বিশেষ সংবাদদাতা
দীর্ঘ এক দশকের বেশি সময় ধরে সিএনজি বিক্রিতে কমিশন বা মার্জিন অপরিবর্তিত থাকায় দেশের সিএনজি ফিলিং স্টেশনগুলো পরিচালনা করা কঠিন হয়ে পড়েছে বলে দাবি করেছেন স্টেশন মালিকরা। ধারাবাহিকভাবে গ্যাস ও বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধি, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, শ্রমিকদের মজুরি বৃদ্ধি, ব্যাংক সুদের হার এবং পরিচালন ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় ব্যবসা টিকিয়ে রাখা এখন বড় চ্যালেঞ্জে পরিণত হয়েছে বলে অভিযোগ তাদের। এই পরিস্থিতিতে চার দফা দাবি আদায়ে আগামী ৩০ জুলাই দেশব্যাপী এক দিনের ধর্মঘটের ঘোষণা দিয়েছে বাংলাদেশ সিএনজি ফিলিং স্টেশন অ্যান্ড কনভার্শন ওয়ার্কশপ ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন। দাবি পূরণে সরকারের পক্ষ থেকে কার্যকর উদ্যোগ না এলে আগামী ২৩ আগস্ট থেকে দেশব্যাপী সব সিএনজি ফিলিং স্টেশন অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ রাখারও ঘোষণা দিয়েছে সংগঠনটি।
গতকাল মঙ্গলবার রাজধানীর বিজয়নগরের আকরাম টাওয়ারে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এ কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়। কর্মসূচি বাস্তবায়নের লক্ষ্যে গঠিত স্টিয়ারিং কমিটির আহ্বায়ক আমিরুজ্জামান চৌধুরী লিখিত বক্তব্যে বলেন, বহুবার সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে দাবি জানিয়েও কোনো ইতিবাচক সাড়া না পাওয়ায় তারা আন্দোলনের পথ বেছে নিতে বাধ্য হয়েছেন। সংবাদ সম্মেলনে সংগঠনের সভাপতি মনোরঞ্জন ভক্ত, মহাসচিব ফারহান নূরসহ কেন্দ্রীয় নেতারা উপস্থিত ছিলেন।
১১ বছর ধরে একই কমিশন
সংগঠনের দাবি, ২০১৫ সালের ১ সেপ্টেম্বর থেকে প্রতি ঘনমিটার সিএনজি বিক্রিতে কমিশন নির্ধারিত রয়েছে আট টাকা। এরপর গত ১১ বছরে দেশের অর্থনীতিতে ব্যাপক পরিবর্তন এলেও কমিশনের হার অপরিবর্তিত রয়েছে। এই সময়ের মধ্যে আটবার বিদ্যুতের দাম বেড়েছে, মূল্যস্ফীতি রেকর্ড পর্যায়ে পৌঁছেছে, শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি বৃদ্ধি পেয়েছে, ডলারের দাম বেড়েছে, ব্যাংক ঋণের সুদ ও গ্যারান্টি কমিশন বৃদ্ধি পেয়েছে। ফলে সিএনজি স্টেশন পরিচালনার ব্যয় আগের তুলনায় অনেক বেড়ে গেলেও কমিশন অপরিবর্তিত থাকায় বেশির ভাগ স্টেশন লোকসানে পরিচালিত হচ্ছে বলে দাবি করেন মালিকরা। তাদের ভাষ্য, সিএনজির ক্রয় ও বিক্রয়মূল্য সরকার নির্ধারণ করে দেয়। ফলে অতিরিক্ত ব্যয় গ্রাহকের ওপর চাপিয়ে দেয়ার কোনো সুযোগ নেই। এতে ব্যবসার টিকে থাকাই এখন কঠিন হয়ে পড়েছে।
চার দফা দাবি
সংবাদ সম্মেলনে সরকারের কাছে চারটি দাবি জানানো হয়। প্রথমত, বর্তমান আট টাকার পরিবর্তে প্রতি ঘনমিটারে কমিশন ১৩ টাকা ৯৬ পয়সা নির্ধারণ করতে হবে। দ্বিতীয়ত, ভবিষ্যতে সিএনজি উৎপাদনে ব্যবহৃত গ্যাস বা বিদ্যুতের দাম বাড়ানো হলে কমিশন বা মার্জিনও স্বয়ংক্রিয়ভাবে আনুপাতিক হারে সমন্বয় করতে হবে। তৃতীয়ত, গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধির কারণে পুরনো গ্রাহকদের কাছ থেকে নতুন করে অতিরিক্ত জামানত আদায়ের প্রথা বাতিল করতে হবে। চতুর্থত, সড়ক ও জনপথ বিভাগের ভূমি বা সংযোগ সড়কের ইজারা, বিভিন্ন সরকারি সংস্থার লাইসেন্স ফি এবং নবায়ন ফি যৌক্তিক পর্যায়ে কমিয়ে আনতে হবে।
এক প্রশ্নের জবাবে সংগঠনের মহাসচিব ফারহান নূর কমিশন আট টাকা থেকে বাড়িয়ে ১৩ টাকা ৯৬ পয়সা করার পক্ষে দু’টি প্রধান যুক্তি তুলে ধরেন। তিনি বলেন, ২০১৫ সালের পর সরকার সাতবার বিদ্যুতের দাম বাড়িয়েছে। সর্বশেষ ২০২৬ সালের ৩ জুন বিদ্যুতের দামবৃদ্ধির ফলে প্রতিটি সিএনজি স্টেশনের মাসিক বিদ্যুৎ ব্যয় প্রায় ২০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়ে যাবে। এই অতিরিক্ত ব্যয় সমন্বয়ের জন্য কমিশন দুই টাকা ৪৬ পয়সা বাড়ানো প্রয়োজন। এ ছাড়া বর্তমান উচ্চ মূল্যস্ফীতি, শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি বৃদ্ধি, যন্ত্রপাতির খুচরা যন্ত্রাংশের দাম বৃদ্ধি এবং বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময় হারের ঊর্ধ্বগতির কারণে পরিচালন ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। এসব ব্যয় সমন্বয়ের জন্য আরো তিন টাকা ৫০ পয়সা কমিশন বাড়ানোর দাবি জানানো হয়েছে।
এক দশক ধরে ঝুলে থাকা সুপারিশ
অপর এক প্রশ্নের জবাবে সংগঠনের মহাসচিব বলেন, কমিশন বৃদ্ধির দাবি নতুন নয়। এর আগে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রণালয় এবং পেট্রোবাংলার প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে গঠিত একটি উচ্চপর্যায়ের টেকনিক্যাল কমিটি কমিশন বা মার্জিন দুই টাকা ৯৮ পয়সা বাড়ানোর সুপারিশ করেছিল। কিন্তু বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) ২০১৫ সালে মাত্র এক টাকা মার্জিন বৃদ্ধি করে। বাকি এক টাকা ৯৮ পয়সা বৃদ্ধির সুপারিশ দীর্ঘ এক দশক ধরে বাস্তবায়ন না করে ফাইলবন্দী করে রাখা হয়েছে বলে তিনি অভিযোগ করেন। তিনি বলেন, পরিবেশবান্ধব ও জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সিএনজিকে বেসরকারি খাতে ছেড়ে দিয়েছিল বিএনপি সরকার। আর এ কারণেই কমিশন নিয়ে বিগত আওয়ামী লীগ সরকার বারবার সুরাহা করার উদ্যোগ নিলেও তা বাস্তবায়ন করেনি। তাদের দাবি, যদি সেই সুপারিশ তখন বাস্তবায়ন করা হতো, তাহলে বর্তমান পরিস্থিতি এতটা জটিল হতো না। সংগঠনের নেতাদের অভিযোগ, তারা একাধিকবার বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রণালয় এবং বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) চেয়ারম্যানের সাথে সাক্ষাতের চেষ্টা করেছেন। কিন্তু এখন পর্যন্ত আনুষ্ঠানিকভাবে তাদের দাবি উপস্থাপনের সুযোগ পাননি। আলোচনার মাধ্যমে সমস্যার সমাধানই তাদের প্রথম পছন্দ। কিন্তু দীর্ঘদিন কোনো সাড়া না পাওয়ায় আন্দোলনের কর্মসূচি ঘোষণা করতে বাধ্য হয়েছেন।
আন্দোলনের কর্মসূচি
ঘোষিত কর্মসূচি অনুযায়ী আগামী ৩০ জুলাই সকাল ৬টা থেকে রাত ১২টা পর্যন্ত দেশের সব সিএনজি ফিলিং স্টেশন প্রতীকীভাবে বন্ধ থাকবে। তবে এ সময় সরকারের সাথে আলোচনা চালিয়ে যাওয়ার সুযোগ খোলা রাখা হয়েছে। যদি ওই সময়ের মধ্যে কোনো কার্যকর সমাধান না আসে, তাহলে আগামী ২৩ আগস্ট থেকে দেশব্যাপী অনির্দিষ্টকালের জন্য সব সিএনজি ফিলিং স্টেশন বন্ধ রাখা হবে। সংগঠনটি বলছে, সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ সৃষ্টি তাদের উদ্দেশ্য নয়। তবে ব্যবসা টিকিয়ে রাখার স্বার্থে আন্দোলনের বিকল্প নেই।
ঝুঁকিতে পাঁচ হাজার কোটি টাকার বিনিয়োগ
সিএনজি খাতে প্রায় পাঁচ হাজার কোটি টাকার বিনিয়োগ রয়েছে বলে দাবি করেছে অ্যাসোসিয়েশন। তাদের মতে, কমিশন বৃদ্ধি না হওয়ায় এই বিনিয়োগ এখন বড় ধরনের ঝুঁকির মুখে পড়েছে। স্টেশন পরিচালনার ব্যয় দ্রুত বাড়লেও আয় একই থাকায় অনেক উদ্যোক্তা ঋণের কিস্তি, বিদ্যুৎবিল, গ্যাস বিল, কর্মচারীদের বেতন এবং নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় পরিশোধে হিমশিম খাচ্ছেন। ফলে অনেক স্টেশন আর্থিক সঙ্কটে পড়েছে এবং ভবিষ্যতে আরো অনেক স্টেশন বন্ধ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এ অবস্থায় সিএনজি স্টেশন মালিকরা দ্রুত আলোচনার মাধ্যমে একটি গ্রহণযোগ্য সমাধানে পৌঁছানোর আহ্বান জানিয়েছেন। একই সাথে সরকারের প্রতি তাদের দাবি, কমিশন কাঠামো সময়োপযোগী করে ব্যবসা পরিচালনার অনুকূল পরিবেশ নিশ্চিত করা হলে ধর্মঘট এড়ানো সম্ভব হবে এবং সাধারণ মানুষও ভোগান্তি থেকে রক্ষা পাবেন।



