নয়া দিগন্ত ডেস্ক
সব জল্পনা-কল্পনার অবসান ঘটিয়ে অবশেষে শুরু হয়েছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার বহুল প্রতীক্ষিত উচ্চপর্যায়ের শান্তি আলোচনা। মধ্যস্থতাকারী দেশ কাতারের পক্ষ থেকে গতকাল রোববার বৈঠকটি শুরু হওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়েছে।
এএফপির খবরে জানা যায়, গত বুধবার মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ইরানি প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের মধ্যে স্বাক্ষরিত অন্তর্বর্তীকালীন চুক্তিটিকে আরো বেগবান ও স্থায়ী রূপ দেয়ার লক্ষ্যেই এই বৈঠকের আয়োজন করা হয়েছে। তবে শুরুতেই এই শান্তিপ্রক্রিয়া বেশ কিছু জটিলতা ও প্রতিবন্ধকতার মুখোমুখি হয়েছে।
কাতারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে দেয়া এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র, ইরান ও মধ্যস্থতাকারী দুই দেশের উপস্থিতিতে রোববার সুইজারল্যান্ডের লেক লুসার্নে উচ্চপর্যায়ের কমিটির প্রথম বৈঠকটি সফলভাবে শুরু হয়েছে। এই মেগা বৈঠকে মার্কিন প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দিচ্ছেন দেশটির ভাইস প্রেসিডেন্ট জে ডি ভ্যান্স। দলে আরো রয়েছেন, ট্রাম্প জামাতা জ্যারেড কুশনার ও বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ।
জে ডি ভ্যান্স তার স্ত্রী উষা ভ্যান্সসহ রোববার ভোরে সুইজারল্যান্ডের এমেন বিমানঘাঁটিতে অবতরণের পর কড়া নিরাপত্তার মধ্য দিয়ে বুর্গেনস্টক রিসোর্টে পৌঁছান। যুক্তরাষ্ট্র ছাড়ার আগে মেরিল্যান্ডের একটি সামরিক ঘাঁটিতে জে ডি ভ্যান্স সাংবাদিকদের বলেন, ‘আমরা পারমাণবিক বিষয় এবং লেবাননের যুদ্ধবিরতির বিষয়ে অগ্রগতির আশা করছি।’ এই আলোচনা কয়েক দিন স্থায়ী হতে পারে বলেও তিনি ইঙ্গিত দেন।
স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবফ এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচির নেতৃত্বে ইরানের প্রতিনিধিদল বলেছে, যুদ্ধ শেষ করার অন্তর্বর্তীকালীন চুক্তিটি যেন সব পক্ষ সম্পূর্ণরূপে বাস্তবায়ন করে, তা নিশ্চিত করাই তাদের প্রধান লক্ষ্য। এ ছাড়া মধ্যস্থতাকারী দেশ হিসেবে কাতার ও পাকিস্তানের প্রতিনিধিরাও এই বৈঠকে আছেন। অন্যতম প্রধান মধ্যস্থতাকারী দেশ পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ এবং দেশটির সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল সৈয়দ অসীম মুনিরও এই বৈঠকে যোগ দিতে সুইজারল্যান্ডে পৌঁছেছেন। সুইজারল্যান্ডের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, এই চার দেশের প্রতিনিধিদলই বর্তমানে লেক লুসার্নের একটি লাক্সারি রিসোর্টে অবস্থান করছে এবং বৈঠকে অংশ নিয়েছে।
এ দিকে আলোচনা শুরু হলেও ইরান হরমুজ প্রণালী বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত বহাল রেখেছে। লেবাননে চলমান সামরিক সাত বন্ধ করতে ইসরাইলকে বাধ্য করার ক্ষেত্রে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ব্যর্থতার প্রতিবাদেই মূলত তেহরান এই কঠোর অবস্থান নিয়েছে। ইরান এই নৌপথ বন্ধ রাখাকে আলোচনার টেবিলের একটি বড় হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে। বৈঠকের মূল অ্যাজেন্ডা বা আলোচ্যসূচিতে শুরুতে তিনটি প্রধান বিষয় অন্তর্ভুক্ত ছিল- প্রথমত, হরমুজ প্রণালী আবার উন্মুক্ত করা। দ্বিতীয়ত, ইরানের ওপর থেকে মার্কিন তেল রফতানির নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করা। তৃতীয়ত, বহির্বিশ্বে আটকে থাকা বা ফ্রিজ হয়ে থাকা ইরানের শত শত কোটি ডলারের সম্পদ অবমুক্ত করা।
তবে বর্তমান মাঠপর্যায়ের পরিস্থিতি বিবেচনা করে মার্কিন প্রতিনিধিদলের প্রধান ও ভাইস প্রেসিডেন্ট জে ডি ভ্যান্স জানিয়েছেন, মূল অ্যাজেন্ডার সাথে তারা এখন লেবানন সঙ্কট বা লেবাননের যুদ্ধবিরতির বিষয়টিও গুরুত্বের সাথে যোগ করেছেন। ইরান অভিযোগ করেছে, ইসরাইল লেবাননে হামলা চালিয়ে যুদ্ধবিরতির শর্ত লঙ্ঘন করছে, যা মূলত যুক্তরাষ্ট্রের দেয়া প্রতিশ্রুতির পরিপন্থী।
অন্য দিকে মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড জানিয়েছে, গত শনিবারও হরমুজ প্রণালী দিয়ে ১৭ মিলিয়ন ব্যারেলের বেশি তেলবাহী ৫৫টি বাণিজ্যিক জাহাজ পার হয়েছে। মার্কিন বাহিনী এই আন্তর্জাতিক নৌপথে নিরাপদ বাণিজ্য সচল রাখতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। ডোনাল্ড ট্রাম্প এক সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম পোস্টে জানিয়েছেন, ৬০ দিনের যুদ্ধবিরতি চলাকালীন বা তার পরেও এই প্রণালী দিয়ে যাতায়াতের জন্য কোনো টোল দিতে হবে না। তবে শান্তি আলোচনা ব্যর্থ হলে পশ্চিম এশিয়ার দেশগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করার সেবামূল্য হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র এককভাবে টোল আরোপ করতে পারে বলে তিনি উল্লেখ করেছেন। ইসরাইল শুরু থেকেই জানিয়েছে, তারা এই চুক্তির কোনো পক্ষ নয় এবং লেবাননে তাদের দখলকৃত অঞ্চল থেকে সেনা প্রত্যাহার করবে না। ইসরাইলি সামরিক বাহিনী এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, তারা যুদ্ধবিরতি মেনে চললেও যেকোনো হুমকির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে প্রস্তুত।
লেবাননের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, গত মার্চ থেকে শুরু হওয়া ইসরাইলি হামলায় এ পর্যন্ত চার হাজার ৫৭ জন নিহত হয়েছেন। অন্য দিকে হিজবুল্লাহর সাথে লড়াইয়ে অন্তত ৩২ জন ইসরাইলি সেনা নিহত হয়েছেন। ইসরাইলের হিব্রু ইউনিভার্সিটির এক সাম্প্রতিক জরিপে দেখা গেছে, প্রায় ৯২ শতাংশ ইসরাইলি নাগরিক মনে করেন যুদ্ধে ইসরাইলের চেয়ে ইরান বেশি লাভবান হয়েছে। এ ছাড়া মাত্র ৩০ শতাংশ মানুষ মনে করেন প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু যুদ্ধ থেকে বড় কোনো সাফল্য অর্জন করতে পেরেছেন।
ইরানের প্রতিনিধিদলে স্পিকার গালিবাফের পাশাপাশি দেশটির উপতেলমন্ত্রী ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর উপস্থিত রয়েছেন। ইরানি প্রশাসনের এই শীর্ষ কর্তাদের উপস্থিতিই প্রমাণ করে যে, তেহরান এই বৈঠক থেকে যেকোনো মূল্যে তাদের ওপর আরোপিত মার্কিন অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞাগুলো প্রত্যাহারের শর্ত ও আইনি বাধ্যবাধকতার ওপর সবচেয়ে বেশি জোর দিতে চাচ্ছে। মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি ফিরিয়ে আনার এই প্রচেষ্টায় কাতার ও পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় শেষ পর্যন্ত ওয়াশিংটন ও তেহরান কোনো স্থায়ী সমঝোতায় পৌঁছাতে পারে কি না- এখন সেটিই দেখার বিষয়।
আলোচনার পরিবেশ তৈরি করতে দুই দেশ প্রথমে ৬০ দিনের একটি যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়েছিল। কিন্তু লেবাননে ইসরাইলি হামলার জবাবে শনিবার ইরানের ইসলামী রেভেলিউশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি) হরমুজ প্রণালী বন্ধের ঘোষণা দেয়। অবশ্য মার্কিন সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, এই গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক রুটে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল এখনো স্বাভাবিক রয়েছে।
এই চুক্তির আগে ইসরাইল বলেছিল, লেবানন থেকে তাদের সেনা প্রত্যাহারের কোনো পরিকল্পনা নেই। তারা জোর দিয়ে বলেছিল, হিজবুল্লাহর সাথে তাদের সঙ্ঘাত ইরানের যুদ্ধের চেয়ে আলাদা। অন্য দিকে হিজবুল্লাহ বলেছে, লেবাননে ইসরাইলি হামলা আসলে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান চুক্তিকে ব্যর্থ করার একটি অপচেষ্টা। যুক্তরাষ্ট্র সরকার লেবাননে ইসরাইলের চলমান অভিযানের সমালোচনা করেছে।
লেবাননের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ২ মার্চ ইসরাইল ও হিজবুল্লাহর মধ্যে নতুন করে সঙ্ঘাত শুরু হওয়ার পর থেকে চার হাজার ৫৭ জন নিহত হয়েছেন। ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি) বলেছে, লেবাননে ইসরাইলি হামলা যুদ্ধবিরতির প্রতিশ্রুতির লঙ্ঘন এবং যুদ্ধ অবসানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে চুক্তি হওয়ার পর যে হরমুজ প্রণালী খুলে দেয়া হয়েছিল, তা আবার বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। তবে দক্ষিণ লেবাননে সামরিক অভিযান বন্ধের নির্দেশ দিয়েছেন ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এবং প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরাইল কাটজ।
ইসরাইলি টেলিভিশন চ্যানেল-১২-এর বরাতে এ তথ্য জানিয়েছে সংবাদমাধ্যম ডন। দক্ষিণ লেবাননে চলমান আক্রমণাত্মক অভিযান স্থগিতের নির্দেশ দেয়া হলেও বর্তমানে যেসব এলাকায় ইসরাইলি সেনারা অবস্থান করছে, সেখান থেকে তাদের সরিয়ে নেয়ার কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। চ্যানেল-১২ আরো জানিয়েছে, এই সিদ্ধান্ত যুক্তরাষ্ট্রের সাথে সমন্বয়ের ভিত্তিতেই নেয়া হয়েছে। তবে হামলা বন্ধের নির্দেশ কখন থেকে কার্যকর হবে কিংবা কোনো ধরনের সামরিক কার্যক্রম এর আওতায় থাকবে- সে বিষয়ে স্পষ্ট কিছু জানানো হয়নি।
শনিবার ইসরাইলি সিরিজ বিমান হামলার পর লেবাননে অন্তত ৪৭ জন নিহত হয়েছে বলে দেশটির স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে। ইসরাইলের সামরিক বাহিনীর (আইডিএফ) দাবি, তারা হিজবুল্লাহর সংশ্লিষ্ট ৮০টি লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হেনেছে এবং এর ‘কয়েক ডজন’ সদস্যকে হত্যা করেছে। আইডিএফ বলেছে, তাদের চারজন সেনাসদস্যও সংঘর্ষে নিহত হয়েছে। বিবিসি লিখেছে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সমঝোতার ঘোষণার পরও ইসরাইল ও হিজবুল্লাহর মধ্যে গোলাগুলি অব্যাহত ছিল; তবে শুক্রবার বিকেলে দুই পক্ষের মধ্যে একটি তাৎক্ষণিক যুদ্ধবিরতি নিশ্চিত করা হয়।



