জনতা ব্যাংকের ঋণের ৭০ ভাগেরও বেশি খেলাপি

ইচ্ছাকৃত খেলাপি ও প্রকৃত সঙ্কটে পড়া ঋণগ্রহীতাকে আলাদা করার নির্দেশ অর্থ মন্ত্রণালয়ের

সৈয়দ সামসুজ্জামান নীপু
Printed Edition

রাষ্ট্রায়ত্ত খাতের দ্বিতীয় বৃহত্তম ব্যাংক জনতার আর্থিক দুর্বস্থার কোনো পরিবর্তন হচ্ছে না। বিগত ১৭ বছরের ‘লুটপাটের’ কারণে জনতা ব্যাংকের খেলাপি ঋণ বছরখানেক ধরে ৭০ শতাংশের উপরে রয়েছে। পতিত আওয়ামী লীগ সরকারের সময় খেলাপি ঋণের এই হার লুকিয়ে রাখা হলেও গত দুই বছর ধরে তা প্রকাশ করা হচ্ছে। ২০২৫ সালের ডিসেম্বর শেষে ব্যাংকটির মোট ঋণস্থিতি ছিল প্রায় ৯৭ হাজার ৯৩৪ কোটি টাকা। এর মধ্যে খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়ায় ৭২ হাজার ৫৩৯ কোটি টাকা, অর্থাৎ মোট ঋণের প্রায় ৭৪ শতাংশ। এখন তা কিছুটা কমে ৭১ শতাংশের ঘরে রয়েছে। তবুও এই হার শুধু রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক নয়, দেশের সামগ্রিক ব্যাংকিং খাতের জন্যও অত্যন্ত উদ্বেগজনক বলে করছে অর্থ মন্ত্রণালয়।

রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর সাথে ধারাবাহিক বৈঠকের অংশ হিসেবে গত সপ্তাহে জনতা ব্যাংক কর্তৃপক্ষের সাথে বৈঠকের আয়োজন করে অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ। এই বৈঠকে জনতা ব্যাংকের সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে বলা হয়, ইচ্ছাকৃত খেলাপি ও প্রকৃত সঙ্কটে পড়া ঋণগ্রহীতাকে আলাদা করে খেলাপি ঋণ দ্রুত আদায়ের পদক্ষেপ নিতে হবে।

এতে বলা হয়, দুর্বল মূলধন পরিস্থিতি, অল্পসংখ্যক বড় ঋণগ্রহীতার হাতে ঋণের বড় অংশ কেন্দ্রীভূত থাকা, ঋণাত্মক নিট সুদ মার্জিন, উচ্চ ব্যয়ের আমানতের ওপর নির্ভরতা এবং পরিচালন ও সুশাসনের দুর্বলতা প্রকট আকারে রয়েছে জনতায়। জানা গেছে, জনতা ব্যাংকের মাত্র ৩৩টি বড় গ্রাহকের খেলাপি ঋণের পরিমাণ ৫৬ হাজার ১৩১ কোটি টাকা। এসব গ্রাহকের মধ্যে ২৭টি প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্ধারিত একক গ্রাহক ঋণসীমার চেয়েও বেশি ঋণ পেয়েছিল। ফলে একটি সীমিতসংখ্যক বড় ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর ওপর ব্যাংকের ঋণঝুঁকি অতিরিক্ত কেন্দ্রীভূত হয়েছে। এসব ঋণগ্রহীতার মধ্যে রয়েছে বেক্সিমকো ও এস আলম গ্রুপ। এরাই ব্যাংকটি থেকে বেশির ভাগ ঋণ নিয়ে আর পরিশোধ করেনি।

ঋণ অনিয়ম ও ঝুঁকিপূর্ণ ঋণ বিতরণের বিষয়টিও জনতা ব্যাংকের সঙ্কটের অন্যতম কারণ। ২০২৪ সালের শেষে ব্যাংকটির খেলাপি ঋণ বেড়ে ৬৭ হাজার ৩০০ কোটি টাকায় পৌঁছেছিল, যা তখন দেশের ব্যাংকিং খাতে সর্বোচ্চ ছিল। একই সময়ে ব্যাংকটির মোট ঋণ ছিল প্রায় এক লাখ ৮০০ কোটি টাকা। বিভিন্ন বড় ঋণগ্রহীতার ঋণ পরবর্তী সময়ে খেলাপি হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ হওয়ায় ব্যাংকের সম্পদের মান দ্রুত অবনতি ঘটে।

এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে ব্যাংকের মুনাফা ও মূলধনে। ২০২৪ সালে জনতা ব্যাংক প্রায় তিন হাজার ৭১ কোটি টাকা লোকসান করেছিল। ২০২৫ সালেও পরিস্থিতির উন্নতি হয়নি; প্রকাশিত নিরীক্ষিত আর্থিক প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ওই বছর ব্যাংকটির নিট লোকসান ছিল প্রায় তিন হাজার ৯৩১ কোটি টাকা। একই সময়ে সুদ খাতেও প্রায় পাঁচ হাজার ৯০৩ কোটি টাকা লোকসান হয়েছে।

আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ বলছে, এই পরিস্থিতি উন্নয়নের জন্য শ্রেণিকৃত ও অবলোপন করা ঋণ আদায়ে প্রতিটি হিসাবের নির্দিষ্ট লক্ষ্য, কর্মকর্তাভিত্তিক দায়িত্ব ও মাসিক নজরদারি রাখতে হবে। বড় ঋণ হিসাব পরিচালনা পর্ষদ পর্যায়েও নিয়মিত পর্যালোচনা করতে হবে এবং আদায়ের ফল ব্যবস্থাপনার জবাবদিহির সাথে যুক্ত করতে হবে।

ব্যাংকের বিপুল পরিমাণ ঋণ বিভিন্ন মামলায় আটকে রয়েছে। শুধু মামলা দায়ের করাকে ঋণ আদায়ের পদক্ষেপ হিসেবে না দেখে বড় মামলাগুলোর পর্যায়, ডিক্রি হয়েছে কি না- তা কার্যকর করার অবস্থা, জামানতের অবস্থান এবং প্রকৃত আদায়ের সম্ভাবনা নিয়মিত পর্যালোচনা করার কথাও বলা হয়েছে সভায়।

বাংলাদেশ ব্যাংকের বিশেষ এক্সিট সুবিধা প্রকৃত সঙ্কটে থাকা ঋণগ্রহীতার ক্ষেত্রে ব্যবহার করা গেলেও তা যেন কৃত্রিমভাবে ঋণ সচল দেখানো বা অযৌক্তিক ছাড় দেয়ার মাধ্যম না হয়- সে বিষয়ে সতর্ক করা হয়েছে। সভায় বলা হয়েছে, ইচ্ছাকৃত খেলাপি ও প্রকৃত সঙ্কটে পড়া ঋণগ্রহীতাকে আলাদা করে দেখতে হবে। বড় কোনো এক্সিট প্রস্তাবে সম্ভাব্য নগদ আদায়, জামানত ও ব্যাংকের সম্ভাব্য ক্ষতি স্পষ্ট করতে হবে।

খেলাপি ঋণের পাশাপাশি ব্যাংকটির মূলধন পরিস্থিতিও অত্যন্ত দুর্বল। নিয়ন্ত্রক ছাড় বা সময় বাড়ালেই এ দুর্বলতা দূর হবে না। তাই বিশ্বাসযোগ্য মধ্যমেয়াদি মূলধন পুনর্গঠন পরিকল্পনার বিষয়েও আলোচনা হয়েছে সভায়।

এ দিকে জনতা ব্যাংকের প্রায় ২৩ হাজার ৩৭২ কোটি টাকা ঋণ নিয়ে শীর্ষ রয়েছে বেক্সিমকো গ্রুপ। এটি খেলাপি হওয়ার পরিমাণের দিক থেকে সবচেয়ে বড়।

এস আলম গ্রুপ জনতা ব্যাংকে প্রায় ৯ হাজার ২৭৩ কোটি টাকা ঋণ নিয়ে খেলাপি। অ্যাননটেক্স গ্রুপ প্রায় সাত হাজার ৬৮৬ কোটি টাকা। ক্রিসেন্ট গ্রুপ প্রায় দুই হাজার ৩৯ কোটি টাকা। রতনপুর গ্রুপ প্রায় এক হাজার ২২৭ কোটি টাকা। রিমেক্স ফুটওয়্যার লিমিটেড প্রায় এক হাজার ১৩৪ কোটি টাকা। র‌্যাংকো গ্রুপ প্রায় এক হাজার ১৩২ কোটি টাকা খেলাপি হয়ে আছে।