প্রশিক্ষণের অভাব-ঝুঁঁকিপূর্ণ ভবনের জন্যই ঘটে দুর্ঘটনা

মাইলস্টোন ট্র্যাজেডি নিয়ে তদন্ত প্রতিবেদন

Printed Edition
মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজে বিমান দুর্ঘটনায় বছরপূর্তি উপলক্ষে অনুষ্ঠানে নিহত শিক্ষার্থীদের স্মরণে দোয়া করা হয় : নয়া দিগন্ত
মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজে বিমান দুর্ঘটনায় বছরপূর্তি উপলক্ষে অনুষ্ঠানে নিহত শিক্ষার্থীদের স্মরণে দোয়া করা হয় : নয়া দিগন্ত

নিজস্ব প্রতিবেদক

রাজধানীর উত্তরায় মাইলস্টোন স্কুলে বিমান দুর্ঘটনার প্রধান কারণ ছিল ইনস্ট্রাক্টরদের অপর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ ও তদারকি। তবে একটি ঝুঁঁকিপূর্ণ ভবন, দুর্বল পরিকল্পনা এবং জরুরি সাড়া দিতে ব্যর্থতায় ক্ষয়ক্ষতির মাত্রা বহুলাংশে বেড়ে যায়।

ঘটনাটি তদন্তে গঠিত নিরপেক্ষ কমিশন তাদের চূড়ান্ত প্রতিবেদনে এমন তথ্য উল্লেখ করেছে। প্রতিবেদনে বিমানবন্দর রানওয়ের কাছাকাছি জনবহুল স্থাপনা থাকার চরম ঝুঁকি সম্পর্কে সতর্ক করে দিয়ে ফ্লাইট পাথের (উড্ডয়ন রুট) নিচে অবস্থিত স্কুল, হাসপাতাল ও ক্লিনিকের মতো প্রতিষ্ঠানগুলো ধীরে ধীরে সরিয়ে নেয়ার সুপারিশ করা হয়েছে।

এ ছাড়া এ দুর্ঘটনার জন্য দায়ী বিমানবাহিনীর সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা এবং রাজউকের পরিকল্পনা, ভূমির ব্যবহার ও ভবন নির্মাণবিধি লঙ্ঘনের পেছনে থাকা কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে।

কমিশন গত বছরের ৪ নভেম্বর তৎকালীন প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের কাছে এই তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেয়, যার একটি অনুলিপি সম্প্রতি একটি ইংরেজি দৈনিকের হাতে এসেছে।

উল্লেখ্য, গত বছরের এই দিনে মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজের দিয়াবাড়ী ক্যাম্পাসের ‘হায়দার আলী’ ভবনে বিমানবাহিনীর একটি ঋঞ-৭ইএও প্রশিক্ষণ বিমান ভেঙে পড়ে। এতে প্রাণ হারান ৩৬ জন, যাদের বেশির ভাগই শিশু।

ঘটনার মূল কারণ : ‘হিউম্যান এরর’ ও তদারকির ঘাটতি : তদন্ত প্রতিবেদন অনুযায়ী, ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট তৌকির ইসলাম নিয়মিত বিরতিতে পর্যাপ্ত উড্ডয়ন প্রশিক্ষণ পাননি। ফলে জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত সঠিক সিদ্ধান্ত নেয়ার মতো প্রয়োজনীয় দক্ষতা ও প্রস্তুতি তার ছিল না। একই সাথে তার কমান্ডিং অফিসার (ওসি) ও গ্রাউন্ড সুপারভাইজারের পক্ষ থেকেও তদারকিতে বড় ধরনের ঘাটতি ছিল।

কমিশন জানিয়েছে, দুর্ঘটনার মূল কারণ মানবীয় ভুল হলেও কোনো পরিবেশগত উপাদান (যেমন পাখির আঘাত) এই অঘটনকে ত্বরান্বিত করে থাকতে পারে। দুর্ঘটনাকবলিত বিমানের সিসিটিভি ফুটেজে উইন্ডস্ক্রিনে একটি কালো দাগ দেখা যায়। বিমানবাহিনীর অভ্যন্তরীণ তদন্তে এটি পাখি বা অন্য কোনো উড়ন্ত বস্তুর আঘাত হতে পারে বলে ধারণা করা হলেও কমিশন তা নিশ্চিত করেনি।

উড্ডয়নকালে পাইলট কন্ট্রোল স্টিক হঠাৎ সজোরে টান দিলে বিমানটি ‘স্টল’ করে (উড়ার ক্ষমতা হারায়) এবং পাইলট আর বিমানের নিয়ন্ত্রণ ফিরে পাননি। তবে বিমানের ইঞ্জিন, হাইড্রোলিক বা কন্ট্রোল সিস্টেমে কোনো ত্রুটির প্রমাণ মেলেনি। বিমান ও ইঞ্জিন তাদের নির্দিষ্ট মেয়াদসীমার মধ্যেই ছিল এবং নিয়মিত পরিদর্শন সম্পন্ন হয়েছিল। এমনকি ফ্লাইট শুরুর আগে পাইলটকে শারীরিক ও মানসিকভাবে উপযুক্ত ঘোষণা করা হয়েছিল।

তবে পাইলটের প্রথম ‘সোলো-ফ্লাইট’ প্ল্যান এবং তার কমান্ডিং অফিসারের নির্দেশের মধ্যে একটি অসঙ্গতি খুঁজে পেয়েছে কমিশন। নির্ধারিত পরিকল্পনা অনুযায়ী দ্বিতীয় সার্কিটে পাইলটের ‘খড়ি এড়’ করার কথা ছিল, কিন্তু কমান্ডিং অফিসার তাকে পুনরায় ‘ওহরঃরধষ’-এ ফিরে গিয়ে আরেকটি সার্কিট শুরু করার নির্দেশ দেন। এ ঘটনায় গঠিত তদন্ত কমিশন জড়িত অফিসারদের বিরুদ্ধে বিমানবাহিনীর নিজস্ব বিধিমালান অনুযায়ী ব্যবস্থা নেয়ার সুপারিশ করেছে।

ঝুঁকিপূর্ণ ভবন ও রাজউকের অবহেলা : কমিশনের মতে, ‘হায়দার আলী’ ভবনের গঠনগত ত্রুটি ও অননুমোদিত ব্যবহার হতাহতের সংখ্যা বাড়িয়ে দিয়েছিল। বিমানটি ভবনের একমাত্র সিঁড়ির ঠিক পাশেই আছড়ে পড়ে। ফলে তীব্র আগুন ও ধোঁয়ায় একমাত্র বের হওয়ার পথটি অবরুদ্ধ হয়ে পড়ে।

ভবনটিতে ৭৩৭ জন শিক্ষার্থী ও ৫০ জনের বেশি শিক্ষকের জন্য ১৯টি ক্লাসরুম ছিল, অথচ সিঁড়ি ছিল মাত্র একটি (ফায়ার সার্ভিস বিধি অনুযায়ী অন্তত তিনটি থাকা আবশ্যক)। ভবনের করিডোর ছিল প্রায় চার ফুট প্রশস্ত, যেখানে ন্যূনতম প্রয়োজন ছয় ফুট। এ ছাড়া শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের ফায়ার ড্রিল বা অগ্নি নির্বাপণ সংক্রান্ত প্রাথমিক কোনো ধারণা ছিল না।

মাইলস্টোন কর্তৃপক্ষ ‘হায়দার আলী’ ভবনের কোনো বৈধ অনুমোদনপত্র দেখাতে পারেনি। অন্য ভবনের নকশা অনুমোদনের সময় ভবনটি ভেঙে ফেলার প্রতিশ্রুতি দিলেও সেখানে ক্লাস নেয়া অব্যাহত রাখা হয়। ক্যাম্পাসের ১৭টি স্থায়ী ও অস্থায়ী কাঠামোর মধ্যে মাত্র সাতটির রাজউক অনুমোদন ছিল।

রাজউক অননুমোদিত ভবন এবং আবাসিক সুবিধাসম্পন্ন (অ২ ক্যাটাগরি) ভবনের অবৈধ ব্যবহার সম্পর্কে অবহিত থাকা সত্ত্বেও কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। তবে মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজের উপদেষ্টা কর্নেল (অব:) নুরন নবী এসব অভিযোগ অস্বীকার করে দাবি করেন, ভবনগুলো রাজউকের অনুমোদন নিয়েই তৈরি করা হয়েছিল। কমিশন অনতিবিলম্বে ‘হায়দার আলী’ ভবন ভেঙে ফেলার এবং অন্য অননুমোদিত ভবনগুলোতে ক্লাস নেয়া স্থগিতের সুপারিশ করেছে।

বিমানবন্দর এলাকা থেকে স্থাপনা সরানোর সুপারিশ

কমিশনের সদস্য ও নগর পরিকল্পনাবিদ আদিল মোহাম্মদ খান বলেন, বিমান উড্ডয়ন ও অবতরণের সময়টি সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ। এই রুটের নিচে হাসপাতাল, স্কুল ও বাণিজ্য কেন্দ্র থাকা চরম বিপজ্জনক। আমাদের সুপারিশ বিদ্যমান ও নতুন বিমানবন্দরগুলোর চার পাশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সংবেদনশীল অবকাঠামো নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে সরিয়ে নিতে হবে। শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের আশপাশের এলাকাটি আগে প্লাবন অঞ্চল ও জলাধার হিসেবে চিহ্নিত ছিল। কিন্তু রাজউক ভূমি ব্যবহারে নিয়ন্ত্রণ রাখতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছে। ২০১৫ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে উচ্চতা সীমার নিয়ম ভাঙা ৬৩০টি ভবনের বিষয়ে বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (বেবিচক) রাজউককে জানালেও কোনো দৃশ্যমান ব্যবস্থা নেয়া হয়নি।

ক্ষতিপূরণ ও সার্বিক সুপারিশ : কমিশন ঢাকা শহরের বাইরে সামরিক বিমানের প্রশিক্ষণের জন্য পৃথক একটি এয়ারবেস তৈরির পরামর্শ দিয়েছে। এ ছাড়া দুর্ঘটনাত্তোর উদ্ধারকাজে সমন্বয়হীনতার সমালোচনা করে জরুরি রেসপন্স ড্রিল, বার্ন ইনস্টিটিউটের আধুনিকীকরণ এবং স্পেশালাইজড ট্রেনিংয়ের তাগিদ দিয়েছে।

নিহতদের মধ্যে শিশুদের ক্ষেত্রে পরিবারপ্রতি এক কোটি টাকা; প্রাপ্তবয়স্কদের পরিবারপ্রতি ৮০ লাখ টাকা; গুরুতর আহত শিশুদের প্রত্যেকের জন্য ৬০ লাখ টাকা (মাঝারি : ৩০ লাখ, মৃদু : ১৫ লাখ); গুরুতর আহত প্রাপ্তবয়স্কদের প্রত্যেকের জন্য ৪০ লাখ টাকা (মাঝারি : ২০ লাখ, মৃদু : ১০ লাখ) ক্ষতিপূর দেয়ার সুপারিশ করা হয়েছে। এ ছাড়া ক্ষতিপূরণের একটি অংশ সরাসরি ও বাকি অংশ দীর্ঘমেয়াদি সঞ্চয়পত্রে জমা রাখার প্রস্তাব করা হয়েছে।

এ বিষয়ে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের সচিব সাইদুর রহমান খান জানান, তদন্ত প্রতিবেদন পাওয়ার পর সংশ্লিষ্ট দফতরগুলোকে প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা দেয়া হয়েছে। রাসায়নিক দুর্ঘটনা, অগ্নিকাণ্ড, বিমান দুর্ঘটনা বা ভূমিকম্পের মতো দুর্যোগ পরবর্তী পরিস্থিতি দ্রুত মোকাবেলার জন্য একটি মানসম্মত এসওডি চূড়ান্তে কাজ চলছে।

শহীদদের স্মরণ : গতকাল বেদনাদায়ক এই দুর্ঘটনার এক বছর পূর্ণ হয়েছে। ২০২৫ সালের ২১ জুলাই এই ভয়াবহ দুর্ঘটনায় পাইলট তৌকির ইসলামসহ (সাগর) শহীদ হন ৩৭ জন। তাদের মধ্যে মাইলস্টোন স্কুল শাখার ২৮ জন শিশু, তিনজন অভিভাবক, তিনজন শিক্ষক এবং একজন সেবিকা রয়েছেন।

হৃদয়সিক্ত শ্রদ্ধাঞ্জলি, শোক প্রকাশ আর বেদনামথিত স্মৃতি চারণের মাধ্যমে মর্মান্তিক এ দুর্ঘটনায় শহীদদের গতকাল স্মরণ করেছে মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজ। সকাল ১০টায় দুর্ঘটনাস্থল হায়দার আলী একাডেমিক ভবনের সামনে স্থাপিত বেদিতে ফুলেল শ্রদ্ধা জানানো হয়। হতাহতদের শ্রদ্ধা জানাতে বিএনসিসি, রোভার স্কাউট, গার্লস গাইড, শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের উপস্থিতিতে সশ্রদ্ধ সালাম জানানো হয়। এ সময় শহীদদের স্মরণে এক মিনিট নিরবতা পালন এবং দোয়ার আয়োজন করা হয়। শ্রদ্ধাজ্ঞাপন ও স্মরণ অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন মাইলস্টোন কলেজের প্রতিষ্ঠাতা ও উপদেষ্টা কর্নেল (অব:) নুরন নবী, অধ্যক্ষ মোহাম্মদ জিয়াউল আলম, উপাধ্যক্ষ (প্রশাসন) মো: মাসুদ আলম, মাইলস্টোন প্রিপারেটরি কেজি স্কুলের নির্বাহী অধ্যক্ষ মিসেস রিফাত নবী আলম এবং মাইলস্টোন স্কুল দিয়াবাড়ি ক্যাম্পাসের অধ্যক্ষ ক্যাপ্টেন (অব:) মো: জাহাঙ্গীর আলম খান ।

বিকেলে ছিল আলোচনা সভা, হতাহত শিক্ষার্থীদের অভিভাবকদের স্মৃতিচারণ ও দোয়া মাহফিল। আলোচনা সভায় বক্তব্য রাখেন ঢাকা মহানগর (উত্তর) বিএনপির সদস্যসচিব মো: মোস্তফা জামান এবং মাইলস্টোন কলেজের প্রতিষ্ঠাতা ও উপদেষ্টা কর্নেল (অব:) নুরন নবী। অনুষ্ঠানে স্মৃতিচারণ করেন বিমান দুর্ঘটনায় নিহত শিক্ষিকা মেহেরীন চৌধুরীর স্বামী মনসুর হেলাল, নিহত শিক্ষার্থী তাসনিয়া হকের বাবা নাজমুল হক, আহত শিক্ষার্থী জাইয়ানা মাহবুবের মা সানজিদা বেলায়েত এবং আহত শিক্ষার্থী নাভিদ নাওয়াজ দীপ্তর বাবা মো: মিজানুর রহমান প্রমুখ। পরে নিহতদের মাগফিরাত এবং আহতদের সুস্থতা কামনা করা হয়।