আইজি (প্রশাসন); মো: আকরাম হোসেন, অতিরিক্ত আইজি (অর্থ); মোসলেহ উদ্দিন আহমদ, অতিরিক্ত আইজি (লজিস্টিকস অ্যান্ড অ্যাসেট অ্যাকুইজিশন) সরদার নূরুল আমিন।


