ফ্রান্স থেকে প্রতিনিধি
বাংলাদেশের এক প্রত্যন্ত মফস্বল থেকে শুরু হওয়া একটি স্বপ্ন আজ পৌঁছে গেছে আন্তর্জাতিক গবেষণার অঙ্গনে। সীমিত সুযোগ, ভাষাগত বাধা, ভিন্ন শিক্ষাব্যবস্থার চ্যালেঞ্জ এবং দীর্ঘ সংগ্রামের পথ অতিক্রম করে বাগেরহাটের মোল্লাহাটের এক তরুণ এখন মহাবিশ্বের অন্যতম গভীর রহস্য- ডার্ক এনার্জি ও মহাজাগতিক বিবর্তন নিয়ে গবেষণার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। তার এই যাত্রা শুধু ব্যক্তিগত সাফল্যের গল্প নয়; এটি অধ্যবসায়, সাহস এবং স্বপ্নকে আঁকড়ে ধরে এগিয়ে যাওয়ার এক অনুপ্রেরণামূলক কাহিনী।
ইকরামুল কবির (ফ্রেন্সস্টাইন) ১৯৯৪ সালে বাগেরহাটের মোল্লাহাটে জন্মগ্রহণ করেন। ছোটবেলা থেকেই পড়াশোনার প্রতি ছিল গভীর আগ্রহ, ফলে পরিবার ও এলাকাবাসীর কাছে তিনি ছিলেন অত্যন্ত স্নেহভাজন। তবে তার একটি বিশেষ ‘বদভ্যাস’ ছিল- প্রচুর প্রশ্ন করতেন। প্রকৃতি, নভোমণ্ডল, নক্ষত্র ও ছায়াপথের প্রতি দুর্নিবার আকর্ষণ ছিল শৈশব থেকেই। পরিবারে উচ্চশিক্ষিত কেউ না থাকায় শিক্ষা ও ক্যারিয়ার নিয়ে পরামর্শের জন্য তাকে বিভিন্ন ব্যক্তি ও উৎসের ওপর নির্ভর করতে হয়েছে। তিনি ২০১০ সালে সরকারি ওয়াজেদ মেমোরিয়াল উচ্চবিদ্যালয়, মোল্লাহাট থেকে এসএসসি এবং ২০১৩ সালে খুলনার শতদল মহাবিদ্যালয় থেকে বিজ্ঞান বিভাগে জিপিএ- ৫.০০ নিয়ে এইচএসসি সম্পন্ন করেন। এরপর বিদেশে পদার্থবিদ্যা নিয়ে উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন দেখতে শুরু করেন। এ উদ্দেশে ২০১৫ সালে ইতালিতে পাড়ি জমান। সেখানে দুই বছর মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং অধ্যয়নের পর উপলব্ধি করেন তার প্রকৃত ভালোবাসা পদার্থবিদ্যাতে। সেই উপলব্ধি থেকেই তিনি নতুন করে নিজের পথ নির্ধারণ করেন।
২০১৮ সালে তিনি ফ্রান্সে এসে ফরাসি ভাষা শেখা শুরু করেন। ২০২০-২৩ শিক্ষাবর্ষে ইউনিভার্সিটি অব লিল থেকে তাত্ত্বিক পদার্থবিদ্যায় স্নাতক ডিগ্রি সম্পন্ন করেন।
স্নাতকপর্যায়ে অ্যাস্ট্রোনমি ও অ্যাস্ট্রোফিজিক্সের বিভিন্ন কোর্স অধ্যয়নের মাধ্যমে তার আগ্রহ কেন্দ্রীভূত হয় তাত্ত্বিক কসমোলজির দিকে যে শাখায় মহাবিশ্বের উৎপত্তি, গঠন, বিবর্তন ও ভবিষ্যৎ নিয়ে গবেষণা করা হয়। এই আগ্রহ থেকেই ২০২৩ সালে তিনি ইতালির পাদুয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাস্ট্রোফিজিক্স অ্যান্ড কসমোলজি মাস্টার্স প্রোগ্রামের ‘থিওরি অ্যান্ড মডেলিং’ ট্র্যাকে আঞ্চলিক বৃত্তিসহ ভর্তি হন।
মাস্টার্সের চতুর্থ সেমিস্টারে তিনি বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ গবেষণা প্রতিষ্ঠান প্যারিস অবজারভেটরিতে গবেষণা-ইন্টার্নশিপের সুযোগ লাভ করেন। প্যারিস পিএসএল বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘লুথ’ গবেষণাগারে তিনি অধ্যাপক পিয়ের-স্তেফানো কোরাসানিতির তত্ত্বাবধানে ছয় মাস নন-ডাইনামিক্যাল ডার্ক এনার্জি নিয়ে গবেষণা করেন। ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে তিনি ১১০-এর মধ্যে ১০৩ নম্বর অর্জন করে মাস্টার্স ডিগ্রি সম্পন্ন করেন।
সম্প্রতি তিনি চীনের বিশ্বখ্যাত ফুদান বিশ্ববিদ্যালয়ে পূর্ণ অর্থায়নসহ পিএইচডি গবেষণার সুযোগ পেয়েছেন। সেখানে তিনি ইতালীয় কসমোলজিস্ট অধ্যাপক আন্তোনিনো মারচিয়ানোর তত্ত্বাবধানে ‘কোয়ান্টাম মডেল অব ডার্ক এনার্জি’ বিষয়ে গবেষণা করবেন। তার গবেষণার মূল লক্ষ্য হবে ডার্ক এনার্জির উৎপত্তি, মহাজাগতিক ইনফ্লেশন এবং মহাবিশ্বের চূড়ান্ত পরিণতি সম্পর্কে নতুন তাত্ত্বিক ব্যাখ্যা অনুসন্ধান করা।
দৈনিক নয়া দিগন্তের সাথে আলাপকালে ইকরামুল কবির বলেন, আমার এই যাত্রা সহজ ছিল না। অনেক সময় ভাষাগত সীমাবদ্ধতা, আর্থিক অনিশ্চয়তা ও আত্মবিশ্বাসের সঙ্কটের মুখোমুখি হতে হয়েছে। কিন্তু আমি সবসময় বিশ্বাস করেছি, যদি লক্ষ্য স্পষ্ট থাকে এবং নিয়মিত পরিশ্রম করা যায়, তবে অসম্ভব বলে কিছু থাকে না।
বাংলাদেশের এক প্রত্যন্ত জনপদ থেকে আন্তর্জাতিক গবেষণার অগ্রভাগে পৌঁছানোর এই যাত্রা প্রমাণ করে- স্বপ্ন যদি স্পষ্ট হয়, লক্ষ্য যদি অটুট থাকে এবং পরিশ্রম যদি অব্যাহত থাকে, তবে সীমাবদ্ধতা কখনোই সাফল্যের শেষ কথা নয়।



