হাজার কোটি টাকার প্রকল্প ৩০ কিমি দূরত্ব কমাতে

সিরাজগঞ্জ-পাবনা সড়ক উন্নয়ন

হামিদুল ইসলাম সরকার
Printed Edition

  • নতুন সড়ক নির্মাণ ও পুনর্নির্মাণে কিলোমিটারে একই খরচ
  • শুধু জমি অধিগ্রহণেই ৪৮৮ কোটি টাকা

সিরাজগঞ্জের সয়দাবাদ থেকে এনায়েতপুর, কৈজুরী, চরবর্নিয়া হয়ে পাবনার বেড়া পর্যন্ত প্রায় ৬৪ কিলোমিটার জেলা মহাসড়ক উন্নয়নে এক হাজার ১৩০ কোটি ৪২ লাখ ৫০ হাজার টাকার মেগাপ্রকল্প প্রস্তাব করা হয়েছে। ৩০ কিলোমিটার দূরত্ব কমাতে এ প্রকল্প নেয়া হয়েছে। এক কিলোমিটার নতুন সড়ক বানাতে যে পরিমাণ অর্থ ব্যয় হবে একই পরিমাণ খরচ হবে এক কিলোমিটার সড়ক পুনর্নির্মাণে। প্রকল্প বাস্তবায়নে জমি অধিগ্রহণেই যাবে ৪৮৯ কোটি টাকা। সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের প্রকল্প প্রস্তাবনা দলিলে এ প্রকল্প ব্যায়ের প্রাক্কলন নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে পরিকল্পনা কমিশন। সম্ভাব্যতা সমীক্ষা, ভূমি অধিগ্রহণ, সড়ক নির্মাণ, সেতু-কালভার্টসহ বিভিন্ন অবকাঠামোর ব্যয় নির্ধারণের ভিত্তি নিয়ে প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটির (পিইসি) সভায় বিস্তারিত সুপারিশ দেয়া হয়েছে।

সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের প্রকল্প প্রস্তাবনা দলিল থেকে জানা গেছে, ‘সয়দাবাদ (সিরাজগঞ্জ)-এনায়েতপুর-কৈজুরী-চরবর্নিয়া-মাধপুর-সাঁথিয়া-বেড়ার (পাবনা) জেলা মহাসড়ক যথাযথ মানোন্নয়ন ও প্রশস্ততায় উন্নীতকরণ’ নামের প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করবে সড়ক ও জনপথ (সওজ) অধিদফতর। পুরো অর্থই সরকারের নিজস্ব অর্থায়ন (জিওবি) থেকে দেয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে যমুনা সেতু থেকে এনায়েতপুর, শাহজাদপুর হয়ে বেড়া-পাবনার সাথে অপেক্ষাকৃত কম দূরত্বে যোগাযোগ স্থাপিত হবে। এতে ঢাকা-পাবনা যাতায়াতের দূরত্ব প্রায় ৩০ কিলোমিটার কমবে। ফলে সময় ও ভ্রমণব্যয় কমার পাশাপাশি ব্যবসা-বাণিজ্য এবং কৃষিপণ্য পরিবহনে গতি আসবে। এছাড়া এনায়েতপুরের খাজা ইউনুস আলী মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালে যাতায়াত, অর্থনৈতিক অঞ্চলের পণ্য পরিবহন এবং এলাকার কৃষি, মৎস্য, তাঁত ও দুগ্ধজাত পণ্য দেশের বিভিন্ন স্থানে পাঠানোর সুবিধা বাড়বে। প্রস্তাব অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জুলাই থেকে ২০২৯ সালের জুন পর্যন্ত তিন বছরে প্রকল্পটি বাস্তবায়নের কথা রয়েছে। প্রকল্প এলাকায় রয়েছে সিরাজগঞ্জ সদর, বেলকুচি, শাহজাদপুর ও চৌহালী এবং পাবনার বেড়া ও সাঁথিয়া উপজেলা। প্রকল্পটি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) অননুমোদিত নতুন প্রকল্পের তালিকায়ও রাখা হয়েছে।

৬৪ কিলোমিটার সড়ক উন্নয়ন

প্রকল্প দলিলের তথ্য বলছে, প্রকল্পের আওতায় মোট ৬৪ দশমিক ২০ কিলোমিটার জেলা মহাসড়ক উন্নত করার কথা রয়েছে। এর মধ্যে সয়দাবাদ-এনায়েতপুর সড়কের ১৯ দশমিক ৭০ কিলোমিটার, শাহজাদপুর-কৈজুরী-চৌহালী সড়কের ১০ কিলোমিটার, কৈজুরী-চরবর্নিয়া-বেড়া সড়কের ১৫ দশমিক ৫০ কিলোমিটার এবং বেড়া-সাঁথিয়া-মাধপুর সড়কের ১৯ কিলোমিটার রয়েছে। কাজের মধ্যে রয়েছে, ১৫.৫০ কিলোমিটার নতুন পেভমেন্ট নির্মাণ ও ১০.০০ কিলোমিটার সড়ক পুনর্নির্মাণ। ৩৩.৩৭ কিলোমিটার সড়ক প্রশস্তকরণ, মজবুতকরণ, হার্ড সোল্ডার নির্মাণ এবং ডিবিএস সারফেসিং। চার হাজার ৭০০ মিটার রিজিড পেভমেন্ট নির্মাণ। ৪৪.০২ মিটার দীর্ঘ সেতু (পিসি/আরসিসি গার্ডার একটি), ১১৪ মিটার দৈর্ঘ্যের ১৬টি আরসিসি বক্স কালভার্ট নির্মাণ। ড্রেন নির্মাণ, জিওটেক্সটাইলসহ কনক্রিট স্লোপ প্রটেকশন, সিসি ব্লক, আরসিসি প্যালেসাইডিং এবং টো-ওয়াল নির্মাণ। যানজট ও দুর্ঘটনা রোধে ১৮টি বাস-বে এবং প্রয়োজনীয় রোড মার্কিং, সাইন-সিগন্যাল ও গাইড পোস্ট স্থাপন।

জমি অধিগ্রহণেই প্রায় ৪৮৯ কোটি টাকা

ডিপিপি তথ্য বলছে, প্রকল্পের সবচেয়ে বড় ব্যয়ের খাতগুলোর একটি ভূমি অধিগ্রহণ। ৪৪ দশমিক ৯৭৯ একর জমি অধিগ্রহণ ও ক্ষতিপূরণের জন্য ৪৮৮ কোটি ৯০ লাখ পাঁচ হাজার টাকা ব্যয় ধরা হয়েছে। এখানেই প্রশ্ন তুলেছে পরিকল্পনা কমিশন। ওই জমিতে কতসংখ্যক স্থাপনা, অবকাঠামো, গাছপালা ও কৃষিজমি রয়েছে, তার বিস্তারিত তথ্য চাওয়া হয়েছে। একই সাথে জমি অধিগ্রহণের জন্য সময়বদ্ধ পরিকল্পনা আছে কি না, সেটিও পিইসি সভায় আলোচনা করার সুপারিশ করা হয়েছে।

সড়ক নির্মাণের ব্যয় নিয়েও প্রশ্ন

পরিকল্পনা কমিশনের ভৌত অবকাঠামো বিভাগ বলছে, প্রকল্পে ১৫ দশমিক ৫০ কিলোমিটার নতুন পেভমেন্ট নির্মাণ বা নতুন সড়ক নির্মাণে খরচ হবে ৩৪ কোটি ৯৭ লাখ ২৭ হাজার টাকা। এখানে প্রতি কিলোমিটারে ব্যয় হচ্ছে দুই কোটি ২৫ লাখ ৬০ হাজার টাকা। আর একই লাইনে ১০ কিলোমিটার সড়ক পুনর্নির্মাণের প্রস্তাব রয়েছে ২২ কোটি ৫৬ লাখ ৩০ হাজার টাকা। এখানেও প্রতি কিলোমিটারে ব্যয় দুই কোটি ২৫ লাখ ৬০ হাজার টাকা। দেখা গেছে, উভয় খাতেই প্রতি কিলোমিটারে একই হারে ব্যয় ধরা হয়েছে- প্রায় দুই কোটি ২৫ লাখ ৬৩ হাজার টাকা।

এ ছাড়া সড়ক প্রশস্তকরণ, হার্ড শোল্ডার নির্মাণ, সড়ক মজবুতকরণ, ডিবিএস সারফেসিং ও রিজিড পেভমেন্টসহ বিভিন্ন খাতের ব্যয় প্রাক্কলনের ভিত্তিও যাচাই করতে বলা হয়েছে।

সেতু-কালভার্টেও ব্যয়ের হিসাব যাচাই

প্রকল্পে সেতু, আরসিসি বক্স কালভার্ট, সসার ড্রেন ও আউটলেট আরসিসি ক্রস ড্রেন নির্মাণের জন্যও বড় অঙ্কের অর্থ রাখা হয়েছে। এসব কাজের সংখ্যা কিভাবে নির্ধারণ করা হয়েছে, কারিগরি নকশা কী এবং ব্যয় প্রাক্কলনের ভিত্তি কী- এসব বিষয়েও ব্যাখ্যা চেয়েছে পরিকল্পনা কমিশন। এ ছাড়া ১৮টি বাস-বে নির্মাণে তিন কোটি ৭৩ লাখ ৬৮ হাজার টাকা ব্যয়ের প্রস্তাব করা হয়েছে। বাস-বে কোথায়, কতটি এবং কী ব্যয়ে নির্মাণ করা হবে, তা যৌক্তিকভাবে নির্ধারণের সুপারিশ করা হয়েছে।

পরিবেশ নিয়েও প্রশ্ন

পরিকল্পনা কমিশন জানতে চেয়েছে, এসব সুপারিশ বাস্তবায়নে কী ধরনের পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে এবং পরিবেশগত ছাড়পত্র পাওয়া হয়েছে কি না।

১০ প্যাকেজে নির্মাণকাজ

প্রকল্পের পূর্তকাজ ১০টি প্যাকেজে বাস্তবায়নের ভিত্তি ও যৌক্তিকতা নিয়েও পিইসি সভায় আলোচনা করতে বলা হয়েছে।

পাশাপাশি সওজের সর্বশেষ রেট শিডিউল অনুযায়ী প্রকল্পের ডিপিপি পুনর্গঠন, বাস্তবায়নকাল ও সময়বদ্ধ কর্মপরিকল্পনা হালনাগাদ এবং প্রকল্প শেষে এর সুফল টেকসই করার জন্য ‘এক্সিট প্ল্যান’ যুক্ত করার সুপারিশ করেছে পরিকল্পনা কমিশন।

উন্নয়ন নাকি ব্যয়ের ভার- সিদ্ধান্ত পিইসি সভায়

প্রকল্পটির মূল লক্ষ্য সড়ক যোগাযোগ উন্নত করে সিরাজগঞ্জ ও পাবনার মধ্যে যোগাযোগ সহজ করা এবং যমুনা সেতুর সাথে সংযোগ আরো কার্যকর করা। কৃষি, তাঁত, মৎস্য ও শিল্পপণ্যের বাজারজাতকরণে এর ইতিবাচক প্রভাব পড়ার সম্ভাবনাও রয়েছে। তবে ৬৪ দশমিক ২০ কিলোমিটার সড়ক উন্নয়নে এক হাজার ১৩০ কোটি ৪২ লাখ ৫০ হাজার টাকা ব্যয়ের প্রস্তাবের ক্ষেত্রে বিভিন্ন খাতের হিসাব নিয়ে পরিকল্পনা কমিশনের একাধিক প্রশ্ন উঠেছে। বিশেষ করে প্রায় ৪৮৯ কোটি টাকা ভূমি অধিগ্রহণে, সড়ক নির্মাণ ও পুনর্নির্মাণে কিলোমিটারপ্রতি ব্যয় এবং বিভিন্ন অবকাঠামোর ব্যয় নির্ধারণের ভিত্তি নিয়ে ব্যাখ্যা চাওয়া হয়েছে। এসব বিষয়ে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও সওজের ব্যাখ্যা এবং প্রয়োজনীয় সংশোধনের পরই প্রকল্পটির পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেয়া হবে।