দেবীগঞ্জ (পঞ্চগড়) সংবাদদাতা
পঞ্চগড়ের দেবীগঞ্জ উপজেলার টেপ্রীগঞ্জ ইউনিয়নের নগরপাড়া এলাকায় করতোয়া নদীর তীরঘেঁষা একটি বাঁশঝাড় এখন বাবুই পাখির নিরাপদ আশ্রয়স্থল হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে। বাঁশের ডালে সারি সারি ঝুঁলে থাকা বাসাগুলো যেন প্রকৃতির নিখুঁত শিল্পকর্ম। ভোরের আলো আর বিকেলের মৃদু রোদে পাখিদের কিচিরমিচিরে মুখরিত হয়ে ওঠে পুরো এলাকা। তবে এই সৌন্দর্যের আড়ালেই লুকিয়ে আছে উদ্বেগের একটি বার্তা, ক্রমেই হারিয়ে যাচ্ছে গ্রামবাংলার পরিচিত এই অতিথি পাখি।
স্থানীয়দের মতে, কয়েক বছর ধরেই দলবেঁধে বাবুই পাখি এখানে বাসা তৈরি করে আসছে। কিন্তু চলতি মৌসুমে বাসার সংখ্যা আগের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। একসময় যেখানে অসংখ্য বাসা চোখে পড়ত, এখন সেখানে দেখা মিলছে তুলনামূলক কম সংখ্যক পাখির। এটি শুধু একটি এলাকার পরিবর্তন নয়, বরং দেশের সামগ্রিক পরিবেশগত সঙ্কটেরই প্রতিফলন বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
বন্যপ্রাণী আলোকচিত্রী শরীফ আহমেদ বলেন, প্রাকৃতিক ভারসাম্যহীনতার কারণে পাখিসহ বিভিন্ন বন্যপ্রাণীর খাদ্যাভ্যাস ও আবাসস্থল নির্বাচনে বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে। গাছপালা কমে যাওয়ায় দেশীয় পাখিগুলো বাধ্য হয়ে অপ্রত্যাশিত স্থানে বাসা তৈরি করছে। তার মতে, প্রকৃতি নিজেই টিকে থাকার সর্বোচ্চ চেষ্টা করছে, তবে সব কিছু শেষ হয়ে যাওয়ার আগেই মানুষকে সচেতন হয়ে একটি নিরাপদ ও বাসযোগ্য পৃথিবী গড়ে তুলতে হবে।
একসময় গ্রামবাংলার প্রায় প্রতিটি উঠান, সুপারি ও নারিকেল গাছ কিংবা ঘরের কার্নিশে বাবুই পাখির বাসা ছিল পরিচিত দৃশ্য। দেবীগঞ্জের বিভিন্ন গ্রামেও ছিল তাদের সরব উপস্থিতি। কিন্তু অপরিকল্পিত নগরায়ন, নির্বিচারে বৃক্ষ নিধন, কৃষিজমিতে অতিরিক্ত কীটনাশকের ব্যবহার এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে দ্রুত কমে যাচ্ছে তাদের সংখ্যা।
প্রকৃতিপ্রেমীদের মতে, বাবুই পাখি শুধু সৌন্দর্যের প্রতীক নয়; পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায়ও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। তাই এই পাখির অস্তিত্ব সঙ্কট পুরো প্রতিবেশ ব্যবস্থার জন্যই একটি সতর্কবার্তা। এখনই কার্যকর সংরক্ষণ উদ্যোগ গ্রহণ না করলে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম হয়তো বইয়ের পাতা কিংবা ছবিতেই দেখবে গ্রামবাংলার এই চিরচেনা পাখিটিকে।
প্রকৃতির এই গুরুত্বপূর্ণ প্রাণীকে রক্ষা করতে স্থানীয় জনগণ, প্রশাসন ও পরিবেশপ্রেমীদের সম্মিলিত উদ্যোগ জরুরি। বাবুই পাখির কিচিরমিচিরে আবারো মুখরিত হোক গ্রামবাংলা, এটাই এখন সময়ের দাবি।



