- ৩ বছরের প্রকল্প ৬ বছর ১০ মাসে অগ্রগতি মাত্র ৫১.৬৫ শতাংশ
- খরচ বাড়ল ১২৯ কোটি টাকার বেশি
নানা জটিলতা, সমন্বয়হীনতা এবং দীর্ঘসূত্রতার কারণে মারত্মকভাবে থমকে গেছে দেশের শিল্পায়নের গতি ত্বরান্বিত করতে বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষ (বেজা) গৃহীত গুরুত্বপূর্ণ পানি সরবরাহ প্রকল্পটি। মিরসরাই অর্থনৈতিক অঞ্চলের ২৫ ও ২বি জোনসহ পার্শ্ববর্তী এলাকায় শিল্প ইউনিটগুলোতে নিরবচ্ছিন্ন পানি সরবরাহের লক্ষ্যে প্রকল্পটি হাতে নেয়া হলেও সময়মতো কাজ শেষ না হওয়ায় এর সুফল পাওয়া নিয়ে শঙ্কা তৈরি হয়েছে। প্রায় ৭৬২ কোটি টাকার পানি শোধনাগার ও গভীর নলকূপ স্থাপন প্রকল্পটি বাস্তবায়নগত দুর্বলতায় কাক্সিক্ষত গতি হারিয়েছে বলে বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) পর্যবেক্ষক প্রতিষ্ঠান মাইরা অ্যাসোসিয়েটসের তথ্য থেকে জানা গেছে। তথ্য বলছে, ৩ বছরের প্রকল্পটি ৬ বছর ১০ মাসে (এপ্রিল ২০২৬ পর্যন্ত) মাত্র ৪০.৮ শতাংশ বা ৩০৫ কোটি ৪১ লাখ ৪১ হাজার টাকা খরচ করে বাস্তব কাজ হয়েছে মাত্র ৫১.৬৫ শতাংশ। বাকি প্রায় অর্ধেক কাজের জন্য মেয়াদ আরো ৯ মাস বাড়ানো হয়েছে। আর খরচ বেড়েছে ১২৯ কোটি ১৪ লাখ টাকা।
মন্ত্রণালয়ের প্রকল্প দলিল ও পর্যবেক্ষক মাইরা অ্যাসোসিয়েটের তথ্য থেকে জানা গেছে, প্রায় ৩৩ হাজার একর এলাকার ‘জাতীয় বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল’ বাংলাদেশের একমাত্র পরিকল্পিত বৃহৎ শিল্প নগর। পরামর্শক প্রতিষ্ঠান ইনস্টিটিউট অব ওয়াটার মডেলিংয়ের (আইডব্লিউএম) সমীক্ষা প্রতিবেদন মোতাবেক ২০৩০, ২০৩৫ ও ২০৪০ সালে জাতীয় বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলে মোট পানির চাহিদা হবে আনুমানিক প্রায় ৫০৬, ৭১৭ এবং এক হাজার ১৫ এমএলডি। তবে বিনিয়োগকারীদের চাহিদা ও বাস্তবতায় প্রতীয়মান যে, ২০৩০ সালের মধ্যে পানির চাহিদা দাঁড়াবে ৪০০ এমএলডি। এক্ষেত্রে পরিকল্পনা অনুসারে ২০৩০ সালের মধ্যে বর্ণিত প্রকল্প থেকে ১০০ এমএলডি (১ম পর্যায়ে ৫০ এমএলডি ও ২য় পর্যায়ে ৫০ এমএলডি), গভীর নলকূপ থেকে ৫০ এমএলডি এবং চট্টগ্রাম ওয়াসায় মাধ্যমে ২৫০ এমএলডি মোট ৪০০ এমএলডির চাহিদা মেটানোর উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। পরবর্তীতে ধাপে ধাপে বর্ধিত চাহিদা মেটানো হবে। সেই সাথে সাগরের পানি রিভার্স অসমসিস পদ্ধতিতে শোধন, রেইন ওয়াটার হারভেস্টিং বা বৃষ্টির পানি সংগ্রহ ইত্যাদি পদ্ধতির মাধ্যমেও পানি সংগ্রহ করে তা ব্যবহার করার পরিকল্পনা রয়েছে। প্রাথমিক অবস্থায় ৫০ এমএলডি পানি সরবরাহের লক্ষ্যে ১ম পর্যায়ে পানি শোধানাগার-১ স্থাপনের জন্য বর্ণিত প্রকল্পটি নেয়া হয়েছে। প্রকল্পের মূল কাজের মধ্যে রয়েছে ৫০ এমএলডি ক্ষমতাসম্পন্ন একটি পানি শোধনাগার নির্মাণ এবং পাম্পহাউজসহ ২৩টি গভীর নলকূপ স্থাপন।
মেয়াদ ও খরচ বাড়ে লাফিয়ে
২০১৯ সালে নেয়া এই প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয় ৬৩২ কোটি ৮২ লাখ ১৫ হাজার টাকা (জিওবি)। ২০১৯ সালের জুলাই থেকে ২০২২ সালের জুন পর্যন্ত তিন বছরে প্রকল্পটি শেষ করার কথা ছিল। কিন্তু এতো ধীরগতিতে প্রকল্পটি চলছে যে মেয়াদ ও খরচ বাড়াতে হলো। খরচ ১২৯ কোটি টাকা বাড়িয়ে মোট ব্যয় ৭৬১ কোটি ৯৬ লাখ টাকায় উন্নীত করে মেয়াদ চার বছর বাড়িয়ে ৭ বছরে নেয়া হলো। কিন্তু তাতেও কাজে কোনো গতি নেই। এখন এই প্রকল্পের মেয়াদ বাড়িয়ে ২০২৭ সালের মার্চ পর্যন্ত করা হয়েছে। তাতেও শেষ হওয়ার কোনো সম্ভাবনা দেখছে না বলে পরিকল্পনা কমিশনের সংশ্লিষ্টদের সাথে কথা বলে জানা গেছে।
বাস্তবায়নে ধীরগতি : প্রায় ৭ বছরে ৫১.৬৫ শতাংশ
মাইরা অ্যাসোসিয়েটসের তথ্য বলছে, চলতি বছরের এপ্রিল পর্যন্ত ৬ বছর ১০ মাসের প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, প্রকল্পটির ক্রমপুঞ্জিত আর্থিক অগ্রগতি মাত্র ৪০.৮ শতাংশ বা ৩০৫ কোটি ৪১ লাখ ৪১ হাজার টাকা খরচ হয়েছে। যেখানে ভৌত অগ্রগতি ৫১.৬৫ শতাংশ মাত্র। প্রকল্পের এমন ধীরগতির পেছনে বেশ কিছু কারণ চিহ্নিত করা হয়েছে। প্রকল্পের আওতায় ৯.৬ কিমি পাইপলাইন দূর থেকে র-ওয়াটার ট্রান্সমিশন, আন্ডারগ্রাউন্ড স্ট্রাকচারের ডিওয়াটারিং, গঊচ ও সিভিল কাজের সমন্বয় জটিলতা সৃষ্টি, পাইপলাইন স্থাপন কাজে স্থানীয় জনগণের সাময়িক বাধা এবং প্রতিকূল আবহাওয়া (অতিরিক্ত বৃষ্টি) কাজের অগ্রগতিতে প্রভাব ফেলেছে।
সমন্বয়হীতা, দীর্ঘসূত্রিতা ও দরপত্র জটিলতা
মাঠপর্যায়ের তথ্যে আইএমইডি বলছে, আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বান, মূল্যায়ন এবং চুক্তি সম্পন্ন করতেই প্রায় দেড় বছর পার হয়। পরবর্তীতে নভেম্বর ২০২২-এ কার্যাদেশ দেয়া হলেও ততক্ষণে মূল মেয়াদ শেষ হয়ে যাওয়ায় প্রকল্পটি সংশোধন করতে হয়। এর আগে করোনা মহামারির প্রভাব ছিল। বৈশ্বিক মহামারি কোভিড-১৯ এর কারণে প্রাথমিক কার্যক্রম যথাসময়ে শুরু করা সম্ভব হয়নি।
এ ছাড়া সমন্বয়হীনতা ও প্রশাসনিক জটিলতার কারণেও প্রকল্পটির অগ্রগতি বাধাপ্রাপ্ত হয়। বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) সাথে পাইপলাইনের রুট সংক্রান্ত অনুমোদন, আন্ডারগ্রাউন্ড স্ট্রাকচারের ডিওয়াটারিং এবং সিভিল কাজের সমন্বয় সাধনে অতিরিক্ত সময় লেগেছে। প্রকল্পের আওতায় ২৩টি গভীর নলকূপের কাজ শেষ হলেও জনবল ঘাটতি এবং পাম্পহাউজ ও মালামালের নিরাপত্তা নিশ্চিত না করায় প্রায় ১০ থেকে ১১টি নলকূপ এখনো চালু করা সম্ভব হচ্ছে না। এমনকি ইতোমধ্যে মালামাল চুরির ঘটনাও ঘটেছে। এ ছাড়া অতিরিক্ত বৃষ্টির কারণে ট্রেজে পানি জমে মাটি অস্থিতিশীল হওয়া এবং ধসঝুঁকি বাড়ায় স্থাপন ও নির্মাণকাজ ব্যাহত হচ্ছে।
মাঠপর্যায়ের চিত্র ও চ্যালেঞ্জ
আইএমইডি বলছে, সরেজমিন পরিদর্শনে ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্টের প্রধান স্ট্রাকচার নির্মাণ ও ঢালাইয়ের মান সন্তোষজনক দেখা গেলেও, ইনটেক পয়েন্টে প্রবেশের জন্য নির্মিত ব্রিজের উভয় পাশে কোনো প্রটেক্টিভ ওয়ার্ক (গাইডওয়াল বা রিয়েটমেন্ট) না থাকায় স্কাওয়ারিং ও ক্ষয়ঝুঁকি বিদ্যমান রয়েছে। এ ছাড়া পাইপলাইন স্থাপন কাজে স্থানীয় জনগণের সাময়িক বাধাও অগ্রগতিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
মাইরা অ্যাসোসিয়েটসরা বলছে
আইএমইডির পর্যবেক্ষক মাইরা অ্যাসোসিয়েটস বলছে, প্রকল্পটি বর্ধিত মেয়াদে শেষ করতে হলে বাস্তবসম্মত পুনর্নির্ধারিত কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন ও তার কঠোর বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হবে। নলকূপ ও পাম্পহাউজগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ এবং দ্রুত প্রয়োজনীয় জনবল পদায়ন; পিপ্রাইসি/পিএসসি সভা নিয়মিতকরণ এবং অর্থছাড়ের সাথে সামঞ্জস্য রেখে কার্যকর ব্যয় ব্যবস্থাপনা নিশ্চিতসহ ট্রিটেড পানির নিয়মিত পরীক্ষণ, ইটিপি/সিইটিপি কার্যক্রমের মনিটরিং জোরদার এবং দীর্ঘমেয়াদি রক্ষণাবেক্ষণের জন্য কারিগরি সক্ষমতা বাড়ানো প্রয়োজন। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, বাস্তবায়নকারী সংস্থা এবং সব অংশীজনের সমন্বিত ও কার্যকর উদ্যোগের মাধ্যমেই কেবল এই গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পটির সময়মতো সফল সমাপ্তি এবং দেশের শিল্পায়নে এর সুফল নিশ্চিত করা সম্ভব। প্রকল্পটি সফলভাবে বাস্তবায়িত হলে মিরসরাই জাতীয় বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলে শিল্পায়নের গতি বাড়বে, বিনিয়োগ পরিবেশ আরো উন্নত হবে এবং দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখবে।



