বাংলাদেশ ব্যাংকের সার্কুলার

১ হাজার কোটি টাকার বেশি ঋণে ১৫ বছর মেয়াদি নবায়নের সুযোগ

Printed Edition

বিশেষ সংবাদদাতা

এক হাজার কোটি টাকা বা তার বেশি ঋণ থাকা বড় ঋণগ্রহীতাদের জন্য সর্বোচ্চ ১৫ বছর মেয়াদি পুনঃতফসিল সুবিধা দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এ ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ দুই বছর গ্রেস পিরিয়ড রাখা যাবে। একই সাথে ক্ষতিগ্রস্ত ঋণগ্রহীতা প্রতিষ্ঠানের ব্যবসায়িক ও আর্থিক ব্যবস্থা পুনর্গঠনের লক্ষ্যে নীতিসহায়তা পাওয়ার জন্য আবেদনের সময়সীমা আগামী ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে।

গতকাল সোমবার বাংলাদেশ ব্যাংকের ব্যাংকিং প্রবিধি ও নীতি বিভাগ (বিআরপিডি) এ বিষয়ে একটি সার্কুলার জারি করে সব তফসিলি ব্যাংককে তা পরিপালনের নির্দেশ দিয়েছে। নতুন নির্দেশনা অনুযায়ী, কোনো একক প্রতিষ্ঠান বা গ্রুপের আবেদন করা ঋণ হিসাবগুলোর মোট ঋণস্থিতি এক হাজার কোটি টাকা বা তার বেশি হলে ব্যাংকার-গ্রাহক সম্পর্কের ভিত্তিতে বিশেষ পুনঃতফসিল করা যাবে। এ ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ দুই বছর গ্রেস পিরিয়ডসহ সর্বোচ্চ ১৫ বছর মেয়াদ নির্ধারণ করা যাবে। এ ছাড়া একই শ্রেণীর বড় ঋণগ্রহীতাদের বিশেষ পুনর্গঠনের ক্ষেত্রেও অতিরিক্ত সময় দেয়ার সুযোগ রাখা হয়েছে। বিআরপিডি সার্কুলার নং-১৬/২০২২-এর-৬(১) অনুচ্ছেদে বর্ণিত মেয়াদের অতিরিক্ত সর্বোচ্চ চার বছর মেয়াদে পুনর্গঠন করা যাবে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনায় অশ্রেণিকৃত ও খেলাপি- দুই ধরনের ঋণের জন্যই সুবিধা রাখা হয়েছে। আগামী ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত অশ্রেণিকৃত ঋণ বিশেষ পুনর্গঠন সুবিধার আওতায় আসতে পারবে। অন্য দিকে সাব-স্ট্যান্ডার্ড (এসএস), ডাউটফুল (ডিএফ) ও ব্যাড/লস (বিএল) পর্যায়ে শ্রেণিকৃত ঋণ বিশেষ পুনঃতফসিল সুবিধা পাবে। ফলে সাময়িক আর্থিক সঙ্কটে থাকা বড় ঋণগ্রহীতাদের দীর্ঘমেয়াদি পরিশোধ পরিকল্পনার আওতায় আসার সুযোগ তৈরি হয়েছে। তবে এক হাজার কোটি টাকার কম ঋণ থাকা প্রতিষ্ঠান বা গ্রুপের ক্ষেত্রে আগের নিয়মই বহাল থাকবে। এসব ঋণের বিশেষ পুনঃতফসিল ও পুনর্গঠনে বিআরপিডি সার্কুলার নং-০৭/২০২৫-এ নির্ধারিত মেয়াদ প্রযোজ্য হবে। অর্থাৎ বড় ঋণগ্রহীতাদের জন্য বাড়তি সুবিধা থাকলেও তুলনামূলক ছোট ঋণগ্রহীতাদের ক্ষেত্রে নতুন করে মেয়াদ বাড়ানো হয়নি।

এ দিকে বাংলাদেশ ব্যাংকের নতুন নির্দেশনা অনুযায়ী আগের সুবিধাপ্রাপ্তরাও এ সুযোগ পাবেন। ইতোমধ্যে নীতিসহায়তা সংক্রান্ত বাছাই কমিটির মাধ্যমে সুবিধা পাওয়া ঋণগ্রহীতারাও নতুন নির্দেশনার আওতায় আসতে পারবেন। এক হাজার কোটি টাকা বা তার বেশি ঋণ থাকা প্রতিষ্ঠান বা গ্রুপ আগের সুবিধা গ্রহণ করলেও নতুন করে আবেদন করে সর্বোচ্চ ১৫ বছর পর্যন্ত পুনঃতফসিল সুবিধা নেয়ার সুযোগ পাবে। এ ক্ষেত্রে ইতোমধ্যে অতিক্রান্ত গ্রেস পিরিয়ডকে সংশ্লিষ্ট সার্কুলারে নির্ধারিত গ্রেস পিরিয়ডের অংশ হিসেবে গণনা করা হবে। প্রয়োজন হলে অতিরিক্ত মেয়াদ বাড়ানো যাবে।

বাংলাদেশ ব্যাংক জানিয়েছে, নতুন নির্দেশনার আওতায় করা সব আবেদন প্রয়োজনীয় ডাউন পেমেন্ট গ্রহণ করে চলতি বছরের ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যে সংশ্লিষ্ট ব্যাংককে নিষ্পত্তি করতে হবে। অর্থাৎ ৩০ সেপ্টেম্বরের মধ্যে আবেদন করলেও তা ঝুলিয়ে রাখার সুযোগ থাকবে না; নির্ধারিত সময়ের মধ্যে ব্যাংককে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক বলেছে, আগের সার্কুলার ও তার ধারাবাহিকতায় জারি করা অন্যান্য নির্দেশনা অপরিবর্তিত থাকবে। নতুন নির্দেশনাটি ব্যাংক কোম্পানি আইন, ১৯৯১-এর ৪৯(১)(চ) ধারায় প্রদত্ত ক্ষমতাবলে জারি করা হয়েছে এবং তা অবিলম্বে কার্যকর হবে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সার্কুলারে নীতিসহায়তা দেয়ার কারণ হিসেবে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতির কথাও তুলে ধরা হয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে বাংলাদেশের রফতানি খাতে সাময়িক নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। বিশেষ করে জ্বালানি সঙ্কটের কারণে রফতানিমুখী শিল্পপ্রতিষ্ঠানের উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায় ঋণ পরিশোধ সক্ষমতার ওপর চাপ তৈরি হয়েছে। এর পাশাপাশি বাজারভিত্তিক সুদহার ব্যবস্থা চালুর ফলে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোর সুদ ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। ব্যবসায়িক মন্দার কারণে আয় ও নগদ প্রবাহ কমে যাওয়ায় অনেক ঋণগ্রহীতার ঋণ পরিশোধ সক্ষমতাও কমেছে।

এ দিকে খেলাপি ঋণ কমাতে বাংলাদেশ ব্যাংক ১৮ মাসের একটি রোডম্যাপ গ্রহণ করেছে। ওই রোডম্যাপের প্রথম ছয় মাস, অর্থাৎ ৩১ ডিসেম্বর ২০২৬ পর্যন্ত সময়কে বিবেচনায় নিয়ে বর্তমান বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে ক্ষতিগ্রস্ত ঋণগ্রহীতাদের কিছুটা অতিরিক্ত সময় দেয়ার অংশ হিসেবে নতুন সার্কুলার জারি করা হয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নতুন সিদ্ধান্তে বিশেষ করে এক হাজার কোটি টাকা বা তার বেশি ঋণ থাকা বড় গ্রাহকদের জন্য পুনঃতফসিল ও পুনর্গঠনে বাড়তি সময়ের সুযোগ তৈরি হলো। এর ফলে সাময়িক সঙ্কটে থাকা প্রতিষ্ঠানগুলো ব্যবসা সচল রেখে দীর্ঘ মেয়াদে ঋণ পরিশোধের সুযোগ পাবে বলে আশা করা হচ্ছে।