মোজতবা খামেনিকে হন্যে হয়ে খুঁজছে মোসাদ-সিআইএ

Printed Edition
মোজতবা খামেনিকে হন্যে হয়ে খুঁজছে মোসাদ-সিআইএ
মোজতবা খামেনিকে হন্যে হয়ে খুঁজছে মোসাদ-সিআইএ

সানডে টাইমস

ইরানের সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনিকে খোঁজার গোপন অভিযান নিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে কখনোই কোনো আলোচনা বা স্বীকারোক্তি দেয়া হয় না। তবে ইসরাইলের গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদ ও যুক্তরাষ্ট্রের সিআইএর বর্তমান মূল ভাবনাই হয়ে উঠেছে তাকে খুঁজে বের করা।

ইরান যুদ্ধের পরবর্তী পদক্ষেপ নিয়ে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প যখন ভাবনাচিন্তা করছেন, ঠিক সেই সময়ে ইসরাইলের কুখ্যাত গোয়েন্দা সংস্থা এবং তাদের মার্কিন সহযোগী মিলে যৌথ সন্ধান চালিয়ে যাচ্ছে। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি এক ইসরাইলি বিমান হামলায় তার বাবা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি নিহত হওয়ার পর তিনি ক্ষমতা গ্রহণ করেন।

বিশ্বের সবচেয়ে আধুনিক ও চৌকস গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর সামনে এখন মূল চ্যালেঞ্জ হলো যাকে তারা খুঁজছে, তিনি পুরোপুরি যোগাযোগবিচ্ছিন্ন হয়ে গেছেন। ধারণা করা হচ্ছে, মোজতবা প্রায় ১৫০ দিন ধরে কোনো মোবাইল ফোন স্পর্শ করেননি কিংবা কোনো ল্যাপটপও খোলেননি। তিনি হয়তো গভীর কোনো আত্মগোপন কেন্দ্রে (শেল্টার) লুকিয়ে আছেন। বাবার প্রাণ নেয়া সেই বিমান হামলায় শরীরের একটা অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং মার্কিন গোয়েন্দা স্যাটেলাইটের নজর পড়ার শঙ্কায় তিনি দিনের আলোয় বাইরে আসছেন না।

আলি খামেনির অবস্থান শনাক্ত করতে ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্র সাইবার দুনিয়ার সব কলাকৌশলই ব্যবহার করেছিল। সাবেক এই সর্বোচ্চ নেতার দেহরক্ষী ও সহযোগীদের ব্যবহৃত যানবাহন শনাক্ত করতে তারা তেহরানের ট্রাফিক ক্যামেরাগুলো পর্যন্ত হ্যাক করেছিল। মার্কিন ন্যাশনাল সিকিউরিটি এজেন্সি (এনএসএ) এবং ইসরাইলের সমকক্ষ সংস্থা ইউনিট ৮২০০-এর যৌথ কারিগরিতেই বেরিয়ে এসেছিল সেই নির্দিষ্ট দিনে আলি খামেনি ও তার প্রধান সামরিক ও গোয়েন্দা কর্মকর্তারা কোথায় উপস্থিত থাকবেন। ফলে এক হামলাতেই তাদের সবাইকে হত্যা করতে পেরেছিল ইসরাইল। তবে এবার গল্পটা সম্পূর্ণ আলাদা। ইরানের সামরিক বাহিনীই যে প্রকৃতপক্ষে দেশ চালাচ্ছ, সেই বাস্তবতায় নতুন সর্বোচ্চ নেতাকে হত্যা করার প্রচেষ্টা কতটা যুক্তিসঙ্গত তা নিয়ে প্রশ্ন থাকতেই পারে। তবে সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও সামরিক পদক্ষেপের ক্ষেত্রে মোজতবার ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, আর তিনি এখন নিখোঁজ। ফলে এখন আর আড়িপাতা কিংবা নজরদারি প্রযুক্তির ভরসায় বসে থাকলে চলছে না; তার অবস্থান নির্ভুলভাবে চিহ্নিত করার একমাত্র মূল চাবিকাঠি হয়ে উঠেছে মানুষের সংগৃহীত তথ্য বা ‘হিউম্যান ইন্টেলিজেন্স’ (হিউমিন্ট)। সহজ কথায় মাঠে গুপ্তচর নামানো।

গোয়েন্দা সংস্থার ভেতর এখনো এমন অনেকে আছেন যারা বিশ্বাস করেন, মোজতবা হয়তো ইতোমধ্যেই মারা গেছেন। আর যুক্তরাষ্ট্রের সাথে যুদ্ধকে বৈধতা দিতে ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) তার বেঁচে থাকার নাটক সাজাচ্ছে।

তাই এখন যা প্রয়োজন তা হলো তিনি যে আদৌ বেঁচে আছেন তার প্রমাণ এবং তিনি ঠিক কোথায় লুকিয়ে আছেন তার সত্যতা নিশ্চিত করা। হতে পারে তিনি তেহরানের ভূগর্ভস্থ কোনো সুড়ঙ্গে আছেন, অথবা রাজধানী থেকে প্রায় ৯০ মাইল দক্ষিণে ধর্মীয় শহর কোমের কাছে কোনো সামরিক বাংকারে আত্মগোপন করে আছেন।

সাইবার নজরদারি খুব একটা কাজে না আসায় মোসাদ এখন ইরানের ভেতরে ছড়িয়ে থাকা তাদের এজেন্টদের নেটওয়ার্কের ওপর সবচেয়ে বেশি জোর দিচ্ছে। এই এজেন্টদের অনেকেই কিন্তু হতাশ ও ক্ষুব্ধ ইরানি নাগরিক। মোসাদের লক্ষ্য এখন মূলত দু’টি প্রশ্নের উত্তর খোঁজা, মোজতবার বর্তমান অবস্থা কী এবং তিনি কোথায় লুকিয়ে আছেন?

মোসাদের সাবেক ডিভিশন চিফ রমি ইগরা বলছিলেন, ‘ইসরাইলের জন্য এই চ্যালেঞ্জটা ঠিক তেমনই, যেমনটা ছিল গাজায় জিম্মিদের খুঁজে বের করে মুক্ত করার ক্ষেত্রে। পুরো গাজা ভূখণ্ড ইসরাইলি গোয়েন্দাদের নিয়ন্ত্রণে ছিল, জিম্মিদের অবস্থান জানতে প্রতিটি বাথরুম পর্যন্ত বাগ (আড়িপাতার যন্ত্র) করা হয়েছিল, তবুও তাদের পাওয়া যায়নি। মূল সমস্যাটা ছিল ইলেকট্রনিক প্রযুক্তির ওপর মাত্রাতিরিক্ত নির্ভরতা এবং মানুষের মাধ্যমে সংগৃহীত তথ্যের ঘাটতি।’ তিনি আরো যোগ করেন, ‘মোজতবা হয়তো ফোন ব্যবহার করছেন না, তবে তিনি যদি আসলেই বেঁচে থাকেন, তাহলে যোগাযোগের জন্য বিকল্প পথ ব্যবহার করছেন। যেমন কাগজের ছোট ছোট টুকরো। চিঠি আদান-প্রদানের জন্য একের পর এক ধাপে একাধিক বার্তাবাহক (কুরিয়ার) ব্যবহার করা হচ্ছে। এই কুরিয়াররা নিজেরাও জানে না তারা আসলে কী কাজ করছে, তারা শুধু একজনের কাছ থেকে বার্তা নিয়ে অন্যজনের কাছে পৌঁছে দিচ্ছে। তাই মোসাদ যদি শেষ পর্যন্ত তাকে খুঁজে পায়, তবে তা কোনো মানুষের মাধ্যমেই সম্ভব হবে। তবে তেহরানের বর্তমান শাসকগোষ্ঠীও এই বিপদের বিষয়ে যথেষ্ট সতর্ক।’

ঠিক যেভাবে আল-কায়েদার প্রতিষ্ঠাতা ওসামা বিন লাদেনকে সিআইএ তার এক কুরিয়ারকে অনুসরণ করে খুঁজে বের করেছিল, মোসাদও এখন একইভাবে মোজতবার বার্তা বহনকারীদের চিহ্নিত ও নজরদারি করার ওপর জোর দিচ্ছে। ইগরা বলেন, ‘মোজতবার কাছে পৌঁছানোর একমাত্র আসল উপায় হলো এমন কাউকে দলে টানা বা এজেন্ট বানানো, যার সাথে তার সরাসরি যোগাযোগ আছে।