নূরুল মোস্তফা কাজী চট্টগ্রাম ব্যুরো
চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড উপকূলে ফেরদৌস স্টিলের অভ্যন্তরে জাহাজ কাটতে গিয়ে ৯ শ্রমিকের মৃত্যুর দায় কার- সে প্রশ্ন সামনে এসেছে। কারখানা সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এটা হংকং কনভেনশন মেনে গড়া গ্রিন ইয়ার্ড। অন্য দিকে সরকারি যেসব সংস্থা ছাড়পত্র দিয়েছে জাহাজটি কাটার জন্য সেসব সংস্থাও দায় এড়িয়ে চলছেন। ফলে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠছে কাগজে-কলমে গ্যাস ফ্রি সনদ থাকলেও কেন গ্যাস নিঃসরণে তাদের মৃত্যু হলো? বিস্ফোরক পরিদফতর বলছে, তারা ছাড়পত্র দেয় তেল ও গ্যাসের অগ্নি বা বিস্ফোরণের ঝুঁকি আছে কি না। কিন্তু শ্রমিকদের মৃত্যুর কারণ হিসেবে বলা হচ্ছে হাইড্রোজেন সালফাইড গ্যাসের মারাত্মক উপস্থিতি, যা একটি টক্সিক (বিষাক্ত) উপাদান। তাহলে জাহাজটি টক্সিক উপাদান ফ্রি কি না- সে সনদ কারা দেয় সে প্রশ্ন সামনে আসছে। বিস্ফোরক অধিদফতর অবশ্য ইয়ার্ড কর্তৃপক্ষের যথেষ্ট সতর্কতা অবলম্বন না করাকেই দুর্ঘটনার কারণ হিসেবে উল্লেখ করছেন।
২০০৯ সালে গৃহীত শিপ রিসাইক্লিং-সংক্রান্ত আন্তর্জাতিক চুক্তি হংকং কনভেনশনে বাংলাদেশ গত বছর স্বাক্ষর করেছে। এই চুক্তি বাস্তবায়নের শেষ সময় ছিল গত বছরের ৩০ জুন। চুক্তির শর্ত অনুযায়ী, যারা গ্রিন ইয়ার্ড বা পরিবেশবান্ধব কারখানা হিসেবে সনদ পেয়েছে, এখন থেকে ওই প্রতিষ্ঠানগুলোই জাহাজ আমদানি করতে পারবে। ইতঃপূর্বে আমাদের দেশে শিপ ব্রেকিং ইয়ার্ড ছিল প্রায় ১৫০টি। এর মধ্যে ১০৫টি কারখানাকে পরিবেশবান্ধব (গ্রিন) করার লক্ষ্যে উন্নয়নকাজ করার অনুমোদন দিয়েছিল শিল্প মন্ত্রণালয়। কিন্তু ব্যয়বহুল হওয়ায় অনেক ইয়ার্ড মালিক তা বাস্তবায়ন করতে পারেননি।
আগেই নিরাপত্তা ঘাটতি ছিল ইয়ার্ডটির : গ্রিন ইয়ার্ড হলেও শ্রমিকদের পেশাগত নিরাপত্তা ঘাটতির অভিযোগ ছিল ফেরদৌস স্টিলের বিরুদ্ধে। কয়েক দফা চিঠি দিয়ে সতর্ক করার পরও পেশাগত নিশ্চিত না করার অভিযোগে গত ১৫ জুলাই ফেরদৌস স্টিলের বিরুদ্ধে শ্রম আদালতে মামলা করেছিল কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদফতর (ডিআইএফই)। এতে অভিযোগ করা হয়েছিল- শ্রমিকদের নিরাপত্তা বিষয়ে যথেষ্ট সচেতন না করা, ঝুঁকি মূল্যায়নের প্রতিবেদন না দেয়া, নির্ধারিত সময়ের বেশি কাজ করিয়েও ওভারটাইমের টাকা না দেয়াসহ বিভিন্ন অনিয়ম ধরা পড়ে ইয়ার্ডটিতে।
নিরাপত্তা ঘাটতির অভিযোগে ইয়ার্ডটির বিরুদ্ধে মামলার এক মাস পূর্ণ না হতেই গত শুক্রবার সকাল ৯টার দিকে ফেরদৌস স্টিলের ইয়ার্ডে ‘এমটি রাসি’ নামের ৩০ হাজার টন ওজনের স্ক্র্যাপ জাহাজটি কাটার সময় বিষাক্ত গ্যাসে অজ্ঞান হয়ে ৯ শ্রমিকের করুণ মৃত্যু ঘটে। জাহাজটি আগে এলএনজি পরিবহন করত। এটি কাটার জন্য ২০২৫ সালের জুলাইয়ে পরিবেশ অধিদফতরের ৫২৯তম সভায় প্রতিষ্ঠানটিকে ছাড়পত্রের অনুমোদন দেয়া হয়েছিল।
ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে বিস্ফোরক পরিদফতর চট্টগ্রামের সহকারী বিস্ফোরক পরিদর্শক এস এম সাখাওয়াত হোসেন বলেন, জাহাজের কার্গো ট্যাংকের পাশে থাকা ব্যালাস্ট এলাকায় (জাহাজের ভারসাম্য রক্ষার পানি রাখার স্থান) হাইড্রোজেন সালফাইড গ্যাস ছড়িয়ে পড়েছিল। জাহাজের ভারসাম্য রক্ষার জন্য এই অংশে পানি ধারণ করা হয়। বিষাক্ত ওই গ্যাসে আক্রান্ত হয়েই শ্রমিকদের মৃত্যু হয়েছে।
‘গ্যাসমুক্ত’ জাহাজ থেকে কিভাবে গ্যাস নিঃসরণ : এমটি রাসি নামে এলএনজি পরিবহনে ব্যবহৃত জাহাজটি প্রায় এক বছর আগে কাটার ছাড়পত্র পায়। জাহাজ কাটার আগে তা পরিদর্শন করে ছাড়পত্র দেয় বাংলাদেশ জাহাজ পুনঃপ্রক্রিয়াজাতকরণ বোর্ড। এর আগে নিয়ম অনুযায়ী বহিঃনোঙরে আসার পর বিস্ফোরক অধিদফতরও জাহাজ পরিদর্শন করে গ্যাস ও বিস্ফোরকমুক্ত সনদ দেয়। এ ক্ষেত্রেও তা প্রতিপালন করা হয়েছে কি না কিংবা সনদপ্রাপ্তির পরও কিভাবে গ্যাস লিকেজ হলো তা বড় প্রশ্ন হয়ে দেখা দিয়েছে। বিস্ফোরক অধিদফতরের কর্মকর্তারা বলছেন, আমরা তেল ও গ্যাসের অগ্নিঝুঁকিমুক্ত কি না- সে বিষয়ে ছাড়পত্র দিই এবং অতটুকু অংশ কাটার অনুমতি দিই। এখানে তো সে ধরনের কোনো বিস্ফোরণ বা অগ্নিঝুঁকির সৃষ্টি হয়নি। যেটা হয়েছে, সেটাতো টক্সিক উপদানের প্রভাবে।
কিন্তু এক দিকে গ্রিণ ইয়ার্ড, অন্য দিকে গ্যাস ফ্রি সনদ থাকার পরেও কিভাবে বিষাক্ত গ্যাস নিঃসরণের ৯ শ্রমিকের প্রাণ গেল, এর দায়-দায়িত্ব কার সেসব প্রশ্ন সামনে আসছে।
তদন্ত কমিটির ঘটনাস্থল পরিদর্শন : এ দিকে মর্মান্তিক দুর্ঘটনায় ৯ শ্রমিকের মৃত্যুর পর শিল্প সচিব আবদুন নাসের খানসহ তদন্ত কমিটির সদস্যরা গতকাল শনিবার ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন। তদন্ত কমিটির সদস্য সার্বিক নিরাপত্তাব্যবস্থা এবং সম্ভাব্য ত্রুটি খতিয়ে দেখেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
বিস্ফোরক অধিদফতরের চট্টগ্রামের কার্যালয়ের সহকারী বিস্ফোরক পরিদর্শক এস এম সাখাওয়াত হোসেন নয়া দিগন্তকে বলেন, গত শুক্রবার আমরা মোটামুটি দেখে এসেছিলাম, সেখানে বিষাক্ত গ্যাসের উপস্থিতি পেয়েছি। হাইড্রোজেন সালফাইড। আমাদের ধারণা হাইড্রোজেন সালফাইড বেশি পরিমাণে থাকার কারণে শ্রমিকরা মারা গেছেন। আজকে (গতকাল)ও আমরা ভিজিট করেছি। ভেতরে আমরা এখনো প্রবেশ করা সম্ভব হয়নি, ভেতরে যে বালাস্ট ওয়াটার ট্যাংকটি আন্ডার ওয়াটারে আছে, ভাটা এলে ফায়ার সার্ভিসের লোকজন পাম্প আউট করে খালি করা হবে। তিনি বলেন, জাহাজ কাটার আগে আমরা গ্যাস ফ্রি সার্টিফিকেট ইস্যু করি, জাহাজের ট্যাংক এবং ফুয়েল ট্যাংকের কার্গোগুলো ফ্রি করে আমাদের থেকে গ্যাস ফ্রি সার্টিফিকেট নেয়। এরপর আমরা ওই অংশটুকু কাটার অনুমতি দিই। ব্যালাস্ট এরিয়াতে নরমালি ওয়াটার থাকে। সেখানে ফুয়েল বা ওই রকম সাসপেক্টেড থাকতে পারে কি না সেটা তো উনাদের আগে থেকে সতর্ক হওয়ার প্রয়োজন। প্রয়োজন ছিল কোনো হ্যাজাডার্স এলিমেন্টের কোনো ডেফিসিয়েন্সি আছে কি না- তা নিশ্চিত হওয়া। তিনি বলেন, আমাদের কনসার্ন থাকে সব সময় ফায়ারিং এক্সপ্লোশনের বিষয়টা, এখানে এ রকম তো কিছু হয়নি। এখানে একটা টক্সিক এলিমেন্ট ছিল মাত্রাতিরিক্ত পরিমাণ- সেটির প্রভাবেই মানুষগুলো আক্রান্ত হয়েছে। আর আমরা কাজ করি অয়েল অ্যান্ড গ্যাস নিয়ে।
পরিবেশ অধিদফতরের চট্টগ্রাম জেলা কার্যালয়ের উপপরিচালক মো: মুজাহিদুর রহমান নয়া দিগন্তকে বলেন, জেলা প্রশাসন ও শিল্প মন্ত্রণালয় থেকে তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। আমরা পরিবেশগত ছাড়পত্র দিই, মূল পারমিশন দেয় শিল্প মন্ত্রণালয়, শিপ রিসাইক্লিং বোর্ড। এখানে যেসব হ্যাজাডার্স ওয়েস্ট থাকে তথা দূষণসংক্রান্ত যেসব বিষয় থাকে সেগুলো ম্যানেজমেন্টের বিষয়ে আমাদের নির্দেশনা থাকে ছাড়পত্রে। এটি তো দুর্ঘটনা, দূষণ না। সেফটি নিয়ে যেসব বিভাগ কাজ করে তাদের রুল এ ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। ছাড়পত্র দেয়ার পর ফিল্ড লেবেলে নজরদারি প্রসঙ্গে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেন, শিপব্রেকিং ইয়ার্ডগুলোতে পরিবেশ দূষণের বিষয়টি আমরা সার্বক্ষণিক নজরে রাখি। শিপইয়ার্ড মনিটরিংয়ের পার্ট হিসেবে এই জাহাজটির কাটিংও আমাদের নজরদারিতে ছিল।
কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদফতরের (ডিআইএফই) উপ-মহাপরিদর্শক মোহাম্মদ মাহবুবুল হাসান নয়া দিগন্তকে বলেন, শিপব্রেকিং শিল্প চট্টগ্রাম ছাড়া অন্য কোথাও নেই। এখানকার নিরাপত্তাব্যবস্থা হাইলি টেশনিক্যাল ম্যাটার। এখানে গ্যাস ফ্রি করেই জাহাজগুলো কাটতে হয়। কাটার অনুমতি দেয় বিস্ফোরক পরিদফতর ও পরিবেশ অধিদফতর। আমরা আমাদের দৃষ্টিতে কাজের সময় শ্রমিক নিরাপত্তা বিশেষত ফেইস মাস্ক দিয়েছে কি না, গামবুট দিয়েছে কি না, ওয়েল্ডিংয়ের সময় চোখের প্রোটেশনের ব্যবস্থা আছে কি না। কেমিক্যাল ম্যাটার আমাদের বিষয় না। ব্যক্তিগত নিরাপত্তার বিষয়ে আমরা কাজ করি। ইয়ার্ডটিকে আমরা ইতঃপূর্বেও সতর্ক করেছি এবং পরবর্তীতে মামলাও করা হয়েছে নিরাপত্তা ব্যবস্থা যেন আরো জোরদার করা হয়। বর্তমানে বিষয়টি নিয়ে উচ্চপর্যায়ের কমিটি কাজ করছে, ওই কমিটি সামগ্রিক বিষয়টি দেখবেন। তিনি বলেন, গ্রিন ইয়ার্ড হওয়ার পর এটা একটা বড় ধরনের দুর্ঘটনা।
বাংলাদেশ শিপ ব্রেকার্স অ্যান্ড রিসাইক্লারস অ্যাসোসিয়েশন (বিএসবিআরএ) সভাপতি মোহাম্মদ মহসিন নয়া দিগন্তকে জানান, গ্রিন ইয়ার্ডে এই ধরনের ঘটনা একেবারেই অনাকাক্সিক্ষত। সাধারণত আমরা যেসব নিয়ম নীতি ফলো করি তাতে বিপদ হওয়ার কথা নয়। নিয়ম মেনেই জাহাজ কাটা হচ্ছিল জানিয়ে তিনি বলেন, আমরা বিএসবিআরএ খুবই দুঃখিত ও মর্মাহত এ ঘটনায়। পাশাপাশি কী কারণে ঘটনা ঘটেছে তা খতিয়ে দেখতে আমরা একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছি। শিল্প মন্ত্রণালয় একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে। শিল্প মন্ত্রণালয়ের সচিব ইয়ার্ডটি পরিদর্শন করে দু’টি কমিটি একসাথে করে সমন্বিতভাবে কাজ করার জন্য নির্দেশ দিয়েছেন। তদন্তের বাইরে এর বেশি কিছু তিনি বলতে চাননি।
শিল্প মন্ত্রণালয়ের সচিব আবদুন নাসের খান জানান, সর্বশেষ দুর্ঘটনার কারণ ও নিরাপত্তাব্যবস্থায় কোথায় ঘাটতি ছিল, তা খুঁজে বের করতে এরইমধ্যে গঠিত তদন্ত কমিটি কাজ করছে। সাত দিনের মধ্যে কমিটিকে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে। কার গাফিলতি ছিল, কোথায় নিরাপত্তার ঘাটতি ছিল এবং ভবিষ্যতে এ ধরনের দুর্ঘটনা ঠেকাতে কী ব্যবস্থা নেয়া প্রয়োজন- সব বিষয় তদন্তে বেরিয়ে আসবে।



