লুটেরা এস আলমেই শেষ ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক

বিদেশী নিরীক্ষা প্রতিবেদনে ভয়াবহ চিত্র

ভয়াবহ মূলধন ঘাটতি, অকার্যকর ঋণের আধিক্য, তারল্য সঙ্কট, মারাত্মক আর্থিক ক্ষতি এবং প্রাতিষ্ঠানিক অনিয়ম ব্যাংকটির ভবিষ্যৎকে গভীর অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দিয়েছে।

বিশেষ সংবাদদাতা
Printed Edition

ব্যাংক খাতে লুটেরা এস আলমের তহবিল তসরুপে শূন্য হয়ে পড়েছে ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক। লুটপাটের কারণে ব্যাংকটি ইতোমধ্যে সব সক্ষমতাই হারিয়ে ফেলেছে। শ্রীলঙ্কাভিত্তিক নিরীক্ষা প্রতিষ্ঠান কেপিএমজির সম্পদ গুণমান পর্যালোচনা (একিউআর) ও বাংলাদেশ ব্যাংকের পৃথক তদন্ত প্রতিবেদনের ভিত্তিতে তৈরি এক প্রতিবেদন থেকে দেখা যায়, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক বর্তমানে এক ভয়াবহ সঙ্কটে রয়েছে। ভয়াবহ মূলধন ঘাটতি, অকার্যকর ঋণের আধিক্য, তারল্য সঙ্কট, মারাত্মক আর্থিক ক্ষতি এবং প্রাতিষ্ঠানিক অনিয়ম ব্যাংকটির ভবিষ্যৎকে গভীর অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দিয়েছে। এ অবস্থায় বাংলাদেশ ব্যাংকের সময়োপযোগী ও কার্যকর পদক্ষেপ ছাড়া ব্যাংকটির টিকে থাকার কোনো বাস্তবসম্মত সুযোগ নেই বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, দেশের সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা, কাক্সিক্ষত জিডিপি প্রবৃদ্ধি, মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ এবং ব্যবসায়িক প্রতিযোগিতা ধরে রাখতে ব্যাংক খাতের কর্মক্ষমতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে দেখা যাচ্ছে যে কিছু তফসিলি ব্যাংক দৈনন্দিন আমানতকারীর চাহিদা পূরণ, তারল্য বজায় রাখা এবং আন্তর্জাতিক অর্থপ্রদানের মতো মৌলিক দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হচ্ছে। ফলে ব্যাংকিং খাতে আস্থাহীনতা তৈরি হয়েছে এবং পদ্ধতিগত ঝুঁকি বেড়ে গেছে। এ প্রেক্ষাপটে, বাংলাদেশ ব্যাংক ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংকের আর্থিক অবস্থার একটি স্বাধীন মূল্যায়ন করার উদ্যোগ নেয়, যা শ্রীলঙ্কার কেপিএমজি দ্বারা সম্পদ গুণমান পর্যালোচনা (একিউআর) এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের বিভিন্ন তদারকি বিভাগের অনুসন্ধানের ওপর ভিত্তি করে তৈরি হয়েছে।

মূলধন ঘাটতি ও সম্পদের মান

২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ব্যাংকটি ভয়াবহ মূলধন ঘাটতির সম্মুখীন হয়েছে। একিউআর রিপোর্ট অনুযায়ী, ব্যাংকের মূলধন ঘাটতি দাঁড়িয়েছে প্রায় ৫৩ হাজার ৮৯০ কোটি টাকা। ব্যাংকের মূলধন পর্যাপ্ততার অনুপাত (সিএআর) যেখানে ন্যূনতম ১০ শতাংশ থাকার কথা, সেখানে এটি নেমে এসেছে ঋণাত্মক ৬০৫.৮০ শতাংশে। এটি ব্যাংকের আর্থিক স্থিতি কতটা দুর্বল তা স্পষ্ট করে। অন্য দিকে ব্যাংকের বিনিয়োগ (ঋণ) পোর্টফোলিওর মান অত্যন্ত খারাপ। রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছে যে মোট বিনিয়োগের ৯৯.৫ শতাংশই অকার্যকর খেলাপি) হয়ে গেছে। এর ফলে ব্যাংকের সম্পদের মান মারাত্মকভাবে হ্রাস পেয়েছে এবং প্রায় ৫৬ হাজার ৮০৫ কোটি টাকার প্রভিশন ঘাটতি তৈরি হয়েছে।

তারল্য সঙ্কট

ব্যাংকটি কার্যক্রম চালিয়ে নিতে বাংলাদেশ ব্যাংকের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। এরইমধ্যে ব্যাংকটি ১৫ হাজার ৩৬১ কোটি টাকা জরুরি তারল্য সহায়তা (ইএলএ) নিয়েছে, যার মধ্যে ১৪ হাজার ৩১১ কোটি টাকা সরাসরি বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে এবং এক হাজার ৫০ কোটি টাকা অন্যান্য ব্যাংক থেকে গ্যারান্টির বিপরীতে গৃহীত। তবুও ব্যাংক তার ন্যূনতম নিয়ন্ত্রক সীমা পূরণে ধারাবাহিকভাবে ব্যর্থ হচ্ছে।

খরয়ঁরফরঃু ঈড়াবৎধমব জধঃরড় (খঈজ): মাত্র ১০.৫৩ শতাংশ, যেখানে ন্যূনতম প্রয়োজনীয়তা ১০০ শতাংশ।

সিআরআর : ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর থেকে নেতিবাচক অবস্থায় রয়েছে।

এসব সূচক স্পষ্ট করে যে ব্যাংকটি স্বল্পমেয়াদি আমানতের চাহিদা মেটাতে গুরুতর সমস্যায় রয়েছে এবং এটি আস্থা সঙ্কট আরো বাড়িয়ে তুলছে।

আয়-ব্যয় ও লাভজনকতা

আর্থিক সূচকে দেখা গেছে ব্যাংকের পরিচালন আয় নেগেটিভ হয়ে গেছে। মোট পরিচালন আয় ঋণাত্মক ৪,৩০৮.৬৪ কোটি টাকা। আর বেতন ও ভাতা খাতে ব্যয় ৬৫২.১১ কোটি টাকা, যা সরাসরি আমানতকারীদের অর্থ থেকে পরিশোধ করা হচ্ছে। মোট পরিচালন ক্ষতি : ৫,৪৫০.১৫ কোটি টাকা। অতএব, ব্যাংকের দৈনন্দিন ব্যয় নির্বাহের সক্ষমতা নেই। একইসাথে, মুনাফা সূচকও মারাত্মকভাবে নেতিবাচক হয়েছে।

প্রশাসনিক দুর্বলতা ও অনিয়ম

বাংলাদেশ ব্যাংকের বিশেষ পরিদর্শন ও পরিদর্শন বিভাগ-৬-এর অনুসন্ধানে গুরুতর অনিয়ম ধরা পড়েছে। ব্যাংক বোর্ড যথাযথ সতর্কতা অবলম্বন করেনি। জাল নথি ও অবাস্তব ব্যবসায়িক প্রস্তাবের ভিত্তিতে বিপুল পরিমাণ বিনিয়োগ অনুমোদন করা হয়েছে। মেয়াদোত্তীর্ণ ঋণ মেটাতে নতুন ঋণ বিতরণ করা হয়েছে, যা সরাসরি বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশিকা লঙ্ঘন। ইসলামী ব্যাংকিং নীতির অপব্যবহার করা হয়েছে। পণ্য সরবরাহকারীর কাছে অর্থ পাঠানোর পরিবর্তে গ্রাহকের চলতি হিসাবে অর্থ জমা দেয়া হয়েছে। প্রভাবশালী কিছু ব্যবসায়িক গ্রুপ, বিশেষত ব্যাংক ডাকাত মাফিয়া এস আলম গ্রুপ, বিপুল পরিমাণ অর্থের চূড়ান্ত সুবিধাভোগী হয়েছে। এসব অনিয়ম শুধু প্রশাসনিক ব্যর্থতাই নয়, বরং আর্থিক খাতে দুর্নীতির প্রকট রূপও তুলে ধরেছে।

নিয়ন্ত্রক হস্তক্ষেপের প্রয়োজনীয়তা

ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংকের বর্তমান আর্থিক ও প্রশাসনিক সঙ্কট থেকে বোঝা যাচ্ছে যে এটি উচ্চ ঝুঁকির পর্যায়ে রয়েছে। কার্যক্রম চললেও ব্যাংকটি স্বাভাবিকভাবে টিকে থাকার সক্ষমতা হারিয়েছে। এই পরিস্থিতিতে আমানতকারীদের স্বার্থরক্ষা, জনআস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠা এবং সামগ্রিক আর্থিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে বাংলাদেশ ব্যাংকের অবিলম্বে কৌশলগত নিয়ন্ত্রক হস্তক্ষেপ অপরিহার্য।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ব্যাংক কোম্পানি আইন, ১৯৯১ (২০২৩ পর্যন্ত সংশোধিত) ও ব্যাংক রেজোলিউশন অধ্যাদেশ, ২০২৫ এর ভিত্তিতে বাংলাদেশ ব্যাংক একীভূতকরণ, পুনঃপুঁজিকরণ, অধিগ্রহণ বা অবসান- যেকোনো উপযুক্ত পদক্ষেপ নিতে পারে। ব্যাংকটির প্রতি অবিলম্বে নিয়ন্ত্রক হস্তক্ষেপ গ্রহণ এখন সময়ের দাবি।