বন্যা ও বৃষ্টিতে পানিবন্দী মানুষ ডায়রিয়া ও চর্মরোগে ভুগছে

জুলাইয়ের ১৩ দিনে ডায়রিয়ায় আক্রান্ত ৭৪ হাজার

Printed Edition

নিজস্ব প্রতিবেদক

বিভিন্ন স্থানে বন্যা ও ভারী বর্ষণে পানি আটকে পড়া মানুষের মধ্যে নানা রোগের প্রাদুর্ভাব শুরু হয়েছে। দূষিত পানি পান করে এবং ময়লা পানির মধ্যে দীর্ঘ সময় কাটানোর কারণে প্রায় সব বয়সী মানুষই ডায়রিয়া ও চর্মরোগে আক্রান্ত হচ্ছে। স্বাস্থ্য অধিদফতর জুলাই মাসের গত ১৩ দিনে সারা দেশে প্রায় ৭৪ হাজার মানুষ ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হয়েছে বলে জানিয়েছে।

আমাদের সংবাদদাতারা জানাচ্ছেন, পানির কারণে বন্যা উপদ্রুত এলাকার মানুষ বারবার ডায়রিয়ার শিকার হচ্ছে। বিশেষ করে শিশুদের মধ্যে ডায়রিয়ার প্রবণতা বেশি। কারণ, পিপাসা পেলে দূষিত অথবা বিশুদ্ধ দেখার উপলব্ধি এদের নেই। এ ছাড়া ভাইরাল সংক্রমণের কারণে ঠাণ্ডা-কাশি, নিউমোনিয়াসহ শ্বাসতন্ত্রের সংক্রমণও বৃদ্ধি পাচ্ছে। ঠাণ্ডাজনিত জ¦রে অ্যান্টিবায়োটিক কোনো কাজ না করলেও হাতের কাছে সহজে পাওয়া যাচ্ছে বলে মানুষ দ্রুত সুস্থ হওয়ার জন্য অ্যান্টিবায়োটিকও খাচ্ছে।

বন্যা উপদ্রুত এলাকায় পানিবাহিত রোগ ছাড়াও সংক্রামক রোগ ও মশাবাহিত রোগেও আক্রান্ত হচ্ছে মানুষ। এদিকে মৃত্যুর খবর তেমন না পেলেও সাপের দংশনের খবর পাওয়া যাচ্ছে। সাপে দংশন করলে কী করতে হবে, কোথায় যেতে হবে এ সম্বন্ধে পরিষ্কার ধারণা না থাকায় সমাজে প্রচলিত কুসংস্কারবশত ওঝার কাছে যাওয়ার প্রবণতা এখনো রয়ে গেছে। যে সাপেই দংশন করুক, দ্রুত নিকটবর্তী হাসপাতালে যেতে হবে, সেখানে রয়েছে বিশেষজ্ঞ ডাক্তার এবং সাপের দংশনের অ্যান্টিভেনম (ওষুধ)।

ডায়রিয়ার পাশাপাশি কলেরার জীবাণুতেও আক্রান্ত হতে হচ্ছে। আগুন জ¦ালানো কঠিন বলে অনেকে দূষিত ও বাসি খাবার খেয়ে ডায়রিয়ায় ভুগে থাকেন। পাতলা পায়খানার সাথে বমি, পানিশূন্যতা নিত্য ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। এ ধরনের রোগে দ্রুত ওরস্যালাইন খাওয়ানো, পর্যাপ্ত তরল গ্রহণ এবং প্রয়োজনে চিকিৎসকের পরামর্শ নেয়াটা জরুরি। এসব রোগে কোনো কোনো ক্ষেত্রে শুধুই খাবার স্যালাইন ও মেট্রোনিডাজল দিয়েই সুস্থ হওয়া যায়। তবে অনেকেই ডাক্তারের কাছে না গিয়ে ওষুধের দোকান থেকে অথবা নিজে নিজে অ্যান্টিবায়োটিকও কিনে খাচ্ছে। এভাবে কেউ কেউ সুস্থ হলেও সঠিক মাত্রায় এবং সঠিক ওষুধ খেতে না পারায় স্বাস্থ্যঝুঁকির মধ্যে পড়ছেন।

এ ব্যাপারে মেডিসিন বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা: সাজেদুর রহমান বলেন, বন্যার পরে আমাশয়, টাইফয়েড এবং ‘হেপাটাইটিস এ’ ও ‘হেপাটাইটিস ই’ সংক্রমণের ঝুঁকিও বেড়ে যায়। দূষিত পানি ও অস্বাস্থ্যকর পরিবেশের কারণে এসব রোগ ছড়ায়। দীর্ঘদিন জ্বর, রক্ত বা শ্লেষ্মাযুক্ত পায়খানা কিংবা জন্ডিসের লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত স্বাস্থ্যকেন্দ্রে যাওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন চিকিৎসকরা।

এ দিকে বন্যার পানি নেমে যাওয়ার পর জমে থাকা পানিতে মশার বংশবৃদ্ধি হওয়ার আশঙ্কা করছেন চিকিৎসকরা। ফলে ডেঙ্গুর প্রকোপও বৃদ্ধি পেতে পারে। জ্বর, মাথাব্যথা, শরীর ব্যথা বা ত্বকে র‌্যাশ দেখা দিলে অবহেলা না করে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেয়া উচিত। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ডেঙ্গু রোগীর জ্বর কমাতে প্যারাসিটামল ব্যবহার করলেই হয়। আর কোনো ব্যথার ওষুধ খাওয়ার নিষেধ করেছেন ডা: সাজেদুর রহমান। এ ছাড়া ডেঙ্গু হলে কোনো ধরনের অ্যান্টিবায়োটিক খেতে নিষেধ করা হয়েছে। ডেঙ্গু একটি ভাইরাল জ¦র, ভাইরাসে অ্যান্টিবায়োটিক কাজ করে না। দীর্ঘ সময় পানির সংস্পর্শে থাকার কারণে ভুক্তভোগীদের দাদ, খোসপাঁচড়া, ছত্রাকজনিত সংক্রমণসহ বিভিন্ন চর্মরোগের প্রকোপ বাড়ছে।

বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা বলছেন, বন্যাজনিত রোগ প্রতিরোধে কয়েকটি সাধারণ নিয়ম মেনে চললেই ঝুঁকি অনেকাংশে কমানো সম্ভব। নিরাপদ বা ফুটানো পানি পান করা, সাবান দিয়ে নিয়মিত হাত ধোয়া, খাবার ঢেকে রাখা, জমে থাকা পানি অপসারণ, শিশু, গর্ভবতী নারী, বয়স্ক এবং দীর্ঘমেয়াদি রোগীদের বিশেষ নজরদারিতে রাখা জরুরি। পাশাপাশি ওরস্যালাইন, প্যারাসিটামল, জিংক ট্যাবলেট, প্রাথমিক ক্ষত পরিচর্যার উপকরণ এবং নিয়মিত ব্যবহারের ওষুধ পর্যাপ্ত পরিমাণে সংরক্ষণ করারও পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। পানি বিশুদ্ধ করে পান করতে পানি বিশুদ্ধকরণ ট্যাবলেটও রাখতে বলেছেন তিনি।